World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

গার্ড মুলার : ফুটবলের এক মূর্তিমান আতঙ্ক

গার্ড মুলার : ফুটবলের এক মূর্তিমান আতঙ্ক

জার্মান ও বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ও ভয়ঙ্কর স্ট্রাইকার গার্ড মুলার। বক্সের ভেতর বল পেলে তাকে আটকানোর সাধ্য ছিল না কোনো ডিফেন্ডারের। ফুটবল বিশ্বে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘ডার বম্বার’ বা ‘বোমারু’ নামে।

মুলারের শৈশব ও কৈশোরের গল্পটা রূপকথার মতো সহজ ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মাস পর, এক চরম দারিদ্র্যপীড়িত ও ধ্বংসস্তূপের জার্মানিতে তার বেড়ে ওঠা। ১৯৪৫ সালের ৩ নভেম্বর জার্মানির নর্ডলিংগেন নামক একটি ছোট শহরে মুলারের জন্ম। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে মুলার ছিলেন সবার ছোট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই জন্ম হওয়ায় তীব্র খাদ্য সংকট ও অভাবের মধ্য দিয়ে তার শৈশব কেটেছে। ঠিকমতো তিনবেলা খাওয়ার ভাগ্যও সবসময় জুটত না তাদের।

মুলারের বয়স যখন মাত্র ১৫ বছর, তখন তার বাবা হেইনরিখ মুলার মারা যান। বাবার মৃত্যুতে পরিবারটি চরম সংকটে পড়ে। বাধ্য হয়ে কিশোর মুলারকে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে সংসারের হাল ধরতে হয়। তিনি একটি টেক্সটাইল মিলে (কাপড়ের কারখানা) শ্রমিকের কাজ নেন। সেখানে সপ্তাহে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হতো তাকে, আর এর ফাঁকেই তিনি ফুটবলের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

ছোটবেলায় অপুষ্টি এবং দারিদ্র্যের কারণে মুলারের শারীরিক গঠন অন্যান্য সাধারণ অ্যাথলেটদের মতো ছিল না। তিনি একটু খাটো এবং চওড়া গড়নের ছিলেন। পাড়ার ছেলেরা এবং প্রথম দিকের কোচরা তাকে ‘মোটা’ বলে খ্যাপাতো। দারিদ্র্যের কারণে তাদের প্রধান খাবারই ছিল আলু। মুলারের মা ‘আলুর সালাদ’ বানাতেন, যা ছিল মুলারের অসম্ভব প্রিয়। পরবর্তীতে বায়ার্ন মিউনিখে আসার পরও কোচ জ্লাটকো চাকোভস্কি রসিকতা করতেন তার আলুর সালাদ খাওয়া নিয়ে। কিন্তু এই খাবার খেয়েই তার উরু এবং পেশি এতটা শক্তিশালী হয়েছিল যে ডিফেন্ডাররা তাকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে পারত না।

মুলার ছোটবেলা থেকেই স্থানীয় রাস্তায় বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন। তার বয়স যখন ১২ বছর, তখন তিনি স্থানীয় ক্লাব ‘টিএসভি নর্ডলিংগেন’এর জুনিয়র দলে ট্রায়াল দিতে যান। ক্লাবটির অনূর্ধ্ব-১৪ দলের কোচ গেয়র্গ শুয়ার্জ মুলারের খেলা দেখে অবাক হয়ে যান। কিন্তু সমস্যা ছিল, মুলারের নিজের কোনো বুট বা ভালো খেলার পোশাক ছিল না। পরে কোচ নিজেই ক্লাবের ফান্ড থেকে মুলারকে একজোড়া বুট কিনে দিয়েছিলেন।

dhakapost

নর্ডলিংগেনের জুনিয়র দলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই মুলার তার আসল রূপ দেখাতে শুরু করেন। ক্লাবটির যুব দলের হয়ে এক ম্যাচে তিনি একাই ২৬টি গোল করেছিলেন বলে শোনা যায়! পুরো মৌসুমে তার গোলের সংখ্যা দেখে বায়ার্ন মিউনিখ এবং মিউনিখ ১৮৬০-এর মতো বড় বড় ক্লাবগুলো স্কাউট পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল।

