‘Lionel Messi has shaken hands with paradise. The little boy from Rosario, Santa Fe, has just pitched up in heaven. He climbs into a galaxy of his own….’, ফুটবলের কবি–খ্যাত পিটার ড্রুরি অদ্ভুত আবেগ আর মায়ার মিশেলে যখন কথাগুলো বলছিলেন, ততক্ষণে লুইস লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুসিত্তিনি এবং আর্জেন্টিনার ভাগ্যটা নির্ধারণ হয়ে গেছে। দিয়েগো ম্যারাডোনার ছায়া মাড়িয়ে স্ব-নামে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন আগেই, এবার বিশ্ব ফুটবলে সর্বকালের অন্যতম সেরার তালিকায়ও উঠে গেল মেসির নাম।
আর্জেন্টিনার রোজারিও এক সময় পরিচিত ছিল মার্কসবাদী বিপ্লবী চে গুয়েভারার জন্মস্থান হিসেবে। সেই শহরে ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন জন্ম নেন মেসি। যিনি রোজারিওকে নিয়ে গেছেন আরও অনন্য উচ্চতায়, যেখানে ধর্ম-মত মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ‘গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি’ (শিশুদের উচ্চতা ঘাটতিজনিত সমস্যা) রোগে শৈশবে আক্রান্ত লিও রোজারিও ছাড়েন মাত্র ১৩ বছর বয়সে। তবে আর্জেন্টিনার এই তৃতীয় বৃহত্তম শহর আজও মেসিকে ছাড়েনি। ক্যারিয়ারের শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেও তার সেই শেকড় জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপ দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে এই আর্জেন্টাইন মহাতারকার প্রাপ্তির খাতা। এর আগে ব্যক্তিগত ও দলীয় প্রায় সকল অর্জন জমা ছিল তার পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের শোকেসে। ফুটবলের সর্বোচ্চ ট্রফিও যেহেতু তার ছোঁয়া পেয়েছে, সম্ভবত এখানেই থেমে যেতে পারতেন মেসি। কিন্তু না, বয়সটা বেড়ে চললেও মাঠে বাঁ পায়ের ছন্দময় জাদু এবং সতীর্থ-কোচ-ভক্তদের চাওয়া তাকে টেনে নিয়ে এসেছে আরেকটি মহারণ, ২০২৬ বিশ্বকাপে।
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় আগামী ১১ জুন থেকে ফিফার এই মেগা ইভেন্ট শুরু হবে। লম্বা সময় সেখানে বল পায়ে নামা নিয়ে দ্বিধা রাখলেও, সব ঠিক থাকলে নিজের ষষ্ঠ ও সম্ভবত শেষ আসর খেলতে নামছেন এলএমটেন। বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে দুই বিশ্বকাপে টুর্নামেন্টসেরার পুরস্কার জেতা মেসির বিশ্বমঞ্চে প্রথম পদার্পন ২০০৬ সালে। নিজের প্রথম বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার নতুন বিস্ময়বালক।

জার্মানিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপের জন্য কোচ হোসে পেকারমান ২৩ সদস্যের দলে রেখেছিলেন মেসিকে। তবে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে নামা হয়নি তার। ১৬ জুন সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে ৬-০ গোলের জয়ের ম্যাচে বিশ্বকাপে মেসির অভিষেক হয়। সেদিনই তিনি বিশ্বকাপের প্রথম অ্যাসিস্ট ও গোল করেন। বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতারও রেকর্ড গড়েন মেসি। এরপর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়ে যান।
নিজের ১৯তম জন্মদিনে মেক্সিকোর বিপক্ষে ২-১ গোলে জয়ে দিন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন মেসি। তবে কয়েকদিন পরই পেনাল্টি শুটআউটে জার্মানির কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। কিন্তু মেসির জন্য সেটি ছিল কেবল শুরুর গল্প।
নিজের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ২০১০ আসরে স্বদেশি কিংবদন্তি (কোচ) দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে জুটি বাঁধেন মেসি। সেখানে দলের প্রাণভোমরা সামর্থ্যের পুরোটা দেখাতে না পারলেও গ্রুপপর্বের তিনটি ম্যাচ জিতে নকআউটে ওঠে আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনার অধীনে প্লে-মেকারের ভূমিকায় ছিলেন মেসি। তবে গ্রুপপর্বে কোনো গোল করতে পারেননি তিনি। শেষ ষোলোতে মেক্সিকোর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর আবারও জার্মানিই থামিয়ে দেয় তাদের স্বপ্নযাত্রা। আক্রমণভাগে প্রতিভাবানদের ভিড়েও জোয়াকিম লো’র দল আলবিসেলেস্তেদের ৪-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয়।

