বিজ্ঞাপন

শিরোপা ধরে রাখার মতো দল কি পেল আর্জেন্টিনা?

শিরোপা ধরে রাখার মতো দল কি পেল আর্জেন্টিনা?

ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য আর্জেন্টিনা যে ২৬ জনের স্কোয়াড ঘোষণা করেছে, সেটি এককথায় অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেলে দারুণ ভারসাম্যপূর্ণ। কোচ লিওনেল স্কালোনি তার চেনা কৌশলের ওপর আস্থা রেখে দলের মূল শক্তি বা ‘কোর’ গ্রুপটিকে ধরে রেখেছেন, যা এই দলটিকে টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ ফেভারিট হিসেবে তুলে ধরেছে। 

অভিজ্ঞতার শক্ত ভিত্তি

নিঃসন্দেহে দলের সবচেয়ে বড় শক্তি অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ৩৮ বছর বয়সে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া এই ফরোয়ার্ডের উপস্থিতি দলের জন্য এক বিরাট মানসিক অনুপ্রেরণা। রক্ষণভাগে নিকোলাস ওতামেন্দি, মধ্যমাঠে রদ্রিগো ডি পল ও আক্রমণভাগে লাউতারো মার্তিনেজ ও জুলিয়ান আলভারেজের মতো ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ী ১৭ জন তারকা দলে রয়েছেন। এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো বিশ্বমানের মিডফিল্ডাররা থাকায় মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা আর্জেন্টিনার জন্য সহজ হবে। গোলপোস্টের নিচে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের মতো বিশ্বস্ত হাত দলটিকে যেকোনো বড় ম্যাচে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে। এছাড়া ২০১৮ সালের পর জিওভানি লো সেলসোর দলে ফেরা স্কালোনির জন্য পাসিং ফুটবলের ধার বাড়াতে সাহায্য করবে।

নতুন প্রজন্মের অন্তর্ভুক্তি

এই স্কোয়াডের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো স্কালোনির দূরদর্শিতা। অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার অবসর ও মার্কোস আকুনার ফিটনেসজনিত অনুপস্থিতিতে দল কিন্তু দুর্বল হয়নি, বরং নতুনদের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ভ্যালেন্তিন বার্কো, নিকোলাস পাজ ও জিউলিয়ানো সিমিওনের মতো প্রতিভাবান তরুণদের অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে আর্জেন্টিনা ভবিষ্যতের জন্য তাদের নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করছে। আক্রমণভাগে থিয়াগো আলমাদা ও জোসে ম্যানুয়েল লোপেজের মতো নতুন মুখরা দলের খেলায় বৈচিত্র্য ও গতি আনবে।

চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

বড় ম্যাচের খেলোয়াড় ও মেসির অন্যতম সেরা জুটি অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার অভাব দলে ভালোভাবেই টের পাওয়া যেতে পারে। উইংয়ে তার মতো ডিফেন্স চেড়া ড্রিবলিং বা গতি এই দলে কিছুটা কম। আকুনার অনুপস্থিতিতে লেফট-ব্যাক পজিশনটি কিছুটা নড়বড়ে হতে পারে যদি তাগলিয়াফিকো কোনো কারণে ইনজুরি বা ফর্মে সমস্যায় পড়েন।

আলজেরিয়া, জর্ডান ও অস্ট্রিয়ার মতো দলগুলোর বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে এই দলের খুব বেশি বেগ পেতে হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে বড় টুর্নামেন্টে রক্ষণভাগের গতি ও বুড়ো হাড়ের ভেল্কি দেখাতে যাওয়া সিনিয়র খেলোয়াড়দের চোটমুক্ত থাকাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

পজিশনভিত্তিক স্কোয়াড বিশ্লেষণ

গোলকিপার: এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, জেরোনিমো রুলি ও হুয়ান মুসো।