চরম অভাব, বাবার অকাল মৃত্যু এবং কারখানার কঠিন পরিশ্রমের মাঝেও মুলার ফুটবলের প্রতি নিজের ভালোবাসাকে হারিয়ে যেতে দেননি। ছোটবেলার সেই প্রতিকূলতাই হয়তো তাকে মানসিকভাবে এতটাই শক্ত করে তুলেছিল, যার ফলে পরবর্তীতে ফুটবল বিশ্বের বড় বড় ডিফেন্ডারদের মুখোমুখি হতে তিনি বিন্দুমাত্র ভয় পাননি। ১৯৬৩ সালে স্থানীয় ক্লাব ‘টিএসভি নর্ডলিংগেন’-এর হয়ে তার পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয়। সেখানে মাত্র এক মৌসুমে ৩১ ম্যাচে ৫১ গোল করে তিনি সবার নজর কাড়েন। 

১৯৬৪ সালে তিনি যোগ দেন তৎকালীন জার্মানির দ্বিতীয় বিভাগের দল বায়ার্ন মিউনিখে। বায়ার্ন মিউনিখে যখন মুলার প্রথম যোগ দেন, তখন তার কোচ জ্লাটকো চাকোভস্কি তাকে দেখে বলেছিলেন, ‘এই মোটা, খাটো ছেলেকে দিয়ে আমি কী করব?’ মুলার যে কী করে দেখাতে পারেন, তা কিছুদিনের মধ্যে টের পেয়েছিল বায়ার্ন। সে সময় বায়ার্ন আজকের মতো এতো বড় ক্লাব ছিল না। মুলারের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ভর করেই বায়ার্ন মিউনিখ প্রথম বিভাগ বুন্দেসলিগায় উন্নীত হয়। এরপরের গল্পটা শুধুই ইতিহাসের। 

ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ও সেপ মায়ারের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে জুটি বেঁধে মুলার বায়ার্নকে ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাবে পরিণত করেন। বায়ার্নের হয়ে ১৫ মৌসুমে তিনি ৬০৭ ম্যাচে ৫৬৫টি গোল করেছিলেন। ক্যারিয়ারের শেষভাগে তিনি আমেরিকার ক্লাব ‘ফোর্ট লাউডারডেল স্ট্রাইকার্স’-এ যোগ দেন এবং সেখানেও দারুণ খেলেন। 

dhakapost

জার্মানি জাতীয় দলের হয়ে মুলার যা করেছেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পশ্চিম জার্মানির হয়ে মাত্র ৬২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে তিনি গোল করেছিলেন ৬৮টি! অর্থাৎ ম্যাচ প্রতি গোলের গড় একেরও বেশি। ১৯৭০ বিশ্বকাপের কথাই ধরা যাক। এই বিশ্বকাপে মুলার একাই ১০টি গোল করে ‘গোল্ডেন বুট’ জিতেছিলেন। যার মধ্যে বুলগেরিয়া ও পেরুর বিপক্ষে টানা দুটি হ্যাটট্রিক অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭২ ইউরো কাপে ধরা দেয় শিরোপা। পশ্চিম জার্মানিকে ইউরো চ্যাম্পিয়ন করার পেছনে তার অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। টুর্নামেন্টে তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বকাপে ১৪ গোল নিয়ে তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন, পরে রোনালদো নাজারিও এবং মিরোস্লাভ ক্লোসা ওই রেকর্ড ভাঙেন। জার্মানির ঘরোয়া লিগে সর্বোচ্চ ৩৬৫ গোলের রেকর্ডটি আজও মুলারের দখলেই আছে। এ ছাড়া এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ৪০ গোলের রেকর্ডটি প্রায় ৪০ বছর পর রবার্ট লেভান্ডফস্কি ভাঙতে পেরেছিলেন। ১৯৬৭ এবং ১৯৭২ সালে ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জেতেন মুলার।

