ইতালির বিপক্ষে প্লে-অফ ফাইনালের সময় জেনিকার গ্যালারিতে ভক্তরা গেয়েছিল— ‘আমি বসনিয়া থেকে এসেছি, আমাকে আমেরিকায় নিয়ে যাও।’ তাদের সেই চাওয়া ঠিক পূরণ হয়েছে, কারণ বসনিয়া-হার্জেগোভিনা সত্যিই ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নিতে কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে। সেমিফাইনালে ওয়েলসকে পেনাল্টিতে হারানোর পর তারা ইতালির বিপক্ষেও একই বীরত্ব দেখিয়ে ২০১৪ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে।
১৯৯৩ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর গঠিত এই জাতীয় দলটি এর আগে ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের প্লে-অফে পর্তুগালের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। এরপর তারা সরাসরি ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে এবং সেই সময়ে ফিফা র্যাংকিংয়ে অষ্টম স্থান পর্যন্ত উঠেছিল।
কোচ সের্গেই বারবারেজের নেতৃত্ব এবং অধিনায়ক ও সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা এডিন জেকোর অনুপ্রেরণায় এক নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা বিশ্বমঞ্চে যাচ্ছে।
প্রধান কোচ: সের্গেই বারবারেজ
বারবারেজের খেলোয়াড় জীবন মোস্তারে শুরু হলেও তিনি পরিচিতি পান বুন্দেসলিগায়। একজন সৃজনশীল এবং অপ্রথাগত ‘নাম্বার টেন’ হিসেবে তিনি ইউনিয়ন বার্লিন, বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, হামবুর্গ এবং বায়ার লেভারকুসেনের মতো ক্লাবের হয়ে খেলেছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ১৯৯৮ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ৪৭ ম্যাচে তিনি ১৭টি গোল করেছেন। ২০২৪ সালে তিনি জাতীয় দলের কোচ হিসেবে নিযুক্ত হন, যা তার বড় কোনো দলের কোচ হিসেবে প্রথম দায়িত্ব। মাঠের বাইরে তিনি একজন দক্ষ কৌশলীও বটে; ৫৪ বছর বয়সী এই কোচ ফুটবল থেকে অবসরের পর পেশাদার পোকার খেলোয়াড় হিসেবেও নাম কুড়িয়েছেন।

উদীয়মান প্রতিভা এবং অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে ৪-৪-২ ফরমেশনে খেলিয়ে বারবারেজ বসনিয়াকে ইউরোপীয় বাছাইপর্বের ‘গ্রুপ এইচ’-এ দ্বিতীয় স্থানে নিয়ে আসেন, যেখানে তারা ৮ ম্যাচে ১৭ পয়েন্ট সংগ্রহ করে।
২০২৬ বিশ্বকাপে সূচি
১২ জুন: কানাডা বনাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা — টরন্টো স্টেডিয়াম
১৮ জুন: সুইজারল্যান্ড বনাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা — লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম
২৪ জুন: বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা বনাম কাতার — সিয়াটল স্টেডিয়াম
বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: উয়েফা
সেরা সাফল্য: গ্রুপ পর্ব (২০১৪)
সর্বশেষ বিশ্বকাপ: ২০১৪
প্রথম বিশ্বকাপ: ২০১৪
অংশগ্রহণ: ১ বার (২০১৪)
টানা অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা: ১ বার (২০২৬)
সামগ্রিক রেকর্ড: ম্যাচ ৩, জয় ১, ড্র ০, হার ২, গোল করেছে ৪, গোল খেয়েছে ৪।
ফিফা র্যাংকিং: ৬৫
প্রথম বিশ্বকাপ
বসনিয়ার বিশ্বকাপ অভিষেক ঘটে ২০১৪ সালে, যেবার মিরালেম পিয়ানিচ, সেয়াদ কোলাসিনাচ, জেকো ও আসমির বেগোভিচের মতো এক প্রতিভাবান প্রজন্ম খেলেছিল। সাফেট সুসিচের কোচিংয়ে তারা বাছাইপর্বে লিথুয়ানিয়াকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়।
ব্রাজিলে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে ২-১ ব্যবধানে হেরে তারা অভিযান শুরু করে। তবে ইবিসেভিচের করা দেশের প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি তারা উদযাপন করেছিল। নাইজেরিয়ার কাছে পরবর্তী হারে শেষ ১৬-এর আশা শেষ হয়ে গেলেও, ইরানের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের জয় তাদের টুর্নামেন্টে একটি সম্মানজনক শেষ এনে দেয়।
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা
জেকোর লক্ষ্য থাকবে এবারের আসরে নিজেকে এককভাবে শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার। তবে বর্তমানে চারজন খেলোয়াড় যৌথভাবে এই রেকর্ডের মালিক। ২০১৪ বিশ্বকাপে ইবিসেভিচ (আর্জেন্টিনার বিপক্ষে), পিয়ানিচ, জেকো ও ভ্রসায়েভিচ (ইরানের বিপক্ষে) প্রত্যেকে একটি করে গোল করেছিলেন।

বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়
ব্রাজিলের সেই আসরে ছয়জন খেলোয়াড় তিনটি ম্যাচেই অংশ নিয়েছিলেন: গোলরক্ষক বেগোভিচ, ডিফেন্ডার মুহামেদ বেশিচ ও এমির স্পাহিচ, মিডফিল্ডার পিয়ানিচ এবং ফরোয়ার্ড ইবিসেভিচ ও জেকো। জেকো এবার উত্তর আমেরিকায় এককভাবে এই তালিকার শীর্ষে ওঠার সুযোগ পাবেন।
বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলকিপার: নিকোলা ভাসিল, মার্টিন জ্লোমিসলিচ, ওসমান হাদঝিকিচ।
ডিফেন্ডার: সিয়াদ কোলাশিনাক, আমার দেদিচ, নিহাদ মুয়াকিচ, নিকোলা কাতিচ, তারিক মুহারোমোভিচ, স্তেপান রাদেলিচ, ডেনিস হাদঝিকাদুনিচ, নিদাল চেলিক।
মিডফিল্ডার: আমির হাদঝিয়াহমেতোভিচ, ইভান সুঞ্জিচ, ইভান বাসিচ, জেনিস বুর্নিচ, এরমিন মাহমিচ, বেনিয়ামিন তাহিরোভিচ, আমার মেমিচ, আরমিন গিগোভিৎস, কেরিম আলাইবেগোভিৎস, এস্মির বাজরাকতারেভিচ।
ফরোয়ার্ড: এরমেদিন দেমিরোভিচ, জোভো লুকিচ, সামেদ বাজদার, হারিস তাবাকোভিচ, এডিন জেকো।
এফএইচএম

