কসোভোর বিপক্ষে প্লে অফের শেষ বাঁশি বাজতেই তুর্কি শিবিরে আনন্দ ও স্বস্তির ঢেউ বয়ে গেল। ২৪ বছরে প্রথমবার ইউরোপের এই দেশটি ফিফা বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে। তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার মিশেলে এই দলটি সেদিন গর্বের মুহূর্ত তৈরি করেছিল।
কোচ ভিনসেঞ্জো মন্টেলা ১-০ গোলে কসোভোকে বধ করে বলেছিলেন, ‘আমি উত্তেজিত, খুশি এবং সবকিছুর উপরে গর্বিত। আমি প্রায় খেলোয়াড়দের বলেছি যা ঘটুক ব্যাপার না। আমি তাদেরকে কোনো কিছুর জন্য বিকিয়ে দিতে চাই না। তারা দুর্দান্ত টিম স্পিরিট দেখিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত লড়েছে।’
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে তুরস্ক তৃতীয়বারের মতো অংশগ্রহণ করছে। শেষবার তারা বিশ্বকাপে খেলেছিল ২০০২ সালে, যখন সেনল গুনেসের দল পরবর্তীতে চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের কাছে সেমিফাইনালে পরাজিত হয়। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে যৌথ আয়োজক কোরিয়া রিপাবলিককে উড়িয়ে দিয়েছিল তারা।

প্রধান কোচ : ভিনসেঞ্জো মন্টেলা
২০২৩ সালে চতুর্থ ইতালিয়ান হিসেবে তুরস্কের কোচ হন ভিনসেঞ্জো মন্টেলা। খেলোয়াড় হিসেবে সাবেক স্ট্রাইকার ইতালির জার্সি পরেছিলেন ২০ ম্যাচে এবং ২৮৬ সিরি আ ম্যাচে গোল ছিল ১৪১টি। ২০০১ সালে রোমার সঙ্গে স্কুদেত্তোও জেতেন।
২০০৯ সালে রোমান্স একাডেমিতে মন্টেলার কোচিং ক্যারিয়ারের শুরু। দুই বছর পর প্রধান কোচ নির্বাচিত হন। এসি মিলান, ফিওরেন্তিনা ও সেভিয়ার পর তুর্কি ক্লাব আদানা দেমির্সপোরে যোগ দেন। সেখানে তিনি এতটাই নজর কাড়েন যে, দুই বছর পর তুরস্কের হেড কোচ হন। ভক্তদের কাছে বেশ সুপরিচিত ও সম্মানিত মন্টেলা: ‘নিজেকে একজন তুর্ক মনে হয় এবং তুর্কিদের মতো চিন্তা করি।’
তুরস্কের বিশ্বকাপ সূচি
১৪ জুন: তুরস্ক বনাম অস্ট্রেলিয়া (ভ্যাঙ্কুভার)
২০ জুন: তুরস্ক বনাম প্যারাগুয়ে (সান ফ্রান্সিসকো)
২৬ জুন: তুরস্ক বনাম যুক্তরাষ্ট্র (লস অ্যাঞ্জেলেস)
তুরস্কের বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: উয়েফা
বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য: তৃতীয় স্থান (২০০২)
সর্বশেষ বিশ্বকাপ: কোরিয়া/জাপান ২০০২ (তৃতীয় স্থান)
প্রথম বিশ্বকাপ: ১৯৫৪
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ৩ বার (১৯৫৪, ২০০২, ২০২৬)
বিশ্বকাপের সামগ্রিক রেকর্ড: ম্যাচ খেলেছে ১০টি; জয় ৫টি, ড্র ১টি, হার ৪টি; গোল করেছে ২০টি, গোল হজম করেছে ১৭টি।
ফিফা র্যাংকিং: ২২তম

