ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। কিন্তু ২০০৬ সালের ২৫ জুন জার্মানির ফ্রাঙ্কেনস্টেডিয়াম যেন কোনো ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের জন্য প্রস্তুত ছিল না, সেটি সেজেছিল এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ময়দান হিসেবে। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে সেদিন মুখোমুখি হয়েছিল লুইস ফেলিপে স্কোলারির পর্তুগাল এবং মার্কো ফন বাস্তেনের নেদারল্যান্ডস।
পর্তুগাল ১-০ গোলে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে টিকিট কাটলেও ফুটবল বিশ্ব সেই ম্যাচটিকে গোলের জন্য মনে রাখেনি। মনে রেখেছে ম্যাচ পরিচালনাকারী রুশ রেফারি ভ্যালেন্টিন ইভানোভের পকেট থেকে বের হওয়া রেকর্ড ১৬টি হলুদ কার্ড এবং ৪টি লাল কার্ডের জন্য! ফুটবল ইতিহাসে এই ম্যাচটি পরিচিত ‘ব্যাটল অব নিউরেমবার্গ’ নামে।
ম্যাচের বয়স তখন মাত্র সাত মিনিট। ডাচ ডিফেন্ডার খালিদ বুলাহরুজ পর্তুগালের তরুণ সেনসেশন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর উরুতে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ট্যাকল করেন। ব্যথায় মাঠেই কেঁদে ফেলেন ২১ বছর বয়সী রোনালদো এবং ম্যাচের ৩৪ মিনিটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন।

এই একটি ফাউলই পুরো ম্যাচে বারুদ ঢেলে দেয়। পর্তুগিজ খেলোয়াড়রা বুলাহরুজের ওপর ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং মাঠের ভেতর শুরু হয় প্রতিশোধের এক নোংরা খেলা।
ম্যাচ যত গড়িয়েছে, ফুটবলীয় স্কিল তত পেছনে হটেছে, আর জায়গা করে নিয়েছে স্লাইডিং ট্যাকল, ধাক্কাধাক্কি এবং কনুইয়ের আঘাত। রুশ রেফারি ইভানোভ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে একের পর এক কার্ড দেখাতে শুরু করেন। ম্যাচের শৃঙ্খলা এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে, পুরো ৯০ মিনিটে গড়ে প্রতি সাড়ে পাঁচ মিনিটে একটি করে কার্ড দেখাতে হয়েছে তাকে।
ম্যাচের প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে পর্তুগালের কস্টিনহা প্রথম লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে ডাচ ডিফেন্ডার বুলাহরুজ, পর্তুগালের মিডফিল্ডার ডেকো এবং ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে নেদারল্যান্ডসের জিওভানি ফন ব্রঙ্কহর্স্ট লাল কার্ড (দ্বিতীয় হলুদ কার্ড) দেখে মাঠের বাইরে চলে যান।

এই ম্যাচের সবচেয়ে আইকনিক এবং চিরস্মরণীয় দৃশ্যটি তৈরি হয়েছিল ম্যাচের একদম শেষ দিকে। ডেকো এবং ফন ব্রঙ্কহর্স্ট- দুজনেই লাল কার্ড দেখে মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হন।
মজার ব্যাপার হলো, তারা দুজনেই তখন ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনার সতীর্থ ছিলেন। মাঠের যুদ্ধ শেষে লাল কার্ড পেয়ে সাইডলাইনের ডাগআউটের সিঁড়িতে পাশাপাশি বসে পড়েন এই দুই তারকা। মাঠে একটু আগে যে তুমুল মারামারি হলো, তা ভুলে গিয়ে দুজনকে একসাথে বসে হাসিমুখে গল্প করতে দেখা যায়, যা ছিল সেই হিংস্র ম্যাচের সবচেয়ে সুন্দর ও অদ্ভুত এক বৈপরীত্য।
এমএমএম/

