৪০ বছরের দীর্ঘ এক অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর দীর্ঘ চার দশক ধরে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা আর রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক সংকটের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গিয়েছিল ইরাকি ফুটবল। অবশেষে মেক্সিকোর মাটিতেই প্লে-অফ ম্যাচে বলিভিয়াকে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে লায়নস অব মেসোপটেমিয়া খ্যাত ইরাক।
চার দশক আগে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ে, বেলজিয়াম এবং স্বাগতিক মেক্সিকোর কাছে তিন ম্যাচেই হেরে বিদায় নিয়েছিল ইরাক। ৪০ বছর পর আবারও বিশ্বমঞ্চে ফিরলেও তাদের গ্রুপটি এবার আরও কঠিন। গ্রুপ আই-তে ইরাকের প্রতিপক্ষ আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে, সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এবং আফ্রিকার সেনেগাল।
১৯৮৬ সালের দলের তুলনায় বর্তমান ইরাক দলটি অনেক বেশি আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। দলে রয়েছেন ইংলিশ ক্লাব ইপসউইচ টাউনের আলি আল হামাদি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক ও বর্তমানে ডাচ ক্লাব উট্রেখটের মিডফিল্ডার জিদান ইকবাল এবং ডেনিশ লিগজয়ী কেভিন ইয়াকুবদের মতো ইউরোপ মাতানো তারকারা।
তবে ইরাকের এই রূপকথার পেছনের মূল কারিগর তাদের ৬২ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড। ২০২২ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয় রাউন্ডে তোলা এই অভিজ্ঞ কোচ ২০২৫ সালে ইরাকের দায়িত্ব নেন। তার অধীনেই বাছাইপর্বের দীর্ঘ ২১ ম্যাচের কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বলিভিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয় ইরাক।

ইরাকে ফুটবলের প্রতিভার অভাব না থাকলেও মাঠের বাইরের পরিস্থিতি বারবার তাদের স্বপ্নকে গলা টিপে ধরে। ১৯৮৪ সালে ইরাকের তৎকালীন স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেন তার বড় ছেলে উদয় হোসেনকে ইরাকি ফুটবল ফেডারেশনের দায়িত্ব দেন। এরপরই জাতীয় দলের ওপর শুরু হয় এক বিভীষিকাময় শাসন ও নির্যাতন।
২০০৩ সালে সাদ্দাম সরকারের পতনের পর ফুটবলারদের ওপর হওয়া সেই ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র প্রকাশ পায়। ম্যাচ হারলে বা খারাপ খেললে উদয় হোসেনের নির্দেশে খেলোয়াড়দেরকংক্রিটের তৈরি ভারী বল দিয়ে অনুশীলন করতে বাধ্য করা হতো। এছাড়া চাবুক মারা হতো এবং অন্ধকার কারাগারে বন্দি করে রাখা হতো।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের তারকা করিম আলাউই সেই অন্ধকার সময় নিয়ে বিস্তারিত বলতে না চাইলেও সংক্ষেপে বলেন, ‘সেটি ছিল চরম এক পুরস্কার ও শাস্তির সময়।
২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকে যে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়, তার প্রভাব পড়ে ফুটবলেও। দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিফা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরাক তাদের ঘরের মাঠের কোনো ম্যাচ বাগদাদে খেলতে পারেনি। জর্ডান, মালয়েশিয়া বা ইরানের মতো নিরপেক্ষ ভেন্যুকে হোম ভেন্যু বানাতে হয়েছিল তাদের। ২০২০ সালের মার্চে ফিফা অবশেষে বসরা শহরের স্টেডিয়ামকে সবুজ সংকেত দেয়।

এমনকি ২০২৬ সালের মার্চেও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মেক্সিকোতে বলিভিয়ার বিপক্ষে প্লে-অফ ম্যাচটি প্রায় স্থগিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কোচ আর্নল্ড ও বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় দেশ ছাড়তেই মারাত্মক হিমশিম খেয়েছিলেন। তবে সব বাধা পেরিয়ে মেক্সিকোর মাটিতে জয় ছিনিয়ে যখন দলটি বাগদাদে ফেরে, তখন ছাদখোলা বাসে লাখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় আর উল্লাসে পুরো ফুটবল বিশ্বকে নাড়া দেয়।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে আহমেদ রাধির একটি নিশ্চিত গোল রেফারি হাফ-টাইমের বাঁশি বাজানোর অজুহাতে বাতিল করে দিয়েছিলেন, যা আজও ইরাকের মানুষের এক বড় আক্ষেপ। তবে এবার ইরাকের লক্ষ্য পরিষ্কার।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিশ্বকাপে একটির বেশি গোল করা হবে নতুন অর্জন। একটি ম্যাচ জেতা হবে মহৎ কীর্তি। আর পরের রাউন্ডে যেতে পারলে তা হবে এক অলৌকিক রূপকথা। দীর্ঘ ৪০ বছর পর ইরাক এখন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের চেনাতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
এমএমএম/

