২০১৭ ক্যারিবিয়ান কাপ জেতার পথে জ্যামাইকাকে ২-১ গোলে হারিয়ে তাদের প্রথম কনকাকাফ গোল্ড কাপে জায়গা করে নিয়েছিল, কুরাসাও সেই সাফল্য পাওয়ার ১০ বছরও পার হয়নি। সেই জ্যামাইকার বিপক্ষেই আরেকটি ফলাফল ‘ব্লু ওয়েভ’দের জন্য আরও বড় এক ইতিহাস বয়ে এনেছে, যা ফুটবল বিশ্বে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
কনকাকাফ বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে কিংস্টনে গোলশূন্য ড্র করে কুরাসাও ‘গ্রুপ বি’-এর শীর্ষস্থান দখল করে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে। এর মাধ্যমে মাত্র দেড় লাখ জনসংখ্যার এবং ১৭১ বর্গমাইল আয়তনের এই দেশটি বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্রে পরিণত হলো।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলেসের উত্তরসূরি হিসেবে কুরাসাও প্রথমবার ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে অংশ নেয়। তাদের অনেক খেলোয়াড় নেদারল্যান্ডসে খেললেও বংশগতভাবে তারা দক্ষিণ ক্যারিবিয়ান এই দ্বীপের সন্তান। দ্রুতই তারা কনকাকাফ অঞ্চলে নিজেদের শক্তির জানান দেয় এবং ২০১৫ সালে মন্টসেরাটের বিপক্ষে প্রথমবার বিশ্বকাপের দুই লেগের বাছাইপর্বে জেতে।
২০১৯ সালে গোল্ড কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানো তাদের সাফল্যের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের বাছাইপর্বেও তারা প্রায় শেষ ধাপ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু পানামার কাছে দুই লেগে ২-১ ব্যবধানে হেরে তারা অল্পের জন্য বিদায় নেয়।
২০২৬ আসরের সহ-আয়োজক কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সুযোগ পাওয়ায় এবার বাছাইপর্বের পথ উন্মুক্ত ছিল। লিভানো কোমেনেনসিয়া এবং তাহিথ চং-এর মতো তরুণ প্রতিভাদের নৈপুণ্যে কুরাসাও সেই সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করে এমন এক যোগ্যতা অর্জন করেছে, যা পুরো ক্যারিবিয়ান ও কনকাকাফ অঞ্চলে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
কুরাসাও অধিনায়ক লিয়ান্দ্রো বাকুনা বলেছেন, ‘এটা ছোট একটা দ্বীপ, কিন্তু বড় সাফল্যে বিশ্বাস করে। দশ বছর আগে থেকে আমরা বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি এবং সেই স্বপ্ন পূরণ হলো।’
কুরাসাও প্রধান কোচ: ডিক অ্যাডভোকাট
দীর্ঘদিন ধরে রেমকো বিসেন্তিনি কুরাসাওয়ের কোচের দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমান স্কোয়াডের অধিকাংশ খেলোয়াড়ের অভিষেক তার হাতেই এবং গোল্ড কাপ ও বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে প্রথম জয়গুলোও তার অধীনেই এসেছিল। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অভিজ্ঞ ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোক্যাটকে নিয়োগ দিয়ে কুরাসাও তাদের পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনে।

অ্যাডভোক্যাট ১৯৯৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসকে কোয়ার্টার ফাইনালে এবং ২০০৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়াকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তার জাদুর ছোঁয়ায় কুরাসাও বাছাইপর্বের ১০ ম্যাচে অবিশ্বাস্যভাবে ২৮টি গোল করে—যা কনকাকাফ অঞ্চলের সব দলের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর এই দীর্ঘ পথে তারা গোল হজম করেছে মাত্র তিনটি।
