প্রথম দেশ হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপের তিনটি আসর আয়োজন করে ফুটবলীয় লোকগাথায় মেক্সিকো নিজের স্থান করে নিতে প্রস্তুত। টুর্নামেন্টের অন্যতম নিয়মিত মুখ হিসেবে ‘এল ত্রিকলর’রা বিশ্বমঞ্চে তাদের ১৮তম আসরে অংশ নিচ্ছে।
নিজেদের মাটিতে তাদের শেষ বিশ্বকাপ খেলেছিল ১৯৮৬ সালে। ওইবার তারা কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিল। ১৯৭০ সালের আসরে স্বাগতিক হিসেবেও তারা শেষ আটে খেলেছিল। আবারও যখন ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ, তখন একই সাফল্য পাওয়ার আশা নিয়েই টুর্নামেন্টে পা রাখবে তারা। যদিও ১৯৮৬ সালের সেই দলের অভিজ্ঞ সদস্য হাভিয়ের আগুয়্যারে এখন প্রধান কোচের দায়িত্বে থাকায় সেমিফাইনালে খেলারও স্বপ্ন দেখতে পারে দলটি।
প্রধান কোচ: হাভিয়ের আগুয়্যারে
আগুয়্যারে গত বছরের জুলাই মাসে মেক্সিকোর ডাগআউটে ফিরে আসেন, হাইমে লোজানোর সংক্ষিপ্ত মেয়াদের পর তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি জাতীয় দলের প্রধান হিসেবে আগুয়্যারের তৃতীয় মেয়াদ। এর আগে তিনি প্রথমবার ২০০২ ফিফা বিশ্বকাপ কোরিয়া/জাপানে নিজের দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ২-০ গোলে হেরে রাউন্ড অব ১৬ থেকে বিদায় নেয়। ২০১০ ফিফা বিশ্বকাপ দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনি পুনরায় দায়িত্বে ফিরেছিলেন, যেখানে তার দল আর্জেন্টিনার কাছে ৩-১ গোলে পরাজিত হয়ে একই পর্ব থেকে বিদায় নেয়।
গত বছর মার্চে নিজের স্বপ্নের কথা জানান তিনি, ‘আমরা সবাই শেষ লক্ষ্যের দিকে মনোনিবেশ করছি, যা হলো মেক্সিকোর জন্য আমাদের ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ উপহার দেওয়া।’

মেক্সিকোর ২০২৬ বিশ্বকাপের ফিক্সচার ও গ্রুপ
১১ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা - মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম
১৮ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ কোরিয়া - এস্তাদিও গুয়াদালাজারা
২৪ জুন: চেক রিপাবলিক বনাম মেক্সিকো - মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম
মেক্সিকোর বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: কনকাকাফ
সেরা বিশ্বকাপ: কোয়ার্টার ফাইনাল (১৯৭০ এবং ১৯৮৬)
শেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২ (গ্রুপ পর্ব)
প্রথম বিশ্বকাপ: উরুগুয়ে ১৯৩০ (গ্রুপ পর্ব)
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ১৮ বার (১৯৩০-২০২৬)
টানা যোগ্যতাপর্জন: নয় বার (১৯৯৪ সাল থেকে)
বিশ্বকাপ স্বাগতিক: ১৯৭০ (কোয়ার্টার ফাইনাল), ১৯৮৬ (কোয়ার্টার ফাইনাল), ২০২৬ (সহ-স্বাগতিক)
সামগ্রিক রেকর্ড: ম্যাচ ৬০, জয় ১৭, ড্র ১৫, হার ২৮, গোল করেছে ৬২, গোল খেয়েছে ১০১
ফিফা র্যাংকিং: ১৫তম
মেক্সিকোর প্রথম বিশ্বকাপ
মেক্সিকো ১৯৩০ সালে ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম আসরে আরও ১২টি দেশের সঙ্গে অংশ নেয়। ওইবার স্বাগতিক উরুগুয়ে শিরোপা জিতেছিল। মেক্সিকানরা টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার পর চিলির সঙ্গে লড়াই করে এবং আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের অভিযান শেষ করে। তিনটি হার তাদের দ্রুত বিদায় নিশ্চিত করলেও হুয়ান কারেনো ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লেখান মেক্সিকোর প্রথম বিশ্বকাপ গোলদাতা হিসেবে। ফ্রান্সের কাছে ৪-১ গোলে হারের ম্যাচে গোলটি করেছিলেন।

