ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে আমরা অনেক রোমাঞ্চকর, শ্বাসরুদ্ধকর এবং নাটকীয় ফাইনাল দেখেছি। কিন্তু আপনি কি জানেন বিশ্বকাপের এমন একটি আসর ছিল, যেখানে যেখানে কোনো ফাইনাল ম্যাচ? হ্যাঁ, শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের সেই একমাত্র ব্যতিক্রমী আসর, যা কোনো ফাইনাল ছাড়াই বিশ্বকে দিয়েছিল এক নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
তবে ভাগ্যে নির্মম পরিহাসে টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচটিই শেষ পর্যন্ত রূপ নিয়েছিল ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত, রোমাঞ্চকর এবং ট্র্যাজিক এক অলিখিত ফাইনালে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা কাটিয়ে ১২ বছর পর যখন ফুটবল বিশ্বকাপ আবার মাঠে ফিরল, তখন ফিফা এবং আয়োজক ব্রাজিল একদম ভিন্নধর্মী এক পরিকল্পনা হাতে নেয়। নকআউট পদ্ধতিতে ভাগ্য নির্ধারণের বদলে তারা রাউন্ড রবিন বা লিগ পদ্ধতির চূড়ান্ত পর্ব চালু করে।
নিয়ম অনুযায়ী, গ্রুপ পর্বের বাধা টপকে আসা সেরা চার দল (ব্রাজিল, উরুগুয়ে, স্পেন ও সুইডেন) নিয়ে একটি ফাইনাল রাউন্ড গঠন করা হয়। এই চার দল একে অপরের মুখোমুখি হবে এবং তিন ম্যাচ শেষে যে দল পয়েন্ট তালিকায় শীর্ষে থাকবে, তাদের হাতেই উঠবে জুলে রিমে ট্রফি। অর্থাৎ, গ্রুপ পর্বের মতোই আরেকটি গ্রুপের মাধ্যমে বিশ্বসেরা নির্ধারণ করার এই সিদ্ধান্তেই লুকিয়ে ছিল বড় চমক।

চূড়ান্ত লিগ পর্বে ঘরের মাঠে ব্রাজিল ছিল রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য। তারা নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে সুইডেনকে ৭-১ এবং স্পেনকে ৬-১ গোলে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে আসন গেড়ে বসে। অন্যদিকে, উরুগুয়ের পথটা এত মসৃণ ছিল না; তারা স্পেনের সাথে ২-২ গোলে ড্র করার পর সুইডেনের বিপক্ষে কোনোমতে ৩-২ ব্যবধানে কষ্টার্জিত জয় পায়।
১৬ জুলাই ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচের আগে সমীকরণ দাঁড়ায় অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তৎকালীন নিয়মে জয়ের জন্য দেওয়া হতো ২ পয়েন্ট। ফলে দুই ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের পয়েন্ট ছিল ৪ এবং উরুগুয়ের ৩। শিরোপা নিশ্চিত করতে শেষ ম্যাচে ব্রাজিলের জন্য শুধু একটি ‘ড্র’ করলেই চলত, কিন্তু উরুগুয়ের জন্য জয় ছাড়া কোনো বিকল্প রাস্তা খোলা ছিল না। কাগজে-কলমে কোনো ফাইনাল না থাকলেও লিগের এই শেষ ম্যাচটিই কার্যত রূপ নেয় টুর্নামেন্টের অলিখিত এক মেগা ফাইনালে।
পুরো ব্রাজিল তখন উৎসবে মাতোয়ারা। খেলার প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকলেও ৪৭তম মিনিটে ফ্রিয়াকার গোলে লিড নেয় ব্রাজিল। কিন্তু ৬৬তম মিনিটে উরুগুয়ের হুয়ান আলবার্তো শিয়াফিনো গোল করে সমতা ফেরান। আর ম্যাচের ১১ মিনিট বাকি থাকতে ঘটে সেই অঘটন। উরুগুয়ের উইঙ্গার আলসিডেস গিঘিয়া এক অবিশ্বাস্য কোণ থেকে গোল করে ব্রাজিলকে পিছিয়ে দেন। ২-১ ব্যবধানে জিতে উরুগুয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।

এই হারের পর ব্রাজিল এতটাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল যে, তারা তাদের তৎকালীন সাদা জার্সিটিকে অশুভ ঘোষণা করে এবং চিরতরে বর্জন করে। ১৯৫৪ সাল থেকে তারা আজকের বিখ্যাত হলুদ ও নীল জার্সি পরা শুরু করে।
ভারতের জুতা বিতর্ক ও অনুপস্থিতি
১৯৫০ সালের এই বিশ্বকাপের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক ছিল এশিয়ার একমাত্র দল হিসেবে ভারতের খেলার সুবর্ণ সুযোগ পাওয়া। কিন্তু তৎকালীন সময়ে ভারতীয় ফুটবলাররা সাধারণত খালি পায়ে খেলতে অভ্যস্ত ছিলেন। ফিফা বিশ্বকাপে জুতো পরে খেলার কড়াকড়ি নিয়ম জারি করায় এবং সেই সাথে দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার বিশাল খরচের অজুহাতে ভারত শেষ মুহূর্তে টুর্নামেন্ট থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে এশিয়ার ফুটবল ইতিহাসের এক বড় আক্ষেপের অধ্যায় হয়ে রয় ১৯৫০ সালের এই বিশ্বকাপ।
এমএমএম/