তিনি কখনো দূর থেকে বা দর্শনীয় ড্রিবলিং করে গোল করার জন্য পরিচিত ছিলেন না। তার গোলগুলো হতো ডি-বক্সের ভেতর থেকে। পড়ে গিয়ে, শুয়ে পড়ে, কিংবা শরীরের যেকোনো অংশ দিয়ে বল জালে জড়াতে পারদর্শী ছিলেন তিনি। এজন্য বলা হতো, ‘বক্সের ভেতর বল মুলারের পায়ে যাওয়া মানেই গোল।’ ১৯৭২ সালে বায়ার্ন ও জার্মানির হয়ে মুলার এক বছরে ৮৫টি গোল করেছিলেন। দীর্ঘ ৪০ বছর এই রেকর্ড অক্ষত ছিল, যা ২০১২ সালে ভেঙেছিলেন লিওনেল মেসি (৯১ গোল)।

মুলার কেবল একজন গোলদাতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বায়ার্ন মিউনিখ এবং জার্মান ফুটবলের আধুনিক রূপকার। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার একবার বলেছিলেন, ‘গার্ড মুলার না থাকলে আজ বায়ার্ন মিউনিখ এই অবস্থানে আসতে পারত না। আমাদের আজকের এই ক্লাবঘর তারই গোলের ফসল।’

dhakapost

বিশ্বকাপের মঞ্চে মুলার ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ১৯৭০ এবং ১৯৭৪– মাত্র দুটি বিশ্বকাপ খেলেই তিনি এমন কিছু কীর্তি গড়েছেন, যা ফুটবল ইতিহাসে রূপকথা হয়ে আছে। ১৯৭৪ বিশ্বকাপ জিতলেও ১৯৭০ আসর তার বেশি প্রিয় ছিল! সাধারণত যেকোনো ফুটবলারের কাছে যে বিশ্বকাপে ট্রফি জেতা হয়, সেটিই সবচেয়ে প্রিয় থাকে। কিন্তু মুলার এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন, তার কাছে ট্রফি জেতা ১৯৭৪ বিশ্বকাপের চেয়ে তৃতীয় হওয়া ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপটি অনেক বেশি আনন্দের ও প্রিয় ছিল। তার মতে, ১৯৭০ সালের জার্মান দলটির মধ্যে যে ঐক্য ও বন্ধুত্ব ছিল, তা ৭৪-এর দলে ছিল না। তা ছাড়া মেক্সিকোর আবহাওয়া ও ফুটবল পরিবেশ তিনি দারুণ উপভোগ করেছিলেন।

১৯৭০ বিশ্বকাপে ১০ গোল করে মুলার গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তবে ফাইনালে ইতালি ও ব্রাজিলের ম্যাচটি বাকি ছিল। ব্রাজিলের জাইরজিনহো তখন ৭টি গোল করে মুলারের পেছনে ছিলেন। মুলার জানান, তিনি গ্যালারিতে বসে মনেপ্রাণে দোয়া করছিলেন জাইরজিনহো যেন ফাইনালে হ্যাটট্রিক করতে না পারেন! শেষ পর্যন্ত জাইরজিনহো ১টি গোল করায় মুলার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এবং গোল্ডেন বুট নিশ্চিত করেন।

১৯৭৪ সালে ঘরের মাঠে জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হলেও টুর্নামেন্টের শুরুতে দলের ভেতর চরম অশান্তি আর গ্রুপিং ছিল। প্রথম রাউন্ডে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পূর্ব জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় পশ্চিম জার্মানি। মুলার জানান, ওই হারের পর তাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে যেন ‘নরক ভেঙে পড়েছিল’। কোচ হেলমুট শোন এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে খেলোয়াড়দের মাঝরাত পর্যন্ত মিটিং করতে হয়েছিল।

