World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার : খেলোয়াড়-কোচ উভয় ভূমিকাতেই ছিলেন ‘সম্রাট’

ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার : খেলোয়াড়-কোচ উভয় ভূমিকাতেই ছিলেন ‘সম্রাট’

মাঠে ও মাঠের বাইরে ফুটবলের প্রতি তার নিবেদন ও প্রভাব ছিল অনন্য। বিশ্বকাপ জিতেছেন খেলোয়াড় এবং কোচ উভয় ভূমিকায়, মাত্র তিন ফুটবল কিংবদন্তির নামের পাশে ওই কীর্তি জ্বলজ্বল করছে। ‘কাইজার’ বা সম্রাট তকমা তো আর এমনিতেই পাননি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি ছিলেন স্ট্রাইকার ও লেফট উইঙ্গার। পরে সৌন্দর্যময় খেলা, শারীরিক শক্তি, নিঁখুত পাসিং ও নেতৃত্বগুণের সমন্বয়ে মিডফিল্ডার এবং সর্বশেষ তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা সুইপার ডিফেন্ডারে পরিণত হন।

‘ডার কাইজার’ নামে পরিচিত বেকেনবাওয়ার ছিলেন ইংল্যান্ডের ১৯৬৬ বিশ্বকাপজয়ী জুটি ববি মুর ও ববি চার্লটনের সমসাময়িক, বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী। একইসঙ্গে তিনি ছিলেন ব্রাজিলের পেলে এবং নেদারল্যান্ডসের মহান তারকা ইয়োহান ক্রুইফ–সহ ১৯৬০ ও ১৯৭০ দশকের সেই সোনালী প্রজন্মের অন্যতম সদস্য, যারা বিশ্ব ফুটবলে রাজত্ব করেছেন।

dhakapost

বেকেনবাওয়ার অধিনায়ক হিসেবে ১৯৭৪ আসরে পশ্চিম জার্মানিকে বিশ্বকাপ জেতান নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে। এরপর ১৯৯০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে কোচ হিসেবেও চ্যাম্পিয়ন হওয়ারও পরম সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। দুই ভূমিকায় বিশ্বকাপ জেতা অপর দুই কিংবদন্তি– ব্রাজিলের মারিও জাগালো ও ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম।

মাত্র ২০ বছর বয়সেই ১৯৬৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ভবিষ্যৎ সুপারস্টার হিসেবে নিজের সামর্থ্যের জানান দেন বেকেবাওয়ার। তার পারফরম্যান্স এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে ইংল্যান্ড কোচ অ্যাল্ফ রামসি তাকে অনুসরণ করার দায়িত্ব দেন ববি চার্লটনকে। বিপরীতে পশ্চিম জার্মানির কোচ হেলমুট শোন একই নির্দেশ দেন বেকেনবাওয়ারকে। ফলে দুই মহান প্রতিভা কার্যত একে অপরকে আটকে রাখেন এবং ইংল্যান্ড ৪-২ ব্যবধানে জয় পায়।

dhakapost

চার বছর পর মেক্সিকোর লিয়নে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে আবারও মুখোমুখি হন বেকেনবাওয়ার ও চার্লটন। ম্যাচে তখন ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড। বেকেনবাওয়ার একটি গোল শোধ করার পরপরই চার্লটনকে তুলে নেন রামসি। ধারণা করা হয়েছিল, প্রচণ্ড গরমে বয়স্ক তারকাকে বিশ্রাম দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, পাশাপাশি সম্ভাব্য সেমিফাইনালের কথাও ভাবা হচ্ছিল তখন। কিন্তু ওই বদলিই রামসির আমলের সবচেয়ে ভাগ্যনির্ধারক সিদ্ধান্তগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

