ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো আসরটি কেবল একটি টুর্নামেন্ট ছিল ন, এটি ছিল ফুটবলের ঈশ্বরখ্যাত এক মহাতারকার অমর মহাকাব্য। ফুটবল একটি দলীয় খেলা হলেও ১৯৮৬ সালের মেক্সিকোর তপ্ত মাঠে পুরো বিশ্ব দেখেছিল কীভাবে একজন মানুষ একাই একটি দলকে টেনে নিয়ে বিশ্বজয়ের শিখরে পৌঁছে দিতে পারেন। সেই মানুষটি ছিলেন দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। নাটকীয়তা, বিতর্ক, রাজনীতি এবং পায়ের জাদুর এমন বিশ্বিাস্য মিশেল ফুটবল বিশ্ব আর কখনই দেখেনি।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের মূল আয়োজক হওয়ার কথা ছিল কলম্বিয়ার। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে তারা শেষ মুহূর্তে নাম প্রত্যাহার করে নিলে ফিফা পুনরায় মেক্সিকোকে দায়িত্ব দেয়। এর মাধ্যমে ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ আয়োজনের অনন্য গৌরব অর্জন করে মেক্সিকো।
আর এই মঞ্চেই স্বাগতিক মেক্সিকোর দর্শকদের সামনে ম্যারাডোনা উপহার দেন তার ফুটবল ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠতম প্রদর্শনী। পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার করা মোট ১৪টি গোলের মধ্যে ১০টিতেই ছিল ম্যারাডোনার সরাসরি অবদান! তিনি নিজে করেছিলেন ৫টি গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছিলেন আরও ৫টি গোল। ফুটবল ইতিহাসে কোনো একক খেলোয়াড়ের ওপর একটি দলের এতটা নির্ভরশীল থাকার নজির আর নেই।

কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার করা প্রথম গোলটি ছিল ‘হ্যান্ড অফ গড’, যা নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি। তবে ঠিক তার চার মিনিট পরেই মাঝমাঠ থেকে ছয়জন ইংলিশ খেলোয়াড়কে ড্রিবলিংয়ে কাটিয়ে করা দ্বিতীয় গোলটি ফিফার বিচারে ‘শতকের সেরা গোল’ হিসেবে ভূষিত হয়েছে।
ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত গোল ছাড়াও ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে আছে আরও কিছু বিষয়ের কারণে। উরুগুয়ের হোসে বাতিস্তা স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের মাত্র ৫৬ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড পান, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্রুততম। এদিকে ইংল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নিলেও ৬ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতে নেন গ্যারি লিনেকার।
আরও পড়ুন
এই বিশ্বকাপে গ্যারি লিনেকার (পোল্যান্ড), ইগর বেলানভ (বেলজিয়াম) এবং এমিলিও বুত্রাগুয়েনো (ডেনমার্ক) হ্যাটট্রিক করেন। এর মধ্যে বেলজিয়ামের বিপক্ষে বেলানভ হ্যাটট্রিক করেও তার দল ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয়। এদিকে এই আসরেই প্রথম কোনো আফ্রিকান ও আরব দেশ হিসেবে মরক্কো গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার গৌরব অর্জন করে।

ডেনমার্ক এই আসরেই প্রথমবার খেলতে এসে উরুগুয়ের মতো সাবেক চ্যাম্পিয়নকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয়। আর উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়।
মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে শিরোপা নির্ধারণী ফাইনাল ম্যাচে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয় পশ্চিম জার্মানি। ম্যাচের ৭৪ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে থেকে যখন জয়ের প্রহর গুনছিল, ঠিক তখনই জার্মানরা তাদের চেনা লড়াকু মানসিকতা ফিরিয়ে আনে। মাত্র ৬ মিনিটের ব্যবধানে (৭৪ ও ৮০ মিনিটে) দুটি গোল শোধ করে জার্মানি ম্যাচটিতে ২-২ সমতায় ফেরায়।
তবে জার্মানির সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেননি ম্যারাডোনা। ম্যাচের ৮৪ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে তিনজন ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে ম্যারাডোনার বাড়ানো এক জাদুকরী পাস খুঁজে নেয় হোর্হে বুরুচাগাকে। বুরুচাগা একক দৌড়ে বল জার্মানির জালে জড়িয়ে দেন। ৩-২ ব্যবধানের এই নাটকীয় জয়ে আর্জেন্টিনা তাদের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে। অন্যদিকে, ১৯৮২ সালের পর ১৯৮৬- টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেও রানার্স-আপ হয়ে মাঠ ছাড়ার এক ট্র্যাজিক রেকর্ড গড়ে পশ্চিম জার্মানি।
এমএমএম/