তুরস্কের প্রথম বিশ্বকাপ
তুরস্ক প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল ১৯৫০ সালে। কিন্তু নাম প্রত্যাহার করে নেয় তারা। চার বছর তাদের অভিষেক হয়, এর সাথে কিছুটা ভাগ্যও জড়িত ছিল। কোয়ালিফায়ারে স্পেনের সমান পয়েন্ট নিয়ে শেষ করে তুরস্ক। পরে প্লে অফেও দুই দলকে আলাদা করা যায়নি। নিরুপায় হয়ে স্টেডিয়ামের এক কর্মীর ১৪ বছর বয়সী সন্তানকে লটারির ড্র করতে দেওয়া হয়, সেখানেই ‘তুরস্ক’ নাম ওঠে।
বিশ্বকাপে দলের কোচ ছিলেন ইতালিয়ান সান্দ্রো পুপ্পো। লিড নিলেও প্রথম গ্রুপ ম্যাচে তারা হেরে যায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানির কাছে। তারপর কোরিয়া রিপাবলিককে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দেয় তুর্কি। বুরহান সারগুন করেন হ্যাটট্রিক। গ্রুপ টেবিলে তুরস্ক পশ্চিম জার্মানির সমপর্যায়ে ছিল। কিন্তু প্লে অফে জার্মানরা ৭-২ গোলে জেতে।
তুরস্কের শেষ বিশ্বকাপ
শেষবার তারা বিশ্বকাপে খেলেছিল ২০০২ সালে, যখন সেনল গুনেসের দল পরবর্তীতে চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের কাছে সেমিফাইনালে পরাজিত হয়। গ্রুপ পর্বে সেলেসাওদের বিপক্ষে লিড নিয়েও হেরেছিল ২-১ গোলে। তারপর কোস্টারিকার সঙ্গে ড্র ও চীনকে উড়িয়ে দেয়। কোস্টারিকার সমান পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে কোস্টারিকাকে টপকে নকআউট নিশ্চিত করে। জাপান, সেনেগালকে বিদায় করে সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হারে ১-০ গোলের ছোট্ট ব্যবধানে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে যৌথ আয়োজক কোরিয়া রিপাবলিককে ৩-২ গোলে হারিয়ে সেরা সাফল্য পায় তারা।

তুরস্কের শীর্ষ বিশ্বকাপ গোলদাতা
সুয়াত মামাত, বুরহান সার্গুন ও ইলহান মানসিজের নামের পাশে বিশ্বকাপের তিনটি গোল। মামাত ও সার্গুন উভয়েই ১৯৫৪ সালে তিনটি করে গোল করেন। এবং ২০০২ সালে মানসিজ এই কীর্তি গড়েন।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়রা
ফাতিহ আকিয়েল, ইলদিরাভ বাসতুর্ক, উমিত দাভালা, তুগাই কেরিমোগলু, ইলহান মানসিজ, রুস্তু রেকবার ও হাকান সুকুর—সবাই সাতটি করে ম্যাচ খেলেছেন ২০০২ বিশ্বকাপে। তুরস্কের হয়ে রেকর্ডসংখ্যক ম্যাচ খেলেছেন তারা।
বিশ্বকাপে তুরস্কের সবচেয়ে বড় জয়
বিশ্বকাপ ইতিহাসে গোলবন্যার আসর ছিল ১৯৫৪ সালে। ওইবার হাঙ্গেরি দক্ষিণ কোরিয়া ও পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৯-০ ও ৮-৩ গোলে জিতেছিল। এছাড়া উরুগুয়ে ৭-০ গোলে স্কটল্যান্ডকে ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অস্ট্রিয়ার মহাকাব্যিক ৭-৫ ব্যবধানে জয়ও ছিল।
তুরস্কও বাদ পড়েনি। গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ কোরিয়াকে বিপক্ষে ৭-০ গোলে জিতেছিল। বুরহান সার্গুন হ্যাটট্রিক করেন। সুয়াত মামাত করেন জোড়া গোল।

তুরস্ক ৩৫ জনের স্কোয়াড
গোলকিপার- আলতায় বাইয়িন্দির, এরসিন দেস্তানোউলু, মের্ত গুনক, মুহাম্মেদ শেংজের, উগুরচান চাকির
ডিফেন্ডার- আবদুলকেরিম বারদাকচি, আহমেতজান কাপলান, চাগলার সোয়ুনচু, এরেন এলমালি, ফেরদি কাদিওগ্লু, মেরিহ দেমিরাল, মের্ত মুলদুর, মুস্তাফা এস্কিহেল্লাচ, ওজান কাবাক, সামেত আকায়দিন, ইউসুফ আকচিচেক, জেকি চেলিক
মিডফিল্ডার- আতাকান কারাজোর, দেমির এজে তিকনাজ, হাকান চালহানওগ্লু, ইসমাইল ইউকশেক, কান আয়হান, ওরকুন কোকচু, সালিহ ওজকান
ফরোয়ার্ড- আরাল সিমসির, আর্দা গুলের, বারিশ আলপার ইলমাজ, ক্যান উজুন, ডেনিজ গুল, ইরফান কান কাহভেচি, কেনান ইয়িলদিজ, কেরেম আক্তুরকোগলু, ওগুজ আয়দিন, ইউনুস আকগুন, ইউসুফ সারি।
এফএইচএম

