প্যারাগুয়ে অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কনমেবল বাছাইপর্বের পরীক্ষা দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে তাদের জায়গা নিশ্চিত করেছে। যদিও প্রথম ছয়টি ম্যাচের পর তাদের এই মিশন প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল।
সাবেক কোচ ড্যানিয়েল গারনেরোর অধীনে প্যারাগুয়ে তাদের বাছাইপর্বের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ ম্যাচে মাত্র একটি গোল করতে পেরেছিল এবং পয়েন্ট পেয়েছিল মাত্র ৫। এরপর আসে ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা, যেখানে গ্রুপ পর্বে টানা তিনটি পরাজয়ের পর অবশেষে কোচ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ছিল ১৩ বছরের ব্যবধানে প্যারাগুয়ের ১১তম কোচ পরিবর্তন। গারনেরোর স্থলাভিষিক্ত হন আর্জেন্টাইন কোচ গুস্তাভো আলফারো।
আলফারোর আগমনই দলের ভাগ্য বদলে দেয়। প্যারাগুয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সংগ্রহ করতে শুরু করে, বিশেষ করে নিজেদের মাঠে আসুন্সিওনকে তারা আক্ষরিক অর্থেই এক দুর্গে পরিণত করে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের বিপক্ষে তাদের জয়গুলো গোলসংখ্যা বা মাঠের পারফরম্যান্সের দিক থেকে খুব একটা চোখ ধাঁধানো না হলেও পয়েন্টের দিক থেকে তা ছিল অমূল্য।
পাশাপাশি কয়েকটি কৌশলগত ড্র দলটিকে সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতার দৌড়ে টিকিয়ে রাখে। অবশেষে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই তারা লক্ষ্য অর্জন করে এবং ১০ দলের পয়েন্ট তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে থেকে বাছাইপর্ব শেষ করে।
প্যারাগুয়ে বিশ্বাস করে যে, ২০২৬ বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে পৌঁছানো তাদের পক্ষে পুরোপুরি সম্ভব। ২০১০ সালের পর এটিই প্যারাগুয়ের প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল। যদিও ১৬ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানোর সেই স্মৃতি এবার ছোঁয়া কঠিন হতে পারে, তবুও তারা যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
ঠিক ২০১০ সালের মতোই, প্যারাগুয়ে এবারও তাদের রক্ষণভাগের দৃঢ়তা, শারীরিক তীব্রতা ও কৌশলগত শৃঙ্খলার ওপর ভরসা করবে।
বাস্তবসম্মতভাবে, প্যারাগুয়ের প্রাথমিক লক্ষ্য হবে সহ-আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক এবং অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গড়া কঠিন ‘গ্রুপ ডি’ থেকে পরবর্তী রাউন্ডে উত্তীর্ণ হওয়া। এর জন্য তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, তবে এই দলটি অতীতেও ইতিহাস গড়েছে। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমক হিসেবে তারা আবির্ভূত হলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।
প্যারাগুয়ে কোচ: গুস্তাভো আলফারো
বাছাইপর্বের ডুবতে থাকা দলটিকে যেভাবে টেনে তুলেছেন, তার জন্য গুস্তাভো আলফারো এখন প্যারাগুয়ের জাতীয় নায়কে পরিণত হয়েছেন।
এই আর্জেন্টাইন কোচের ঝুলিতে রয়েছে বেশ চমৎকার অভিজ্ঞতা। তিনি সান লোরেঞ্জো, রোজারিও সেন্ট্রাল ও বোকা জুনিয়র্সের মতো নামী ক্লাবগুলো পরিচালনা করেছেন। এছাড়া ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তিনি ইকুয়েডর দলের দায়িত্বে ছিলেন, যদিও সেবার তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
আলফারো প্যারাগুয়ে দলের হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি দলের রক্ষণাত্মক কাঠামো পুনর্গঠন করার পাশাপাশি আক্রমণে নতুন শক্তি জোগাতে বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়কে দলে সুযোগ করে দিয়েছেন।
আলফারো এক অদম্য মানসিকতা গড়ে তুলেছেন। তার মূলমন্ত্র একদম সহজ: "মাঠের প্রতিটি বলই হবে আমাদের জীবনের শেষ বল।"

প্যারাগুয়ের বিশ্বকাপ সূচি
১২ জুন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বনাম প্যারাগুয়ে — লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম
১৯ জুন: তুরস্ক বনাম প্যারাগুয়ে — সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়াম