চার্লটন মাঠ ছাড়ার পর বেকেনবাওয়ার মুক্ত হয়ে ওঠেন এবং তার প্রেরণায় পশ্চিম জার্মানি ম্যাচে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় আদায় করে নেয়। সেমিফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ইতালির কাছে ৪-৩ গোলে হারলেও মন জিতেছেন বেকেনবাওয়ার। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার পিয়েরলুইগি সেরার ট্যাকলে বল পায়ে আগুয়ান বেকেনবাওয়ারের ডান হাত কাঁধ থেকে স্থানচ্যুত হয়ে যায়। এরপরও তিনি স্লিং বেঁধে খেলতে থাকেন, কারণ দলের নির্ধারিত দুই বদলি ইতোমধ্যে ব্যবহার করেছেন কোচ। ফলে দল হারলেও বেকেনবাওয়ারের সেই বীরত্বগাঁথা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। 

পরবর্তীতে পশ্চিম জার্মানি হয়ে ওঠে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। ১৯৭২ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ব্রাসেলসে রাশিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে তারা শিরোপা জেতে। সেই অভিযানে ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারানো ছিল এক ঐতিহাসিক জয়, যা রামসির দলের ওপর তাদের স্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে দেয়।

dhakapost

১৯৭৪ সালে নিজ দেশে আয়োজিত বিশ্বকাপে বেকেনবাওয়ারের ফুটবল ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সাফল্য আসে। ফাইনালে তার প্রতিপক্ষ অধিনায়ক ছিলেন ডাচ প্রতিভাবান ক্রুইফ। ‘টোটাল ফুটবল’-এর যুগে নেদারল্যান্ডস তখন স্পষ্ট ফেভারিট। কিন্তু ম্যাচের মাত্র দুই মিনিটে জোহান নিসকেন্সের পেনাল্টিতে পিছিয়ে পড়েও পশ্চিম জার্মানি ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়।

১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের অধিনায়ক হন বেকেনবাওয়ার। সেই মৌসুমেই ক্লাবটি প্রথম বুন্দেসলিগার শিরোপা জেতে। এর আগে ১৯৬৭ সালে ন্যুরেমবার্গে রেঞ্জার্সকে হারিয়ে ইউরোপিয়ান কাপ উইনার্স কাপও জিতেছিল বাভারিয়ানরা। এরপর শুরু হয় এক বর্ণাঢ্য সাফল্যের যাত্রা, বেকেনবাওয়ারের পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে অবশ্য তা অব্যাহত ছিল। বায়ার্ন ত্যাগ এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রেও ফুটবলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন। পেলেকে অনুসরণ করে খেলেছেন নিউইয়র্ক কসমসে। 

মাঠের এই নেতা খেলা ছাড়ার পরপরই কোচিংয়ে যুক্ত হন। জার্মানির কোচ হয়ে বিশ্বকাপ তো জিতেছেনই। পরে স্বল্প সময়ের জন্য ফরাসি ক্লাব মার্শেই এবং পরবর্তীতে বায়ার্ন মিউনিখের দায়িত্ব নিয়ে বুন্দেসলিগা ও উয়েফা কাপ জেতান। পরে বায়ার্ন মিউনিখের সভাপতি এবং জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনেরও সহ-সভাপতি হন বেকেনবাওয়ার।

dhakapost

২০০৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের সফল বিডেও নেতৃত্ব দেন ফুটবল ক্যারিয়ারের পর সফল সংগঠক বনে যাওয়া কাইজার। ওই সময় জার্মান ফুটবলের জন্য একজন প্রতিনিধি ও মুখপাত্রের প্রয়োজন হলে তিনিই ছিলেন একমাত্র পছন্দ। কেবলমাত্র ২০০৬ বিশ্বকাপে দুর্নীতির সন্দেহ ছাড়া তার পুরো ক্যারিয়ার ছিল নির্মল-স্বচ্ছ। যদিও তাতে নির্দোষ সাব্যস্ত হয়েছেন তিনি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ৭৮ বছর বয়সে নির্মল ক্যারিয়ারের ন্যায় শান্তিপূর্ণভাবে তিনি প্রয়াত হয়েছেন। চিরঘুমে অন্তিম যাত্রা হয় ফুটবল সম্রাটের।

এএইচএস