তবে ব্যক্তিগত কারণে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অ্যাডভোক্যাট পদত্যাগ করলে, কুরাসাও তাদের আরেক স্বদেশী ফ্রেড রুটেনের হাতে দলের দায়িত্ব তুলে দেয়। আন্তর্জাতিক কোচ হিসেবে এটিই তার প্রথম দায়িত্ব ছিল। কিন্তু মে মাসে মাত্র দুই ম্যাচ পরই পদত্যাগ করেন রুটেন এবং বিশ্বকাপের এক মাস আগে এই দায়িত্বে ফিরে আসেন অ্যাডভোকাট।
বিশ্বকাপে কুরাসাওয়ের সূচি
১৪ জুন: জার্মানি বনাম কুরাসাও — হিউস্টন স্টেডিয়াম
২০ জুন: ইকুয়েডর বনাম কুরাসাও — কানসাস সিটি স্টেডিয়াম
২৫ জুন: কুরাসাও বনাম আইভরি কোস্ট — ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম
কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: কনকাকাফ
প্রথম বিশ্বকাপ: ২০২৬
অংশগ্রহণ: ১ বার (২০২৬)
ফিফা র্যাঙ্কিং: ৮৩তম।
যেভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিলো কুরাসাও
বাছাইপর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডে বার্বাডোজকে ৪-১ গোলে হারিয়ে তারা যাত্রা শুরু করে। ম্যাচে রানগেলো জাঙ্গা হ্যাটট্রিক করেন। এরপর আরুবাকে ২-০ গোলে হারায় তারা। এক বছর পর সেন্ট লুসিয়াকে ৪-০ এবং হাইতিকে ৫-১ ব্যবধানে বিধ্বস্ত করে তারা চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছায়।
তৃতীয় ও শেষ রাউন্ডে জ্যামাইকা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং বারমুডার মতো শক্তিশালী দলগুলোর সাথে 'গ্রুপ বি'-তে পড়েও কুরাসাও একবারের জন্যও দমে যায়নি। ত্রিনিদাদের সাথে ০-০ ড্র দিয়ে শুরু করার পর তারা বারমুডাকে ৩-২ গোলে হারায়। অক্টোবর উইন্ডোতে জ্যামাইকার বিপক্ষে ২-০ গোলের দাপুটে জয় পুরো ফুটবল বিশ্বকে বার্তা দেয় যে তারা কতটা শক্তিশালী। নভেম্বর উইন্ডোর শুরুতে বারমুডাকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর জ্যামাইকার মাটিতে সেই মহানাটকীয় ড্র তাদের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপের টিকিট এনে দেয়।
অভিজ্ঞ গোলরক্ষক এলোয় রুম ও রক্ষণভাগের অটল দেয়াল জ্যামাইকার সব আক্রমণ নস্যাৎ করে দিয়ে এই মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখেন।

ভিন দেশে জন্ম, খেলছে কুরাসাওয়ের জার্সিতে
কুরাসাওয়ের ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ২৫ জনেরই জন্ম নেদারল্যান্ডসে। একমাত্র তাহিথ চং ছাড়া পুরো স্কোয়াডের সবার জন্মই সেখানে। চং কুরাসাওয়ে জন্ম নিলেও তার ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছে ইউরোপে ও তিনি নেদারল্যান্ডসের অনূর্ধ্ব ২১ দলের হয়েও খেলেছেন।
কুরাসাও বিশ্বকাপ দল
গোলরক্ষক- টাইরিক বডাক, ট্রেভর ডুর্নবুশ, এলয় রুম
ডিফেন্ডার- রিশেদলি বাজোয়ার, জোশুয়া ব্রেনেট, রোশন ভ্যান আইজমা, শেরেল ফ্লোরানুস, ডেভেরন ফোনভিল, জুরিয়েন গারি, আরমান্দো ওবিস্পো, শুরান্দি সাম্বো
মিডফিল্ডার- জুনিনহো বাকুনা, লিয়ান্দ্রো বাকুনা, লিভানো কোমেনেনসিয়া, কেভিন ফেলিদা, আরজানি মার্থা, টাইরিস নসলিন, গডফ্রিড রোমেরাতোয়ে
ফরোয়ার্ড- জেরেমি আন্তোনিসে, তাহিথ চং, কেনজি গোরে, সঁতিয়ে হ্যানসেন, জারভেন কাস্তানিয়ার, ব্র্যান্ডলি কুয়াস, জুর্গেন লোকাদিয়া, জার্ল মার্গারিথা
এফএইচএম

