বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ এক চিরভাস্বর ও অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এই আসরটি কেবল লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি ব্রাজিলের প্রথম সোনালী ট্রফি জয়ের জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এটি ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সম্রাট পেলের রাজকীয় ও জাদুকরী অভিষেকের জন্য। ১৯৫০ সালের ঘরের মাঠের সেই বিভীষিকাময় মারাকানা ট্র্যাজেডির ক্ষত বুকে নিয়ে সুইডেনের মাটিতে পা রাখা ব্রাজিল যেভাবে পুরো বিশ্বকে নিজেদের পায়ের জাদুতে মোহিত করেছিল, তার গল্প যেকোনো রূপকথাকেও হার মানায়।
মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর কীভাবে পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিতে পারে, তার প্রমাণ দিয়েছিলেন পেলে। ইনজুরির কারণে প্রথম দুই ম্যাচ মিস করার পর সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে অভিষেক হয় তার।
এরপর নকআউটে শুরু হয় পেলের একক রাজত্ব। কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েলসের বিপক্ষে ম্যাচের একমাত্র জয়সূচক গোলটি করে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড গড়েন তিনি। এখানেই শেষ নয়, সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সের বিপক্ষে পেলের চোখধাঁধানো হ্যাটট্রিক এবং ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে পেলের জোড়া গোল ব্রাজিলকে এনে দেয় তাদের বহুকাঙ্ক্ষিত প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা।

ফাইনালে ডিফেন্ডারদের মাথার ওপর দিয়ে বল চিপ করে নেওয়া পেলের সেই অবিশ্বাস্য গোলটি আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দৃশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
এদিকে ১৯৫৮ বিশ্বকাপকে স্মরণ করা হয় ফরাসি স্ট্রাইকার জ্যাঁ ফন্টেইনের অবিশ্বাস্য এক রেকর্ডের জন্য। এক আসরে সর্বোচ্চ ১৩টি গোল করার রেকর্ড গড়েন তিনি, যা আজ পর্যন্ত কেউ ভাঙতে পারেনি। তার অসাধারণ নৈপুণ্যে ফ্রান্স সে আসরে তৃতীয় স্থান অধিকার করে।
এই বিশ্বকাপেই বিশ্ব ফুটবল প্রথম পরিচিত হয় ইতিহাসের অন্যতম সেরা উইঙ্গার গারিঞ্চার ড্রিবলিং জাদুর সাথে। এক পায়ের জন্মগত ত্রুটি নিয়েও মাঠের ডানপ্রান্ত দিয়ে গারিঞ্চার সেই ডিফেন্ডারদের বোকা বানানোর ড্রিবলিং ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করেছিল।
পেলে এবং গারিঞ্চার এই যুগলবন্দী মাঠে যে নান্দনিক ও ছন্দময় ফুটবল উপহার দিয়েছিল, ফুটবল বিশ্বে তা-ই পরিচিতি পায় জোগো বনিতো বা সুন্দর ফুটবল নামে।
ফাইনালের মহারণ বসেছিল স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে। ঘরের মাঠে সুইডিশদের কোনো সুযোগই দেয়নি সেলেসাওরা। ফাইনালে সুইডেনকে ৫-২ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়ে ব্রাজিল প্রথম দল হিসেবে নিজেদের মহাদেশের (লাতিন আমেরিকা) বাইরে ইউরোপের মাটিতে গিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের এক অনন্য কীর্তি গড়ে।
সুইডেন বিশ্বকাপ থেকেই ৪-২-৪ ফরমেশনের আধুনিক ফুটবলের প্রচলন শুরু হয়। এছাড়া এটিই ছিল প্রথম বিশ্বকাপ, যা টেলিভিশনের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড- যুক্তরাজ্যের এই চারটি দেশই প্রথম এবং শেষবারের মতো একই সাথে মূল পর্বে অংশ নিয়েছিল।

১৯৫৮ বিশ্বকাপ ফুটবলকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। মারাকানা ট্র্যাজেডির ক্ষত মুছে ব্রাজিল যেভাবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের রাজা হিসেবে ঘোষণা করেছিল, তার শুরুটা ছিল এই সুইডেনের মাটি।
এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ, যা টেলিভিশনের পর্দার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে সম্প্রচার করা হয়েছিল। ফলে ফুটবল খেলাটি গুটিকয়েক গ্যালারির দর্শক ছাড়িয়ে বৈশ্বিক বিনোদনের রূপ নেয়। আর ফুটবল ইতিহাসের প্রথম এবং শেষবারের মতো যুক্তরাজ্যের চারটি দেশ- ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড একই সঙ্গে কোনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল।
মারাকানার কান্নার জল মুছে সুইডেনের মাটিতে ব্রাজিলের এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন কেবল একটি ট্রফি জয় ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্ব ফুটবলে সাম্বার একচ্ছত্র সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
এমএমএম/

