দুয়ারে কড়া নাড়ছে আরেকটি ফুটবল বিশ্বকাপ। আগামী ১১ জুন আমেরিকান মুল্লুকে পর্দা উঠবে ফুটবল বিশ্বকাপের। দিনের হিসেবে আর তিন সপ্তাহেরও কম সময় বাকি। অথচ ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসরকে ঘিরে যে উন্মাদনা থাকার কথা, সেটাই যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। মাঠের ফুটবলের চেয়ে এখন বেশি আলোচনায় টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম, ভিসা জটিলতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা আয়োজন ঘিরে বিতর্ক।
২০২৬ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক আমেরিকা মহাদেশের তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা। বিক্ষোভ, সহিংসতায় বরাবরই উত্তাল থাকে মেক্সিকো। আসন্ন বিশ্বকাপ ঘিরেও বড় ধরণের বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা আছে। এ ছাড়া হোস্ট কান্ট্রি হওয়ার পর থেকেই নানা কারণে বিতর্কে যুক্তরাষ্ট্র।
দেশটির ডালাস শহরের বিখ্যাত এক দেয়ালচিত্র মুছে ফেলা হয়েছে বিশ্বকাপ উপলক্ষে নতুন আর্টওয়ার্ক বসানোর জন্য। শিল্পী রবার্ট ওয়াইল্যান্ড দাবি করেছেন, তাকে না জানিয়েই তার সৃষ্টিকর্ম মুছে ফেলা হয়েছে। এ নিয়ে আইনি পদক্ষেপও নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। এ ঘটনাকে অনেকে ২০২৬ বিশ্বকাপের বর্তমান বাস্তবতার প্রতীক হিসেবে দেখছেন। টুর্নামেন্ট শুরু হতে তিন সপ্তাহেরও কম সময় বাকি, অথচ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই ফুটবল, খেলোয়াড় বা সমর্থকদের গল্প—বরং রয়েছে বিতর্ক আর অসন্তোষ।
বিশ্বকাপের সময়টা কেমন হওয়া উচিত?
বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ। অসাধারণ সব মুহূর্ত উপভোগ করার সুযোগ ভক্ত-সমর্থকদের। ব্রাজিল তারকা রাফিনহা সম্প্রতি গোলডটকমকে যেমনটা বলেছিলেন,“আমি সবসময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে চেয়েছি। ছোটবেলা থেকেই আমি এর জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি।”

বিশ্বকাপ আবার জাতীয় গর্বেরও জায়গা। যেমন ২০২২ সালে লিওনেল মেসিকে বিশ্বকাপ উপহার দিতে পুরো আর্জেন্টিনা এক হয়েছিল। একই আসরে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে চোখের জলে ভেঙে পড়েছিলেন নেইমারসহ গোটা ব্রাজিল। সমর্থকদের কাছে বিশ্বকাপের মানে আবার ভিন্ন। কারও কাছে এটি দেশের প্রতি ভালোবাসা, কারও কাছে একসঙ্গে আনন্দ করার উপলক্ষ। নতুন দলগুলোর জন্য ফুটবলের টুর্নামেন্ট শুধু একটা বিশ্বকাপ নয়, একটা উৎসব যেন।
এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া কুরাসাওয়ের এক সমর্থক যেমন বলছেন,“আমরা কর্নার পেলেও উদযাপন করব, হলুদ কার্ড পেলেও উদযাপন করব। শুধু বিশ্বকাপে থাকতে পারাটাই আমাদের আনন্দ।” বিশ্বকাপ মানে আবার ভ্রমণও। নতুন দেশ দেখা, নতুন সংস্কৃতি অনুভব করা, প্রিয় দলকে অনুসরণ করে এক শহর থেকে আরেক শহরে প্রদক্ষিণ- সব মিলিয়ে এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
টিকিট সাধারণের নাগালের বাইরে
আমেরিকা বিশ্বকাপের শুরু থেকেই টিকিট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। টিকিট বিশেষজ্ঞ জিম ম্যাকার্থির মতে, শুরু থেকেই বড় ভুল করেছে ফিফা। ফুটবল কীভাবে সঠিকভাবে বাজারজাত করতে হয়, সেটিও তিনি দেখেছেন; আবার কীভাবে পুরো বিষয়টি ভুলভাবে পরিচালিত হয়, সেটাও জানেন। তার মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপ দ্বিতীয় দিকটার কাছাকাছিই চলে গেছে।
পরিসংখ্যানও সেটিই বলছে। গত বছরের শেষ দিকে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পর থেকেই দামের ওঠানামা ছিল। তবে সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, গ্রুপ পর্বের একটি ম্যাচের পুনর্বিক্রয় বাজারে গড় মূল্য প্রায় ৫৫০ ডলার। কিছু ম্যাচের দাম আবার ২ হাজার ডলারও ছাড়িয়ে গেছে।
ম্যাকার্থি গোলডটকমকে বলেন, “আপনি যদি কোনো ইভেন্ট থেকে সর্বোচ্চ আয় করতে চান, তাহলে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য যেখানে মেলে, সেই আদর্শ মূল্য নির্ধারণ করাই মূল বিষয়। কিন্তু দাম যদি তারও ওপরে চলে যায়, তখন মানুষ বাজার থেকেই সরে যেতে শুরু করে।”

