বাংলাদেশের সিনিয়র নারী হকি দলই ছিল না এতদিন। এশিয়ান গেমসের হকি বাছাই টুর্নামেন্টে অর্পিতাদের অভিষেক। নিজেদের প্রথম প্রতিযোগিতাতে বাংলাদেশ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ নারী হকি দল এশিয়ান গেমসে নিজেদের নাম লিখিয়েছে। বাংলাদেশ নারী হকি দলের অন্যতম সদস্য অর্পিতা পাল। তাইপের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে প্রথম ম্যাচে সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা থেকে কথা বলেছেন ঢাকা পোস্টের সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার আরাফাত জোবায়ের-এর সঙ্গে
অভিনন্দন। অভিষেক আসরেই সফলতা অর্জন। টুর্নামেন্টের শুরুর আগে ভেবেছিলেন কি কোয়ালিফাই করতে পারবেন?
অর্পিতা: আট দলের টুর্নামেন্টে আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে হয়তো পারব না। তবে এশিয়ান গেমসে কোয়ালিফাই করতে পারব এমন একটা বিশ্বাস ছিল। সেটা হওয়ায় আমরা সবাই খুশি।
আপনাদের দলের অনেকেরই বয়স বিশের কম। সেখানে প্রতিপক্ষ দলে অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। এমনকি বাংলাদেশ নারী হকির সিনিয়র দলই ছিল না। এরপরও কীভাবে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন?
অর্পিতা: হ্যাঁ, আমাদের বয়স কম। কিন্তু এক সঙ্গে খেলছি অনেক দিন। একতাই আমাদের শক্তি। সেই শক্তি দিয়েই আমরা নিজেদের আত্মবিশ্বাসী করেছি।
প্রথম ম্যাচে চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে ৫ গোলে ড্র। এটা কি আপনাদের এশিয়ান গেমসে কোয়ালিফাই করার সাহস আরও বাড়িয়েছে?
অর্পিতা: আমাদের লক্ষ্য ছিল এশিয়ান গেমসে খেলব। তাইপে ভালো দল, তাদের সঙ্গে যখন এক পয়েন্ট পেয়ে গেলাম তখন আরও বেশি চেষ্টা করেছি, আমাদের মিশন যেন সফল হয়।

পুরুষ হকিতে লিগ অনিয়মিত, জাতীয় দলের খেলাও হয় অনেক দিন পরপর। সেখানে নারী হকিতে ভবিষ্যত কীভাবে দেখছেন?
অর্পিতা: কাউকে না কাউকে পথ দেখাতে ও ভবিষ্যত সৃষ্টি করতে হয়। আমরা এশিয়ান গেমসে উঠে ইতিহাস তৈরি করলাম। আমাদের অনুসরণ করে এখন অন্য মেয়েরাও হকিতে আসবে। ফেডারেশন নারী হকি নিয়ে বিশেষভাবে ভাববে। সব জায়গায় সাফল্য, মসৃণ পথ থাকে না, নিজেদেরও করে নিতে হয়। আমরা না হয় করলাম।
বাংলাদেশের হকির ভবিষ্যৎ প্রকৃত অর্থেই অনিশ্চয়তায় ভরপুর। এরপরও আপনার ব্যক্তিগত ভবিষ্যত লক্ষ্য কী হকি নিয়ে?
অর্পিতা: আমি যত দিন সুস্থ থাকব হকি খেলা চালিয়ে যেতে চাই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশকে আরও সাফল্য এনে দিতে চাই। নারী হকির মাধ্যমে ভালো কিছু করা সম্ভব।
এই অর্জনের পর ফেডারেশন ও সরকারের কাছে আপনাদের কোনো চাওয়া!