মেক্সিকোর শেষ বিশ্বকাপ
কাতার ২০২২-এ ‘এল ত্রিকলর’ প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়। জেরার্ডো মার্টিনোর দল তাদের গ্রুপ 'সি'-এর অভিযানে পোল্যান্ডের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে শুরু করে এবং এরপর বিশ্বকাপের চিরচেনা প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনার কাছে ২-০ গোলে পরাজিত হয়। সৌদি আরবের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয় নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও তা উত্তর আমেরিকানদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ১৯৭৮ ফিফা বিশ্বকাপের পর এই প্রথম তারা গ্রুপ পর্ব পার হতে ব্যর্থ হয়।
মেক্সিকোর বিশ্বকাপের শীর্ষ গোলদাতা
লুইস হার্নান্দেজ ও হাভিয়ের হার্নান্দেজ কেবল পজেশনেই এক নন—এই কার্যকর জুটি মেক্সিকোর বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় ৪টি করে গোল নিয়ে সবার ওপরে আছেন। ‘এল মাতাদোর’ নামে পরিচিত লুইস হার্নান্দেজ ১৯৯৮ ফিফা বিশ্বকাপ ফ্রান্সে তার গোলশিকারি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সোনালি চুলের এই স্ট্রাইকার দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেন এবং নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২-২ ড্র ম্যাচে শেষ মুহূর্তে সমতাসূচক গোলটি করেন; এরপর জার্মানির বিপক্ষে শেষ ১৬-এর লড়াইয়ে চমৎকার ড্রিবলিং ও নিখুঁত ফিনিশিংয়ে নিজের গোলের সংখ্যা ৪-এ নেন।

লুইস হার্নান্দেজ তার গোল করার দক্ষতায় বিশ্বমঞ্চ উজ্জ্বল করার বারো বছর পর তরুণ হাভিয়ের ‘চিচারিতো’ হার্নান্দেজ দৃশ্যপটে আসেন—যিনি বিশ্বকাপের তিনটি ভিন্ন আসরে জালের দেখা পেয়েছিলেন। গুয়াদালাজারায় জন্ম নেওয়া এই গোলশিকারি দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০-এ ফ্রান্স এবং আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গোলের খাতা খোলেন এবং এরপর ২০১৪ ফিফা বিশ্বকাপ ব্রাজিলে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দলের শেষ গ্রুপ ম্যাচে খুব কাছ থেকে হেড করে গোল করেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক এই ফরোয়ার্ড চার বছর পর রাশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তার ৫০তম আন্তর্জাতিক গোলটি করেন।
মেক্সিকোর সর্বাধিক বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়
জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে মাঠে নামার তালিকায় রাফায়েল মার্কেজ শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন। এই সাবেক ডিফেন্ডার বিশ্বকাপে ১৯ বার অংশ নিয়েছেন। কোরিয়া/জাপান ২০০২-এ বিশ্বমঞ্চে তার হাতেখড়ি হয় যেখানে তিনি ৪টি ম্যাচে মাঠে নামেন—পরবর্তীতে ২০০৬, ২০১০ এবং ২০১৪ সালেও তিনি ৪টি করে ম্যাচ খেলেছেন। সাবেক এই অধিনায়ক ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপ রাশিয়ার পর তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন, যেখানে তিনি তার ঝুলিতে আরও ৩টি ম্যাচ যোগ করেছিলেন।

মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় জয়
মেক্সিকো ৬০টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছে এবং তাদের সবচেয়ে বড় জয়টি ছিল ১৯৭০ সালে ঘরের মাঠে এল সালভাদরের বিপক্ষে ৪-০ ব্যবধানে। মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজটেকাতে অনুষ্ঠিত সেই গ্রুপ পর্বের ম্যাচে হাভিয়ের ভালদিভিয়া জোড়া গোল করে স্বাগতিকদের এগিয়ে দেন; যার পর হাভিয়ের ফ্রাগোসো এবং ইগনাসিও বাসাগুরেনের গোল সেই বিশাল জয় সুনিশ্চিত করে।
মেক্সিকোর বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলকিপার: কার্লোস আসেভেদো, গিয়ের্মো ওচোয়া, রাউল রাঙ্গেল
ডিফেন্ডার: হেসুস গায়ার্দো, ইসরায়েল রেয়েস, সিজার মন্তেস, হোর্হে সানচেজ, ইয়োহান ভাসকেস, মাতেও চাভেজ
মিডফিল্ডার: হিলবার্তো মোরা, এদসন আলভারেজ, ওরবেলিন পিনেদা, লুইস রোমো, ব্রায়ান গুতিয়ারেজ, ওবেদ ভার্গাস, সিজার হুয়ের্তা, লুইস চাভেজ, এরিক লিরা, আলভারো ফিদালগো, রবার্তো আলভারাডো
ফরোয়ার্ড: আর্মান্দো গঞ্জালেজ, রাউল হিমেনেস, হুলিয়ান কিনোনস, সান্তিয়াগো হিমেনেস, গিয়ের্মো মার্টিনেজ, আলেক্সিস ভেগা।
এফএইচএম