২০১৪ বিশ্বকাপে বার্সেলোনায় চোটজর্জর মৌসুম কাটিয়ে মেসির দলে যোগ দেওয়ার ঘটনা ছিল বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি সমালোচনার জবাব দেন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ২-১ জয়ে গোল করার পর ইরানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোল এবং নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-২ জয়ে জোড়া গোল করে। শেষ ষোলোতে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আনহেল ডি মারিয়ার জয়সূচক গোলের নেপথ্য কারিগর ছিলেন মেসি।
এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়াম ও সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। কিন্তু মারাকানার ফাইনালে সুখকর সমাপ্তি অপেক্ষা করেনি। মারিও গোটজের অতিরিক্ত সময়ের গোলে বিশ্বকাপের নিকটদূরত্ব থেকে হৃদয়ভাঙা হার মানতে হয় আর্জেন্টিনাকে। তবে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জেতেন মেসি।

চার বছর পর (২০১৮) রাশিয়া বিশ্বকাপে ছন্দ খুঁজে পেতে সংগ্রাম করতে হয় আর্জেন্টিনাকে। মেসি মাত্র একটি গোল করেন, সেটিও নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে স্নায়ুচাপের ম্যাচে। সেই গোলটি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই জয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করলেও, যেখানে পরবর্তীতে আসরের চ্যাম্পিয়ন হওয়া ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয় আলবিসেলেস্তেদের।
কাতারে ২০২২ বিশ্বকাপ মেসি-স্কালোনির আর্জেন্টিনার জন্য মিশ্র অভিজ্ঞতা প্রস্তুত করে রেখেছিল। গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে মেসির গোলে এগিয়ে গেলেও সৌদি আরবের কাছে ২-১ ব্যবধানে চমকপ্রদ হার আর্জেন্টিনাকে অকাল বিদায়ের শঙ্কায় ফেলে দেয়। তবে মেক্সিকো ও পোল্যান্ডের বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে ২-০ ব্যবধানে জয় পেয়ে ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল করে মেসিই জয়ের পথ খুলে দেন মেসি।
আরও পড়ুন
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ছিল মেসির ক্যারিয়ারের ১০০০তম ম্যাচ, যেখানে তিনি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ নকআউটে গোল করেন। এরপর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ছিল রুদ্ধশ্বাস। একটি গোল করার পাশাপাশি আরেকটি গোলে সহায়তা করেন মেসি। তবে শেষ মুহূর্তে দুই গোল শোধ করে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যায় ডাচরা। পরে পেনাল্টি শুটআউটে আবারও সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মেসি, আর গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের নৈপুণ্যে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।

নেদারল্যান্ডস ম্যাচের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আরও দুর্দান্ত এক প্রদর্শনী উপহার দেন মেসি। ২০১৮ সালের রানার্সআপদের বিপক্ষে শুধু গোলই করেননি, নিজের জাদুকরি দৌড় ও নিখুঁত পাসে হুলিয়ান আলভারেজের গোলের পথও তিনি তৈরি করে দেন। এরপর মেসির জন্য সেই ঐতিহাসিক মহারণী ম্যাচ। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই লড়াই আধুনিক ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিশ্বকাপ ফাইনাল হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লুসাইল স্টেডিয়ামে মেসির পেনাল্টি গোল এবং ডি মারিয়ার গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু কিলিয়ান এমবাপের গোল ম্যাচে সমতা ফেরায়। অতিরিক্ত সময়ের ১০৮তম মিনিটে আবার গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন মেসি। তবে এমবাপের আরেক গোল ম্যাচটিকে আবার সমতায় ফেরায় এবং শিরোপার নিষ্পত্তি গড়ায় টাইব্রেকারে। পেনাল্টিতে আর্জেন্টিনার প্রথম শটটি সফলভাবে জালে জড়ান মেসি। শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানে জিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পুনরুদ্ধার করে আলবিসেলেস্তেরা।
মেসি যেন আরও এক ধাপ উপরে উঠে গেলেন ফুটবলের অমর কিংবদন্তিদের আসনে। এখন পর্যন্ত ৫টি আসরে খেলে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ ২৬ ম্যাচ এবং সর্বোচ্চ ২৩১৪ মিনিট খেলেছেন। আর্জেন্টিনার হয়ে রেকর্ড সর্বোচ্চ ১৩ গোল এবং সবমিলিয়ে ২১ গোলে অবদান রাখেন মেসি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র ফুটবলার হিসেবে জিতেছেন দুটি গোল্ডেন বল।
এএইচএস

