বিজ্ঞাপন

১৯৬৬: ইংল্যান্ডের একমাত্র শিরোপা এবং সেই ‘ভুতুড়ে’ গোলের ইতিহাস

১৯৬৬: ইংল্যান্ডের একমাত্র শিরোপা এবং সেই ‘ভুতুড়ে’ গোলের ইতিহাস

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত এবং বিতর্কমূলক আসর হলো ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ। এই বিশ্বকাপটি কেবল ফুটবলের আদি জনক ইংলিশদের প্রথম ও একমাত্র বিশ্বজয়ের জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এটি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে ফুটবল সম্রাট পেলের প্রতি প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের নিষ্ঠুর আচরণ, পর্তুগিজ কিংবদন্তি ইউসেবিওর অতিমানবীয় উত্থান এবং ফাইনাল ম্যাচের একটির ‘ভুতুড়ে গোল’ বিতর্কের জন্য।

১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার দীর্ঘ ৩৬ বছর পর প্রথমবারের মতো ফুটবলের জন্মভূমি ইংল্যান্ডে বসেছিল বৈশ্বিক ফুটবলের এই মহোৎসব। ঘরের মাঠে খেলার কারণে ইংলিশদের সামনে যেমন ছিল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের সুবর্ণ সুযোগ, তেমনি ছিল ঘরের মাঠের দর্শকদের আকাশচুম্বী চাপ।

তবে তৎকালীন দূরদর্শী অধিনায়ক ববি মুরের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড দল পুরো টুর্নামেন্টে তাদের রক্ষণভাগকে এক দুর্ভেদ্য দেয়ালে পরিণত করেছিল। নিখুঁত পরিকল্পনা আর জমাট ডিফেন্সের ওপর ভর করে একের পর এক বাধা টপকাতে থাকে স্বাগতিকরা। ফাইনালে ওঠার মহাকাব্যিক লড়াইয়ে তারা ফুটবলবিশ্বকে মুগ্ধ করে একে একে বিদায় করে লাতিন পরাশক্তি আর্জেন্টিনা এবং ইউসেবিওর শক্তিশালী পর্তুগালকে।

১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপের মতো এই আসরেও পেলেকে নিদারুণ ইনজুরির শিকার হতে হয়। বুলগেরিয়া ও পর্তুগালের ডিফেন্ডারদের ক্রমাগত ফাউলের কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। আর ব্রাজিল বিদায় নেয় গ্রুপ পর্ব থেকেই।

ব্রাজিলের বিদায়ের পর সে আসরে ফুটবল বিশ্বকে একাই মোহিত করেন পর্তুগালের ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ খ্যাত কিংবদন্তি স্ট্রাইকার ইউসেবিও। নিজের অবিশ্বাস্য গতি, ড্রিবলিং আর নিখুঁত ফিনিশিংয়ে পুরো টুর্নামেন্টে একাই প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেন তিনি।

কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে এক সময় ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে পর্তুগাল যখন নিশ্চিত হারের মুখে, তখন একাই ৪ গোল করে দলকে ৫-৩ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য এক জয় এনে দেন ইউসেবিও। পুরো আসরে মোট ৯টি গোল করে তিনি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার (গোল্ডেন বুট) পুরস্কার জিতে নেন।

৩০ জুলাই, ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে শিরোপা নির্ধারণী ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানি। নির্ধারিত সময়ে খেলা ২-২ সমতায় শেষ হলে ম্যাচটি গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে জিওফ হার্স্টের একটি শট গোলবারের উপরের অংশে লেগে গোললাইনের ওপর (বা ভেতরে) পড়ে ফিরে আসে। রেফারি এটিকে গোল ঘোষণা করেন, যা আজও ইতিহাসের অন্যতম বড় বিতর্ক।

ম্যাচের ১০১ মিনিটে ইংল্যান্ডের স্ট্রাইকার জিওফ হার্স্টের নেওয়া একটি জোরালো শট পশ্চিম জার্মানির গোলবারের উপরের অংশে (ক্রসবার) লেগে সজোরে নিচের দিকে ড্রপ খেয়ে গোললাইনের ওপর (নাকি ভেতরে?) পড়ে মাঠের ভেতরে ফিরে আসে। জার্মানির খেলোয়াড়রা কর্নারের দাবি জানালেও, ইংরেজ ফুটবলাররা গোলের উল্লাস শুরু করেন।

মূল রেফারি গটফ্রিড ডিনস্ট লাইন্সম্যানের সাথে পরামর্শ করে এটিকে গোল ঘোষণা করেন। প্রযুক্তির ছোঁয়া না থাকা সেই যুগে এই একটি সিদ্ধান্ত ফুটবল ইতিহাসকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়, যা আজও ওয়েম্বলি গোল বা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুতুড়ে গোল হিসেবে বিতর্কিত।

এই ম্যাচেই হার্স্ট বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলারর হিসেবে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেন। ২০২২ সালের আগেই এই রেকর্ডটি ছিল অক্ষত। ওই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানে জয় নিয়ে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয় ইংল্যান্ড। এটিই তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা।

এমএমএম/