World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

অতীতের হতাশা পেছনে ফেলে পুরোনো রূপে ফেরার আশায় জার্মানি

অতীতের হতাশা পেছনে ফেলে পুরোনো রূপে ফেরার আশায় জার্মানি

জার্মানি উয়েফা গ্রুপ এ জিতে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করলেও, তাদের এই পথচলা একেবারে সহজ ছিল না। স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই তারা ০-২ গোলে হারের বড় ধাক্কা খায়। জার্মানির ফুটবল ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথমবার দেশের বাইরে কোনো বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে পরাজিত হওয়ার ঘটনা। তবে ফিরতি ম্যাচে তারা দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় এবং স্লোভাকিয়াকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলো জার্মান দলের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। ২০১৮ বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর ২০২২ সালেও তাদের একই ভাগ্য বরণ করতে হয়। জার্মানির গৌরবময় ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম ঘটনা, যেখানে তারা টানা দুই আসরে বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়।

২০২৩ সালে তাদের এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়, যখন বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, কলম্বিয়া ও জাপানের কাছে তারা হারের মুখ দেখে। এরপর দলের ডাগআউটে পরিবর্তন এনে হুলিয়ান নাগেলসমানকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই তরুণ কোচ ঘরের মাঠে ২০২৪ ইউরোতে জার্মানিকে নেতৃত্ব দেন, যেখানে কোয়ার্টার ফাইনালে টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন স্পেনের কাছে হেরে তাদের যাত্রা শেষ হয়।

তবে এই টালমাটাল সময়ের পর জার্মানি এখন অতীতের সব হতাশা পেছনে ফেলে বিশ্ব ফুটবলের এলিট তালিকায় নিজেদের পুরোনো জায়গা ফিরে পেতে উন্মুখ।

গত ইউরোতে জার্মানি যে আশাবাজির আলো দেখিয়েছিল, তার ওপর ভিত্তি করে দলটি ঘুরে দাঁড়াবে, এমনটাই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সফল এই দলটির লক্ষ্য থাকবে অন্তত বিশ্বকাপের সেরা তিনের মধ্যে জায়গা করে নেওয়া।

অধিনায়ক জশুয়া কিমিচ থেকে শুরু করে রক্ষণভাগের স্তম্ভ আন্টোনিও রুডিগার এবং পরিশ্রমী কাই হাভার্টজের মতো বেশ কিছু প্রতিভা ম্যানেজার হুলিয়ান নাগেলসমানের হাতে রয়েছে। যদিও জার্মানিকে এবার টুর্নামেন্ট জেতার মূল ফেভারিটদের তালিকায় রাখা হচ্ছে না। দলটির নতুন ও পুরোনো প্রজন্মের এই মেলবন্ধন এখনো পুরোপুরি পরিপক্ব হয়নি। তাই ২০০২ থেকে ২০১৪ সালের সেই সোনালি সময়ে জোয়াকিম লো-এর অধীনে তারা যে উচ্চতায় পৌঁছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, সেই ধারায় ফিরতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

গত ইউরোর পর টনি ক্রুস, থমাস মুলার ও ইলকায় গুন্দোয়ান আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন। তাদের স্থলাভিষিক্ত হওয়া তরুণ প্রজন্মকে এখনো প্রমাণ করতে হবে যে, তারা এই কিংবদন্তিদের উত্তরাধিকার ধরে রাখতে সক্ষম। এই তিন তারকার সাথে শুরুতে কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ারও অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে দলের অন্যতম দুর্বল পজিশন সামাল দিতে ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষককে আবারও দলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

জার্মানির কোচ: হুলিয়ান নাগেলসমান

হুলিয়ান নাগেলসমান আন্তর্জাতিক ফুটবলে মিশ্র এক অভিজ্ঞতা নিয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে তার খেলার ধরন দলের বর্তমান খেলোয়াড়দের সাথে বেশ মানানসই এবং তা আধুনিক ফুটবলের কৌশলের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তা সত্ত্বেও, সমর্থক ও বিশ্লেষকদের কাছ থেকে তাকে প্রায়ই সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশেষ করে তার দল নির্বাচন এবং যোগাযোগের মাধ্যম নিয়ে। তার অন্যতম বিশ্বস্ত খেলোয়াড় লেরয় সানে এখন ফর্ম হারিয়ে খাদের কিনারে আছেন বলে মনে করেন অনেক সমর্থক। অন্যদিকে, তরুণ মিডফিল্ডার অ্যাঞ্জেলো স্টিলারকে যোগ্য সুযোগ না দেওয়ার জন্য অনেকেই নাগেলসমানের সমালোচনা করছেন।

তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সবচেয়ে বড় সমালোচনা হচ্ছে ডেনিজ উন্দাভকে নিয়ে। জার্মান সমর্থকদের বড় অংশই তাকে মূল স্ট্রাইকার হিসেবে শুরুর একাদশে দেখতে চান। অথচ নাগেলসমান স্টুটগার্টের এই তারকাকে মূলত 'ইমপ্যাক্ট সাবস্টিটিউট' হিসেবে ব্যবহার করছেন।

নেপথ্যে ইয়ুর্গেন ক্লপের মতো কোচের ছায়া দৃশ্যমান থাকায় আগামী কয়েক মাসের সিদ্ধান্তের ওপরই হয়তো নির্ভর করছে জার্মানির ডাগআউটে নাগেলসমানের ভবিষ্যৎ।

জার্মানির বিশ্বকাপ সূচি

১৪ জুন: জার্মানি বনাম কুরাসাও – হিউস্টন স্টেডিয়াম

২০ জুন: জার্মানি বনাম আইভরি কোস্ট – টরন্টো স্টেডিয়াম

২৫ জুন: ইকুয়েডর বনাম জার্মানি – নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম

