ইরাকি ফুটবলের জন্য মেক্সিকো সবসময়ই একটি বিশেষ নাম হয়ে থাকবে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ফার্নান্দো কুইরার্তের সেই ভলি ইরাককে আসর থেকে বিদায় করে দেওয়ার চার দশক পর ‘লায়ন্স অফ মেসোপটেমিয়া’ আবারও বিশ্বমঞ্চে ফিরছে। উত্তর-পূর্ব মেক্সিকোর মন্টেরি শহরেই অনুষ্ঠিত ফিফা প্লে-অফ টুর্নামেন্টে জিতে তারা ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে।
মাঝের এই দশকগুলোতে ইরাক অলিম্পিকে চমক দেখিয়েছে এবং এশিয়ায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছে, কিন্তু ফুটবলের এই সর্বোচ্চ আসরে ফেরার লড়াইয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে। আহমেদ রাধি এবং হুসেইন সাইদদের মতো কিংবদন্তিদের গড়া সেই ‘মেক্সিকো প্রজন্ম’-এর ছায়া কাটিয়ে এবার আমির আল আম্মারি ও আয়মেন হুসেইনদের মতো নতুন প্রতিভা উত্তর আমেরিকায় ইরাকের ফুটবল ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায় লিখতে প্রস্তুত।
ইরাক কোচ: গ্রাহাম আরনল্ড
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে রেকর্ড ৭২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ডাগআউটে থাকা গ্রাহাম আরনল্ড এবার সেই বিরল কোচদের তালিকায় নাম লেখাতে যাচ্ছেন, যারা একই কনফেডারেশনের দুটি ভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ৬২ বছর বয়সী এই কোচ কাতার ২০২২-এ তার জন্মভূমি অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয়বারের মতো শেষ ১৬-তে নিয়ে গিয়েছিলেন। সকারুদের দায়িত্ব ছাড়ার সাত মাস পর তিনি জেসুস কাসাসের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইরাকের হাল ধরেন এবং দলটির স্তিমিত হয়ে যাওয়া স্বপ্নকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তিনি ব্রাজিলের এভারিস্তোর পর দ্বিতীয় কোচ হিসেবে বিশ্বকাপে ইরাককে পরিচালনা করবেন।

ইরাকের বিশ্বকাপ সূচি
১৬ জুন: ইরাক বনাম নরওয়ে – বোস্টন স্টেডিয়াম
২২ জুন: ফ্রান্স বনাম ইরাক – ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম
২৬ জুন: সেনেগাল বনাম ইরাক – টরন্টো স্টেডিয়াম
ইরাকের বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: এএফসি
সেরা বিশ্বকাপ: গ্রুপ পর্ব (১৯৮৬)
সর্বশেষ বিশ্বকাপ: মেক্সিকো ১৯৮৬ (গ্রুপ পর্ব)
প্রথম বিশ্বকাপ: মেক্সিকো ১৯৮৬
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ২ বার (১৯৮৬, ২০২৬)
সামগ্রিক বিশ্বকাপ রেকর্ড: ম্যাচ-৩, জয়-০, ড্র-০, হার-৩, গোল দিয়েছে-১, গোল খেয়েছে-৪
ফিফা র্যাঙ্কিং: ৫৬তম।
বিশ্বকাপে ইরাক
১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে সিডনিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ইরাকের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৮২ বিশ্বকাপের বাছাইয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৮৫ সালের শেষদিকে সিরিয়াকে দুই লেগে ৩-১ গোলে হারিয়ে তারা প্রথমবারের মতো মেক্সিকো বিশ্বকাপের টিকিট পায়।
মেক্সিকোর তোলুকাতে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তারা যখন মাঠে নামে, তখন তাদের গায়ে ছিল অপরিচিত হলুদ জার্সি। সেই ম্যাচে রোমেরিতোর গোলে ১-০ ব্যবধানে হারলেও খলিল আল্লাউই ও হুসেইন সাইদরা গোল করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। ইনজুরির কারণে হুসেইন সাইদকে সেই ম্যাচের পর দেশে ফিরে আসতে হয়। দ্বিতীয় ম্যাচে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হয় ইরাক। এনজো শিফো ও নিকো ক্লাসেনের গোলে বেলজিয়াম ২-০ তে এগিয়ে গেলেও ইতিহাস গড়েন আহমেদ রাধি। মিডফিল্ডার বাসিল গর্গিস লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার ছয় মিনিট পর নাতিখ হাশিমের পাস থেকে দারুণ এক কোণাকুণি শটে ইরাকের ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ গোলটি করেন রাধি। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ জটিলতায় মারা যান এই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। শেষ ম্যাচে আয়োজক মেক্সিকোর কাছে ১-০ গোলে হেরে তারা বিদায় নেয়। যদিও তারা তিনটি ম্যাচেই হেরেছিল, কিন্তু তার আগে ব্রাজিলে তাদের প্রস্তুতি ও মাঠের লড়াই ছিল যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক।

ইরাকের বিশ্বকাপ রেকর্ডধারী
১৯৮৬ সালের তিনটি ম্যাচেই অংশ নিয়েছিলেন ইরাকের সাতজন খেলোয়াড়। তাদের মধ্যে রহিম হামিদ তিনটি ম্যাচেই বদলি হিসেবে নেমেছিলেন। দুঃখজনকভাবে সেই প্রজন্মের চারজন তারকা—আহমেদ রাধি, নাধিম শাকের, আলী হুসেইন শিহাব ও নাতিখ হাশিম ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। ফলে বর্তমানে খলিল আল্লাউই, গানিম ওরাবি ও রহিম হামিদই ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই দলের জীবিত সদস্য যারা তিনটি ম্যাচেই খেলেছিলেন। বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেই গোলের কারণে আহমেদ রাধিই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ইরাকের একমাত্র গোলদাতা। ২০২৬ আসরে আয়মেন হুসেইন বা মোহনদ আলীরা নিশ্চয়ই এই রেকর্ডটি নিজেদের করে নিতে চাইবেন।
ইরাক বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলরক্ষক- আহমেদ বাসিল, জালাল হাসান, ফাহাদ তালিব
ডিফেন্ডার- হুসেইন আলি, মেরচাস দোস্কি, আকাম হাসেম, ফ্রান্স পুট্রোস, মুস্তাফা সাদ্দুন, রেবিন সুলাকা, জায়েদ তাহসিন, আহমেদ ইয়াহইয়া, মানাফ ইউনিস
মিডফিল্ডার- আমির আল-আম্মারি, ইউসুফ আমিন, ইব্রাহিম বায়েশ, মার্কো ফারজি, জিদান ইকবাল, জায়েদ ইসমাইল, আলি জাসিম, আহমেদ কাসিম, আইমার শের, কেভিন ইয়াকব
ফরোয়ার্ড- মোহানাদ আলি, আইমেন হুসেইন, আলি আল-হামাদি, আলি ইউসেফ।
এফএইচএম

