ফুটবল বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসর। সালটা ১৯৩৪। চার বছর আগে উরুগুয়ের প্রথম আসর সফল হওয়ার পর ফিফা এবার আয়োজন সরিয়ে আনে ইউরোপে। আয়োজক দেশ হয় ইতালি। কিন্তু এই আসরটি ইতিহাসের পাতায় ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্বের চেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে আছে তৎকালীন ইতালিয়ান একনায়ক বেনিতো মুসোলিনির ক্ষমতার প্রদর্শনী হিসেবে।
এই বিশ্বকাপের শুরুতেই বাধে বিপত্তি। ইতালিতে খেলতে রাজি হয়নি প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে। কারণ হিসেবে তারা সামনে এনেছিল চার বছর আগে ইতালির উরুগুয়ে সফর বয়কট করার প্রতিশোধকে। ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়নদের ছাড়াই শুরু হয় এই টুর্নামেন্ট। ১৬টি দলের এই আসরে প্রথমবার নকআউট পদ্ধতিতে খেলা শুরু হয়।
মুসোলিনির কাছে এই বিশ্বকাপ ছিল ইতালির ফ্যাসিবাদী শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ। অভিযোগ আছে, রেফারিদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে ইতালির জয় নিশ্চিত করার সব চেষ্টাই তিনি করেছিলেন। এছাড়া ইতালীয় বংশোদ্ভূত লাতিন আমেরিকান খেলোয়াড়দের নাগরিকত্ব দিয়ে নিজের দলে খেলানো নিয়ে হয়েছিল ব্যাপক সমালোচনা। তবে মুসোলিনির সোজাসাপ্টা নির্দেশ ছিল, ‘জিতো কিংবা মরো’।

১০ জুন, ১৯৩৪। রোমের স্তাদিও নাজিওনালে ফাইনালে মুখোমুখি হয় ইতালি ও চেকোস্লোভাকিয়া। ম্যাচের ৭১ মিনিটে গোল করে চেকোস্লোভাকিয়াকে এগিয়ে দিলে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো গ্যালারি। হারের শঙ্কা যখন জেঁকে বসেছে, ঠিক তখনই ৮১ মিনিটে রাইমুন্ডো ওরসি গোল করে ইতালিকে সমতায় ফেরান। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের ৯৫ মিনিটে অ্যাঞ্জেলো শিয়াভিওর সেই ঐতিহাসিক গোল ইতালিকে এনে দেয় প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি।
ইতালি ২-১ ব্যবধানে জিতে চ্যাম্পিয়ন হলেও অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সেই আসরের নৈতিক বিজয়ী ছিল ওয়ান্ডার টিম খ্যাত অস্ট্রিয়া কিংবা চেকোস্লোভাকিয়া। তবুও কোচ ভিত্তোরিও পোজোর হাত ধরে আজ্জুরিদের সেই জয়টি ছিল ইতালিয়ান ফুটবলের স্বর্ণযুগের সূচনা, যারা চার বছর পর ১৯৩৮ সালেও নিজেদের শিরোপা ধরে রেখেছিল।
এই বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ঘটেছিল এক মজার ঘটনা। সে বছরের ৩১ মে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্বের ম্যাচে পরস্পরের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল দুই শক্তিশালী দল ইতালি ও স্পেন। ম্যাচের ৩০তম মিনিটে গোল করে স্প্যানিশদের এগিয়ে নেন রেগুইরো। অবশ্য বেশিক্ষণ পিছিয়ে থাকেনি ইতালিয়ানরাও। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান ফেরারি। ম্যাচটি শেষও হয়েছিল ১-১ ব্যবধোনেই।
ফলাফল না আসায় ১ জুন আবারও মাঠে নামে দুদল। নতুন করে শুরু হওয়া এই ম্যাচে স্পেনকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে সেমির টিকিট কেটেছিল ইতালি।

১৯৩৪ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারটি জিতেছিলেন চেকো স্লাভিয়ার কিংবদন্তি ফুটবলার ওড্রিচ নেজেডলি। টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ পাঁচটি গোল করেছিলেন তিনি। এছাড়া চারটি করে গোল করে যথাক্রমে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন জার্মানির এডমুন্ড কোনেন এবং ইতালির অ্যাঞ্জেলো স্কিয়েভিও। আর তিনটি করে গোল করেন রাইমুন্ডো ওরসি ও লেওপোল্ড কেইহোলচ।
রাজনৈতিক বিতর্ক ছাপিয়ে ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ আজও মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে ফুটবলকে শক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছিল এবং কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও বিশ্বসেরার মুকুট পরেছিল ইতালিয়ানরা।
এমএমএম/