অর্পিতা: নারী ফুটবল দল এখন এশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলছে কারণ তারা দীর্ঘদিন নিয়মিত ক্যাম্পে আছে। টানা অনুশীলন ও ক্যাম্পে থাকলে আমরাও এশিয়ার শীর্ষ একটি দল হতে পারব। কোনোভাবেই অসম্ভব কিছু নয়। ফেডারেশনের কাছে তাৎক্ষণিক প্রত্যাশা এশিয়ান গেমসের জন্য যেন আমাদের ক্যাম্প দ্রুতই শুরু হয়।
বাংলাদেশের হকি প্রায় পুরোটাই বিকেএসপি নির্ভর। নারী হকি তো একেবারেই। এই দলের অনেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। কয়েক মাস পরই আর বিকেএসপিতে থাকতে পারবেন না। এরপরই তো হারিয়ে যাওয়ার একটা শঙ্কা থাকে।
অর্পিতা: এটা একটা বড় ভয়ের জায়গা। বিকেএসপি ছাড়া মেয়েদের হকি নিয়ে সেভাবে অনুশীলন ও কাজ হয় না। বিকেএসপি থেকে বেরিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের যদি ফেডারেশন ধরে রাখতে না পারে তাহলে মেধাবী খেলোয়াড় হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। আবার ফেডারেশনেরও অনেক সময় সামর্থ্য থাকে না অনেক খেলোয়াড়কে এক সঙ্গে রাখার। সব মিলিয়ে একটা সুন্দর পদ্ধতি দাঁড় করানো দরকার, যাতে নারী খেলোয়াড়রা নিজেদের হকির সঙ্গে রাখতে পারে।
পুরুষ হকিতে যুব বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার পর অধিনায়ক সামিন বলেছিলেন, ফেডারেশনের দৈনিক ভাতায় বুটও কিনতে পারেন না, স্টিকও নিজেদের কিনতে হয়। আপনাদের কী অবস্থা?
অর্পিতা: আমাদের এখনও এই সংকটে পড়তে হয়নি। স্টিক, বল, জার্সি সব কিছুই বিকেএসপি সরবরাহ করে। জাতীয় দলের ক্যাম্পও বিকেএসপিতে হওয়ায় আমরা একই পরিবেশেই থাকি। খাবার, আবাসন নিয়ে তেমন সমস্যা বোধ করি না।

সিনিয়র হকি দল না থাকলেও আপনারা গত দুই বছরে বয়স ভিত্তিক টুর্নামেন্ট খেলেছেন একাধিক। সেটা এই টুর্নামেন্টে কেমন কাজে দিয়েছে?
অর্পিতা: গত দুই বছরে আমরা তিনটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলেছি। অ-২১, অ-১৮ ও ফাইভ এ সাইড টুর্নামেন্ট। এই টুর্নামেন্টগুলো খেলায় আমাদের বোঝাপড়া ও আন্তর্জাতিক ম্যাচের চাপ নেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের এই টুর্নামেন্টে অনেক কাজে লেগেছে। বিশেষ করে তাইপে ও আজ হংকং ম্যাচে আমরা চাপে ভেঙে পড়েনি।
আপনাদের নারী হকির পেছনে কোচ রাজুর অবদান কেমন?
অর্পিতা: তিনি আমাদের শুধু কোচই নন, অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তিনি আমাদের একেবারে হাতেকলমে শিখিয়েছেন। তার জন্য আমরা এই পর্যায়ে আসতে পেরেছি। তার অবদান তো আসলে বলে শেষ করা যাবে না।
নারী হকির সবচেয়ে পরিচিত মুখ ‘অর্পিতা পাল’, এতে আপনার পরিবারের প্রতিক্রিয়া কী?
অর্পিতা: ফাইভ এ সাইড ও অন্য জুনিয়র টুর্নামেন্টে অনেক গোল করার এবং ম্যাচ সেরা হওয়ার কীর্তি রয়েছে। তবে সিনিয়র জাতীয় দলের খেলার গুরুত্ব ও মর্যাদা অবশ্যই আলাদা। এটা ঠিক, হকির কারণে এখন আমাকে অনেকেই চেনে। অন্য খেলার খেলোয়াড় এমনকি সাধারণ মানুষও। এজন্য আমি বিকেএসপি ও আমার সতীর্থ, কোচিং স্টাফ সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার পরিবার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সাপোর্ট করে।
এজেড/এফএইচএম