তবে ওই হারটিই তাদের জন্য ‘আশীর্বাদ’ হয়ে আসে। কারণ, হেরে যাওয়ার ফলে জার্মানি এমন এক গ্রুপে পড়ে যেখানে নেদারল্যান্ডস ও ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী দলগুলোকে এড়ানো সম্ভব হয়। ১৯৭৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে শক্তিশালী নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হয় পশ্চিম জার্মানি। ম্যাচ শুরুর মাত্র ২ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি থেকে গোল করে বসেন ডাচ তারকা জোহান নেসকেন্স। জার্মানরা তখনো বল ছুঁয়েও দেখতে পারেনি! মুলারের মতে, এই দ্রুত গোলটিই জার্মানিকে ম্যাচ জিততে সাহায্য করেছিল। গোল করার পর ডাচরা অহংকারী হয়ে পড়ে এবং জার্মানিকে হালকাভাবে নিয়ে মাঠে বল নিয়ে ‘শো-অফ’ করা শুরু করে। এই সুযোগেই জার্মানি ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত মুলারের গোলেই ২-১ ব্যবধানে জেতে।

১৯৭৪ আসরে ফাইনালের আগের দিন জার্মান একটি পত্রিকায় খবর বের হয় যে, এক গণক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন– ফাইনালে নেদারল্যান্ডস জিতবে। এই খবরটি মুলারের মাথায় এমনভাবে চেপে বসেছিল যে, ফাইনালের আগের রাতে তিনি টেনশনে ঘুমাতেই পারেননি। সারারাত তিনি শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন যেন এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি না হয়।

১৯৭৪ সালে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি করেছিলেন মুলার। ২-১ ব্যবধানে জয়ী হয়ে জার্মানি সেবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় এবং এই ম্যাচের পরেই মাত্র ২৮ বছর বয়সে মুলার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেন। বিদায়ের বেলাতেও তিনি রেখে যান ১৩ ম্যাচে ১৪টি বিশ্বকাপ গোলের এক অবিশ্বাস্য কীর্তি, যা পরবর্তী ৩২ বছর কেউ ভাঙতে পারেনি।

dhakapost

ফুটবলে স্ট্রাইকারদের পরিমাপ করা হয় গোল দিয়ে, আর এই জায়গায় মুলার ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার গোলের পরিসংখ্যান দেখলে যে কারও চোখ কপালে উঠবে। পশ্চিম জার্মানির হয়ে ৬২ ম্যাচে ৬৮ গোল! ম্যাচ প্রতি গোলের গড় ১.১)। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৬০৭ ম্যাচে ৫৬৫ গোল! সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারে ৭৯৩টি অফিশিয়াল ম্যাচে তিনি ৭৩৫টি গোল করেছেন। আধুনিক ফুটবলে যেখানে ম্যাচপ্রতি ০.৫ বা ০.৬ গোল করা স্ট্রাইকারদের বিশ্বমানের বলা হয়, সেখানে মুলার ক্যারিয়ার শেষ করেছেন প্রায় ১-এর কাছাকাছি গড় নিয়ে।

মুলার ফুটবলকে কোনো জটিল সমীকরণ বানাতেন না। তার কাছে ফুটবলের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটিই—‘বল জালে জড়ানো’। আর এই কাজটি তিনি ইতিহাসের যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি নিখুঁতভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে করেছেন। ট্রফি, ব্যক্তিগত অর্জন আর অনন্য ফুটবল মস্তিস্কের কারণেই তিনি ফুটবলের চিরন্তন কিংবদন্তি।

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট এই মহান ফুটবলার ৭৫ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। আলঝেইমার্স রোগে আক্রান্ত হয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটলেও, ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এবং কোটি ভক্তের হৃদয়ে তিনি চিরকাল ‘ডার বোম্বার’ হিসেবেই অমর হয়ে থাকবেন।

এফএইচএম