অবশ্য আমেরিকার বাস্তবতা কাতার বিশ্বকাপের মতো নয়। তবুও আকাশছোঁয়া টিকিট মূল্য যে অসংখ্য স্থানীয় সমর্থককে দূরে ঠেলে দিয়েছে, তা স্পষ্ট। “ফুটবল সবার খেলা”— এই ধারণাটিও এখন অনেকটাই পুরোনো হয়ে গেছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি করপোরেট নির্ভর আয়োজন। আর যুক্তরাষ্ট্রে বড় ক্রীড়া ইভেন্টের ব্যয় এমনিতেই বেশি।
তবে সবকিছু শুধু “পুঁজিবাদ” দিয়ে ব্যাখ্যা করাটাও যথেষ্ট নয়। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো সম্প্রতি বলেছিলেন, আমেরিকানরা বড় ইভেন্ট দেখতে বেশি অর্থ খরচ করতেই প্রস্তুত। কিন্তু সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র তো ৪৮ দলের মধ্যে মাত্র একটি দল। ফলে পুরো বিশ্বকাপকে শুধু মার্কিন বাজারের দৃষ্টিতে দেখা সংকীর্ণ চিন্তাই হয়ে যায়।
মার্কিন সমর্থকদের কেউ কেউ আগে থেকেই উচ্চমূল্যের ম্যাচ দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু এবার যে দামে টিকিট বিক্রি হচ্ছে, সেটি অনেকের নাগালের বাইরেই চলে গেছে। অন্যদিকে ফিফার দাবি, টিকিট বিক্রি রেকর্ড গড়েছে এবং ১৯৯৪ বিশ্বকাপকেও ছাড়িয়ে গেছে। সেটি সত্যও হতে পারে। কারণ এবার ১৬টি শহরে মোট ১০৪টি ম্যাচ হবে। টরন্টোর বিএমও ফিল্ড–এর মতো সবচেয়ে ছোট স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতাও ৪৫ হাজার, আর গড় ধারণক্ষমতা প্রায় ৬৫ হাজার। ফলে বিপুলসংখ্যক আসন পূরণ করার লক্ষ্য শুরু থেকেই ছিল।
কার দোষ, কে নেবে দায়?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা এসে দাঁড়ায় দায় কার। আঙুল তোলা সবচেয়ে সহজ হয়েছে ফিফার দিকে, আর সত্যি বলতে টুর্নামেন্ট ঘিরে তৈরি হওয়া নানা সমস্যার জন্য সংস্থাটির দায়ও কম নয়। এক বছর আগেই আয়োজক শহরগুলোর স্থানীয় কমিটিগুলো জানিয়েছিল, গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় নিয়ে তারা এখনও স্পষ্ট নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা না পাওয়ার অভিযোগও ছিল। পরবর্তী মাসগুলোতেও সেই চিত্র খুব একটা বদলায়নি। বিশেষ করে টিকিটের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বাধীন ফিফার কৌশল পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।

এর সঙ্গে আছে রাজনৈতিক বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির কারণে বিদেশি সমর্থকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, এমনকি যারা অল্প সময়ের জন্য শুধু খেলা দেখতে যেতে চান, তাদের মধ্যেও। আবার আয়োজক শহরগুলোর স্থানীয় কমিটিগুলোকেও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই; তারাও নিজেদের মতো করে সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে।
আসল হতাশা এখানেই—ফুটবলের বাইরের বিষয়গুলোই পুরো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। প্রতিটি বিশ্বকাপেই মাঠের বাইরের বিতর্ক থাকে। কাতার বিশ্বকাপ ঘিরে ছিল মানবাধিকার ইস্যু, ব্রাজিলে ছিল নিরাপত্তা ও জনঅস্থিরতার প্রশ্ন, আর ২০১৮ বিশ্বকাপে রাশিয়াকে ঘিরেও ছিল ব্যাপক সমালোচনা।
তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিবারই টুর্নামেন্টের উত্তেজনা ও মাঠের লড়াই সেই বিতর্ককে কিছুটা আড়াল করে দিয়েছিল। কিন্তু এবার, অন্তত যুক্তরাষ্ট্রে, ফুটবল নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বিশ্বকাপ ঘিরে এখন আলোচনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে মাঠের বাইরের সংকট, ৯০ মিনিটের ফুটবল নয়।
এফআই

