ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদো নাজারিও, ফুটবলে নিখুঁত ফিনিশিং তাকে ‘এল ফেনোমেনো’ নামে পরিচিতি দিয়েছে। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর এই প্রতিভা ১৯৯০-এর দশকে গতি, শক্তি, ড্রিবলিং ও গোল করার ক্ষমতায় অন্য সব স্ট্রাইকারের চেয়ে নিজেকে আলাদা মর্যাদায় নিয়ে যান। অনেকের মতে, গুরুতর চোটে আক্রান্ত না হলে তিনি সর্বকালের সেরা ফুটবলারের তালিকায় আরও উঁচু অবস্থানে থাকতেন।
মাত্র ২৩ বছর বয়সের মধ্যেই স্বদেশি ক্লাব ক্রুজেইরো এবং পরবর্তীতে পিএসভি আইন্দহোভেন, বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান এবং ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে দুইশ’র বেশি গোল করে নিজের নামের পাশে লিখেছিলেন রোনালদো। ১৯৯৬-৯৭ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে তার পারফরম্যান্স ফুটবল ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। ওই মৌসুমে তিনি ৪৯ ম্যাচে ৪৭ গোল করেন, যার অনেকগুলোই ছিল অসাধারণ ও একক নৈপুণ্যে ভরা।

ভ্যালেন্সিয়া ও কম্পোস্তেলার বিপক্ষে তার করা গোল এখনও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত। একই সময়ে তিনি সবচেয়ে কম বয়সী ফুটবলার হিসেবে ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন। পরবর্তীতে বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে যোগ দেন ইন্টার মিলানে। ইতালির কঠিন রক্ষণভাগের বিপক্ষেও তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। পাউলো মালদিনি ও আলেসান্দ্রো নেস্তার মতো ডিফেন্ডাররাও তাকে সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ বলে স্বীকার করেছেন।
এ ছাড়া রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতেও সফল ছিলেন রোনালদো। চোটের ধকলে ক্যারিয়ারের শেষভাগে গতি কমে গেলেও ফিনিশিং দক্ষতা ও প্রতিপক্ষের রক্ষণে দাপুটে প্রভাব ফুটবল ইতিহাসে তাকে অমর করে রেখেছে। নিজের প্রাইম টাইমে রোনালদোর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বল পায়ে বিস্ফোরক গতি ও দুর্দান্ত ড্রিবলিং।

এল ফেনোমেনো সম্পর্কে সাবেক কোচ ববি রবসন বলেছিলেন, ‘রোনালদো মাঝমাঠ থেকে দৌড় শুরু করলেই পুরো স্টেডিয়াম উত্তেজনায় ফেটে পড়ত।’ তিনি স্ট্রাইকার হলেও উইঙ্গারের মতো দৌড়ে রক্ষণভাগ ভেঙে ফেলতেন অনায়াসে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তার দুর্দান্ত দৌড় কিংবা ১৯৯৮ উয়েফা কাপ ফাইনালে আলেসান্দ্রো নেস্তাকে তার পরাস্ত করার দৃশ্য এখনও চোখে লেগে আছে অনেকের।
আরও পড়ুন
ফিফা বিশ্বকাপেও রোনালদোর পারফরম্যান্স ছিল দুর্দান্ত। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে তিনি চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল দলের সদস্য ছিলেন, যদিও সে সময় বেশ তরুণ হওয়ায় মাঠে নামার সুযোগ পাননি। তবে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে ফাইনালে তুলতে নাজারিও’র ভূমিকা ছিল সামনের কাতারে। পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জেতেন এল ফেনোমেনো।
যদিও ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হারতে হয় সেলেসাওদের। শিরোপা নির্ধারণী সেই ম্যাচের আগে রোনালদোর আকস্মিক অসুস্থতা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তার প্রতি ক্ষোভের বিস্ফুরণ ঘটে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলভক্তদের মাঝে। ফুটবলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দলটির সমর্থকদের মনে গেঁথে যাওয়া সেই দাগ কাটাতে বেশ সময় লেগেছে রোনালদোর।

চোট কাটিয়ে ফিরে ২০০২ বিশ্বকাপে রোনালদো নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অধ্যায় রচনা করেন। পুরো টুর্নামেন্টে ৮ গোল করে তিনি গোল্ডেন বুট জেতেন এবং ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে জোড়া গোল করে ব্রাজিলকে এনে দেন পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা। যদিও আগের মতো রক্ষণচেরা গতি নিয়ে প্রতিপক্ষের স্নায়ু নাড়িয়ে দেওয়ার মতো সেই শক্তি আর ছিল না। তবে নিখুঁত ফিনিশিং ছিল ওই সময়ে নাজারিও’র অনবদ্য ক্যারিশমা। বিশ্বকাপে মোট ১৫ গোল করে তিনি দীর্ঘ সময় সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও ধরে রেখেছিলেন।
ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান একবার নাজারিও’র প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘রোনালদো বল নিয়ে ঘণ্টায় দুই হাজার মাইল বেগে ছুটত।’ তার ড্রিবলিং, স্টেপওভার ও ‘এলাস্তিকো’ কৌশল তাকে ফুটবলের প্রথম ‘প্লে-স্টেশন ফুটবলার’ হিসেবে পরিচিতি দেয়। চোটের কারণে ক্যারিয়ার সীমিত হলেও ফুটবলে রোনালদোর প্রভাব আজও অমলিন।
ফুটবলের চিরাচরিত স্ট্রাইকারের ভূমিকা অনেকটা বদলে যায় রোনালদোর আগমনে। তার আগে স্ট্রাইকার মানে বক্সে বলের জন্য অপেক্ষমাণ কোনো গোলস্কোরার বোঝানো হতো। কিন্তু রোনালদো ড্রিবল করে অনেক দূর থেকে ছুটে যেতেন, সামনে আসা ডিফেন্ডারদের চোখজুড়ানো কারিকুরিতে ফাঁকি দিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে গোল করার নতুন ধারা চালু করেন। ভারী শরীরেও তার অ্যাথলেটিসিজম ও স্কিলের দারুণ সমন্বয় তরুণ ফুটবলারদের কাছে অনুপ্রেরণা ও আদর্শের নাম হয়ে ওঠে। সেরা ‘নম্বর নাইন’ বলতেই দৃশ্যপটে হাজির হন এল ফেনোমেনো।

ক্যারিয়ারে অসংখ্য গুরুতর ইনজুরি এবং লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার পরও তিনি বারবার ফিরে এসে নিজের জাত চিনিয়েছেন। সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে মাত্র ২১ বছর বয়সে (১৯৯৭ সালে) এবং পরবর্তীতে ২০০২ সালে ব্যালন ডি’অর লাভ করেন। এ ছাড়া ১৯৯৬, ১৯৯৭ এবং ২০০২ সালে তিনবার ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলারও নির্বাচিত হন রোনালদো।
এএইচএস