জার্মানির বিশ্বকাপ ইতিহাস

কনফেডারেশন: উয়েফা

সেরা বিশ্বকাপ: চ্যাম্পিয়ন (১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০, ২০১৪)

সর্বশেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২ (গ্রুপ পর্ব)

প্রথম বিশ্বকাপ: ইতালি ১৯৩৪ (চতুর্থ স্থান)

বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ২১ বার (১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৭০, ১৯৭৪, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬)

সর্বমোট বিশ্বকাপ রেকর্ড: ম্যাচ – ১১২, জয় – ৬৮, ড্র – ২১, হার – ২৩, গোল দিয়েছে – ২৩২, গোল খেয়েছে – ১৩০।

শেষ বিশ্বকাপ

জার্মানির দৃষ্টিকোণ থেকে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপের ঠিক বিপরীত। চার বছর আগে রাশিয়ার মতো কাতারেও তাদের বিশ্বকাপ অভিযান গ্রুপ পর্বেই থমকে যায়। নাটকীয়তায় ভরা গ্রুপ 'ই'-তে ইলকায় গুন্দোয়ানের পেনাল্টি গোলে প্রথমে লিড নিয়েও জার্মানি তাদের প্রথম ম্যাচে জাপানের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে বসে। দ্বিতীয় ম্যাচে স্পেনের সাথে ১-১ গোলে ড্র করে কোনোমতে আশা টিকিয়ে রাখে তারা।

শেষ ম্যাচে জার্মানি পিছিয়ে পড়েও কোস্টারিকাকে ৪-২ ব্যবধানে পরাজিত করে। কিন্তু একই সময়ে অন্য ম্যাচে জাপান ২-১ ব্যবধানে স্পেনকে হারিয়ে চমকে দিলে জার্মানির এই জয় বিফলে যায়। ফলে পয়েন্ট তালিকায় তৃতীয় স্থানে থেকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয় তারা।

জার্মানির প্রথম বিশ্বকাপ

১৯৩৪ সালে ইতালিতে জার্মানি তাদের প্রথম বিশ্বকাপ অভিষেক ম্যাচেই সেরা তিনে জায়গা করে নেয়। তুরিনে বেলজিয়ামকে ৫-২ গোলে হারিয়ে তারা দুর্দান্ত সূচনা করে। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইডেনকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছালেও চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে ৩-১ ব্যবধানে হেরে যায়। তবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৩-২ গোলে হারিয়ে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই ব্রোঞ্জ পদক জয় করে তারা।

জার্মানির সর্বোচ্চ গোলদাতা

মিরোস্লাভ ক্লোসা ২০১৪ সাল থেকে জার্মানির হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি নিজের দখলে রেখেছেন তিনি। বর্তমানে নুরেমবার্গের প্রধান কোচ ক্লোসা চারটি বিশ্বকাপে মোট ১৬টি গোল করেছেন। ২০১৪ সালে ট্রফি জয়ের পাশাপাশি তিনি জার্মানির গার্ড মুলার (১৪ গোল) ও ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদোকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। এছাড়া ঘরের মাঠে ২০০৬ বিশ্বকাপে ৫টি গোল করে তিনি গোল্ডেন বুট জেতেন।

জার্মানির সর্বাধিক ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়

লোথার ম্যাথাউস ২৫টি ম্যাচ খেলে বিশ্বমঞ্চে জার্মানির পক্ষে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন। এই মিডফিল্ডার মোট পাঁচটি বিশ্বকাপে (১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮) অংশ নেন। ১৯৮২ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে তার অভিষেক হয়। ১৯৯০ সালে ইতালির মাটিতে তার অধিনায়কত্বেই জার্মানি শিরোপা জেতে এবং ১৯৯৮ সালে ৩৭ বছর বয়সে তিনি নিজের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেন। দীর্ঘ সময় ধরে তার এই ২৫ ম্যাচের রেকর্ডটি বিশ্বরেকর্ড হিসেবে টিকে ছিল, যা ২০২২ সালে লিওনেল মেসি ভেঙে দেন।

সবচেয়ে বড় জয়

বিশ্বকাপের মঞ্চে জার্মানির সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়টি এসেছিল ২০০২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে। নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে তারা সৌদি আরবকে ৮-০ গোলে উড়িয়ে দেয়। সেই ম্যাচে মিরোস্লাভ ক্লোসা চমৎকার তিনটি হেডার গোল করেন এবং মাইকেল ব্যালাকও গোলদাতাদের তালিকায় নাম লেখান। এই বড় জয়টি দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা তাদের সেবার ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যায়।

জার্মানির বিশ্বকাপ স্কোয়াড
 
গোলকিপার: অলিভার বাউমান, ম্যানুয়েল নয়্যার, আলেকজান্ডার নুবেল

ডিফেন্ডার: ওয়াল্ডেমার আন্তন, নাথানিয়েল ব্রাউন, জশুয়া কিমিখ, ডেভিড রাউম, আন্তোনিও রুডিগার, নিকো শ্লটারবেক, জোনাথন তাহ, মালিক থিয়াও

মিডফিল্ডার: নাদিয়েম আমিরি, লেওন গোরেটজকা, পাসকাল গ্রস, লেনার্ট কার্ল, জেমি লেভেলিং, জামাল মুসিয়ালা, ফেলিক্স এনমেচা, আলেকসান্দার পাভলোভিচ, লেরয় সানে, অ্যাঞ্জেলো স্টিলার, ফ্লোরিয়ান ভির্ট্‌জ

ফরোয়ার্ড: ম্যাক্সিমিলিয়ান বায়ার, কাই হাভার্টজ, ডেনিজ উন্দাভ, নিক ভোল্টেমেড।

এফএইচএম