গোলকিপিং পজিশনটি আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। এক নম্বর গোলরক্ষক হিসেবে ‘দিবু’ মার্তিনেজ নিশ্চিতভাবেই প্রথম পছন্দ। বড় ম্যাচে ও পেনাল্টি শুটআউটে তিনি কতটা দুর্দান্ত তা সবার জানা। ব্যাকআপ হিসেবে জেরোনিমো রুলি ও হুয়ান মুসো থাকায় এই পজিশনে যথেষ্ট গভীরতা ও নির্ভরযোগ্যতা রয়েছে।

ডিফেন্ডার: লিওনার্দো বালের্দি, গঞ্জালো মন্তিয়েল, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, নিকোলাস ওতামেন্দি, ফাকুন্দো মেদিনা ও নাহুয়েল মলিনা।

রক্ষণভাগে বিশ্বজয়ী তারকা ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দির উপস্থিতি দলটিকে দারুণ এক কাঠামোগত শক্তি দিচ্ছে। রাইট-ব্যাকে নাহুয়েল মলিনা ও গঞ্জালো মন্তিয়েল বেশ নির্ভরযোগ্য। তবে আকুনা ফিটনেস সমস্যার কারণে বাদ পড়ায় লেফট-ব্যাকে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোর ওপর চাপ কিছুটা বাড়বে, যেখানে ব্যাকআপ হিসেবে তরুণ ভ্যালেন্তিন বার্কোকে বা ফাকুন্দো মেদিনাকে ব্যবহার করা হতে পারে।

মিডফিল্ডার: লেয়ান্দ্রো পারেদেস, রদ্রিগো দে পল, ভ্যালেন্তিন বার্কো, জিওভানি লো সেলসো, এসেকুয়েল পালাসিওস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ।

আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড গত বিশ্বকাপের মতোই অত্যন্ত সৃজনশীল এবং শক্তিশালী। ম্যাক অ্যালিস্টার, ফার্নান্দেজ ও দে পলের মূল ত্রয়ী যেকোনো প্রতিপক্ষের মাঝমাঠকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ইনজুরির কারণে কাতার বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়া লো সেলসোর অন্তর্ভুক্তি দলের আক্রমণাত্মক পাসিংয়ের ধার অনেক বাড়িয়ে দেবে। ব্যাকআপ হিসেবে পারেদেস ও পালাসিওস দলের গভীরতা প্রমাণ করে।

ফরোয়ার্ড: লিওনেল মেসি, জুলিয়ান আলভারেজ, নিকোলাস গঞ্জালেস, থিয়াগো আলমাদা, জিউলিয়ানো সিমিওনে, নিকোলাস পাজ, হোসে ম্যানুয়েল লোপেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ।

আক্রমণভাগের মূল চালিকাশক্তি অবশ্যই ৩৮ বছর বয়সী অধিনায়ক মেসি। তিনি রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছেন। স্ট্রাইকার পজিশনে আলভারেজ ও মার্তিনেজের মতো দুজন বিশ্বমানের ফিনিশার থাকায় গোল করা নিয়ে খুব একটা ভাবতে হবে না স্কালোনিকে। উইংয়ে গঞ্জালেসের ওয়ার্ক-রেট দলকে সাহায্য করবে। তবে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয় হলো পাজ ও সিমিওনের মতো তরুণদের সংযোজন। ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো দারুণ প্রতিভা রয়েছে তাদের।

সবশেষে বলা যায়, স্কালোনি আবেগ একপাশে রেখে পুরোপুরি মেধার ভিত্তিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন করেছেন। দলে যেমন দে পল বা ওতামেন্দির মতো আগ্রাসী ও অভিজ্ঞ ফুটবলার আছেন, ঠিক তেমনি মেসি-আলভারেজের মতো গোলমেশিনও রয়েছে। আলজেরিয়া, জর্ডান ও অস্ট্রিয়ার মতো প্রতিপক্ষ নিয়ে গঠিত গ্রুপ ‘জে’ থেকে নকআউট পর্বে যাওয়া আর্জেন্টিনার জন্য সহজ হওয়ার কথা। সব মিলিয়ে, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে নামার জন্য এটি একটি চমৎকার ও শিরোপাপ্রত্যাশী স্কোয়াড।

এফএইচএম