২৫ জুন: প্যারাগুয়ে বনাম অস্ট্রেলিয়া — সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়াম
প্যারাগুয়ের বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: কনমেবল
সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য: কোয়ার্টার ফাইনাল (২০১০)
সর্বশেষ বিশ্বকাপ: দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০ (কোয়ার্টার ফাইনাল)
প্রথম বিশ্বকাপ: উরুগুয়ে ১৯৩০ (গ্রুপ পর্ব)
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ৯ বার (১৯৩০, ১৯৫০, ১৯৫৮, ১৯৮৬, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০২৬)
টানা বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড: ১ বার (বর্তমান)
বিশ্বকাপের সামগ্রিক রেকর্ড: ম্যাচ- ২৭, জয়- ৭, ড্র- ১০, হার- ১০, গোল দিয়েছে- ৩০, গোল খেয়েছে- ৩৮
প্যারাগুয়ের সর্বশেষ বিশ্বকাপ
বিশ্বমঞ্চে প্যারাগুয়ের শেষ উপস্থিতিটিই ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয়। ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে তারা সেমিফাইনালের একদম কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। স্পেনের সাথে সমানে সমানে লড়াই করা সেই দলটিতে ভিলার, কার্দোজো, পাওলো দা সিলভা ও নেলসন হেদোর মতো তারকারা ছিলেন। সাথে ছিলেন চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে নামা অভিজ্ঞ ডেনিস কানিজা।

প্যারাগুয়ের প্রথম বিশ্বকাপ
একেবারে প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রিত হওয়া গুটিকয়েক দলের মধ্যে প্যারাগুয়ে অন্যতম ছিল। যদিও গ্রুপ ৪-এর উদ্বোধনী ম্যাচে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩-০ গোলে হেরে যায়, তবে পরের ম্যাচেই বেলজিয়ামকে ১-০ গোলে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। অবশ্য নকআউট পর্বে যাওয়ার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।
প্যারাগুয়ের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা
ফরওয়ার্ড নেলসন কুয়েভাস বিশ্বকাপে ৩টি গোল করে প্যারাগুয়ের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০০২ সালের কোরিয়া/জাপান বিশ্বকাপে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন। চার বছর পর জার্মানি বিশ্বকাপে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর বিরুদ্ধে আরও একটি গোল করে নিজের ঝুলিতে ৩টি গোল পূর্ণ করেন।
বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়েরা
প্যারাগুয়ের দুজন খেলোয়াড় যৌথভাবে এই রেকর্ডের অধিকারী, যারা প্রত্যেকেই ১২টি করে ম্যাচ খেলেছেন।
আলবিরোহার রক্ষণভাগের প্রধান স্তম্ভ ডেনিস কানিজা ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে ৪টি ম্যাচ খেলেন এবং ২০০২ সালের কোরিয়া/জাপান বিশ্বকাপেও সমসংখ্যক ম্যাচ খেলেন। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে তিনি আরও ৩টি ম্যাচ খেলেন এবং চার বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকায় নিজের শেষ বিশ্বকাপে আরও ১টি ম্যাচ খেলে ফুটবলকে বিদায় জানান।
রক সান্টা ক্রুজও কানিজার এই রেকর্ডের সমান অংশীদার। এই ফরোয়ার্ড ২০০২ কোরিয়া/জাপান বিশ্বকাপে ৪টি ম্যাচ খেলেন, এরপর জার্মানির মাটিতে আরও ৩টি ম্যাচ এবং ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় আরও ৫টি ম্যাচে অংশ নিয়ে কানিজার রেকর্ডে ভাগ বসান।
প্যারাগুয়ের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলকিপার: অরল্যান্ডো গিল, রবার্তো ফার্নান্দেস, গাস্তন ওলভেইরা
ডিফেন্ডার: হুয়ান কাসেরেস, গুস্তাভো ভেলাসকেস, গুস্তাভো গোমেস, জুনিয়র আলোনসো, হোসে কানালে, ওমার আলদেরেতে, আলেক্সান্দ্রো মাইদানা, ফাবিয়ান বালবুয়েনা
মিডফিল্ডার: দিয়েগো গোমেস, মৌরিসিও মাগালায়েস, দামিয়ান বোবাডিয়া, ব্রায়ান ওহেদা, আন্দ্রেস কুবাস, মাতিয়াস গালারজা, আলেহান্দ্রো গামাররা
ফরোয়ার্ড: গুস্তাভো কাবালেরো, রামন সোসা, আলেক্স আরসে, ইসিদ্রো পিত্তা, গ্যাব্রিয়েল আভালোস, মিগেল আলমিরন, হুলিও এনসিসো, আন্তোনিও সানাব্রিয়া।
এফএইচএম

