আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। বাংলাদেশ সময় রাত ১ টায় মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজটেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক দলের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠছে ফুটবল বিশ্বকাপের।
ফুটবল বিশ্বকাপকে বলা হয় গ্রহের সবচেয়ে উন্মাদনাপূর্ণ ক্রীড়া ইভেন্ট। বিশ্বকাপ ঘিরে যে উন্মাদনা থাকার কথা, সেটাই যেন এখনো সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বকাপের হাজার হাজার টিকিট এখনো অবিক্রীত। আয়োজক দেশের শহরে শহরে ফুটবলপ্রেমীদের যেভাবে ভিড় থাকার কথা ছিল, সেটিও চোখে পড়ছে না সেভাবে। ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়ছে ফুটবল বিশ্বেও। অথচ রেকর্ড ৪৮টি দল নিয়ে তিনটি দেশের যৌথ প্রযোজনা—আকার ও আয়োজনের দিক থেকে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহৎ বিশ্বকাপ।
“ফুটবল সবার খেলা”— এই ধারণাটিও এখন অনেকটাই ফিঁকে হয়ে গেছে। বিশ্বকাপ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি করপোরেট নির্ভর আয়োজন হয়ে গেছে।
আমেরিকার পাশাপাশি এবারের বিশ্বকাপের আরও দুই সহ-আয়োজক কানাডা ও মেক্সিকো। বিক্ষোভ, সহিংসতায় বরাবরই উত্তাল থাকে মেক্সিকো। আজ টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচ ঘিরেও দেশটিতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গত কিছু দিনে বেশ কিছু বড় বিক্ষোভ দেখা গেছে দেশটিতে। আগামী দিনেও তেমন কিছুর শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আরেক সহ-আয়োজক কানাডা যেন কোনো আলোচনাতেই নেই। মাঠের ফুটবলের চেয়ে এবারের বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত বেশি আলোচনায় টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম, ভিসা জটিলতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা আয়োজন ঘিরে বিতর্ক।

বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ। অসাধারণ সব মুহূর্ত উপভোগ করার সুযোগ ভক্ত-সমর্থকদের। বিশ্বকাপ আবার জাতীয় গর্বেরও জায়গা। যেমন ২০২২ সালে লিওনেল মেসিকে বিশ্বকাপ উপহার দিতে পুরো আর্জেন্টিনা এক হয়েছিল। একই আসরে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে চোখের জলে ভেঙে পড়েছিলেন নেইমারসহ গোটা ব্রাজিল। সমর্থকদের কাছে বিশ্বকাপের মানে আবার ভিন্ন। কারও কাছে এটি দেশের প্রতি ভালোবাসা, কারও কাছে একসঙ্গে আনন্দ করার উপলক্ষ। নতুন দলগুলোর জন্য ফুটবলের টুর্নামেন্ট শুধু একটা বিশ্বকাপ নয়, একটা উৎসব যেন।
বিশ্বকাপের হাজার হাজার টিকিট এখনো অবিক্রীত। আয়োজক দেশের শহরে শহরে যে ভিড় থাকার কথা ছিল, সেটিও চোখে পড়ছে না সেভাবে। অথচ রেকর্ড ৪৮টি দল নিয়ে তিনটি দেশের যৌথ প্রযোজনা-আকার ও আয়োজনের দিক থেকে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহৎ বিশ্বকাপ।
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া ছোট্ট দেশ কুরাসাওয়ের এক সমর্থক যেমনটা বলছিলেন,“আমরা কর্ণার পেলেও উদযাপন করব, হলুদ কার্ড পেলেও উদযাপন করব। শুধু বিশ্বকাপে থাকতে পারাটাই আমাদের আনন্দ।” বিশ্বকাপ মানে আবার ভ্রমণও। নতুন দেশ দেখা, নতুন সংস্কৃতি অনুভব করা, প্রিয় দলকে অনুসরণ করে এক শহর থেকে আরেক শহর চষে বেড়ানো- সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা।
যদিও এবারের বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ফুটবলের চেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে টিকিট নিয়ে। গত বছরের শেষ দিকে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পর থেকেই দামের ওঠানামা ছিল। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ছিল প্রায় ১,৬০০ ডলার। অথচ ২০২৬ সালে ফিফার বিক্রি করা সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ৩২,৯৭০ ডলার। ১০৪টি ম্যাচজুড়ে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেখা গেছে। ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেক ম্যাচের টিকিট এখনও পুনর্বিক্রয় বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ মিত্র খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই মূল্য নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি লস অ্যাঞ্জেলেসে যুক্তরাষ্ট্র ও প্যারাগুয়ের ম্যাচের টিকিটের মূল্য ১,০০০ ডলার শুনে তিনি বলছিলেন, “সত্যি বলতে, আমিও এত টাকা দিয়ে টিকিট কিনতাম না।”
আরও পড়ুন
অবশ্য আমেরিকা বিশ্বকাপের বাস্তবতা অন্যান্য বিশ্বকাপের মতো নয়। তবুও আকাশছোঁয়া টিকিট মূল্য যে অসংখ্য সমর্থককে দূরে ঠেলে দিয়েছে, তা স্পষ্ট। “ফুটবল সবার খেলা”— এই ধারণাটিও এখন অনেকটাই ফিঁকে হয়ে গেছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি করপোরেট নির্ভর আয়োজন। আর যুক্তরাষ্ট্রে বড় ক্রীড়া ইভেন্টের ব্যয় এমনিতেই বেশি। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো সম্প্রতি বলেছিলেন, আমেরিকানরা বড় ইভেন্ট দেখতে বেশি অর্থ খরচ করতেই প্রস্তুত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তো ৪৮ দলের মধ্যে মাত্র একটি দল। ফলে পুরো বিশ্বকাপকে শুধু মার্কিন বাজারের দৃষ্টিতে দেখা সংকীর্ণ চিন্তাই হয়ে যায়। তাছাড়া খোদ মার্কিন মুল্লুকেও ফুটবল তেমন জনপ্রিয় কোনো খেলা নয়।

মার্কিন সমর্থকদের কেউ কেউ আগে থেকেই উচ্চমূল্যের ম্যাচ দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু এবার যে দামে টিকিট বিক্রি হচ্ছে, সেটি অনেকের নাগালের বাইরেই চলে গেছে। এর সঙ্গে আছে রাজনৈতিক বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির কারণে বিদেশি সমর্থকদের অনেকেই ভিসা পাননি। এমনকী সোমালিয়ার প্রথম কোনো রেফারি হিসেবে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ পরিচালনা করে ইতিহাস গড়তে যাওয়া ওমর আর্তান যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার অনুমতিই পাননি।
বিশ্বকাপেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ছায়া
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজিত বিশ্বকাপের ঠিক আগে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরো তিক্ত হয়ে ওঠে। সামরিক সংঘাতের জেরে দুই দেশের উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। সবচেয়ে বড় বাধা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা। শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড় এবং প্রয়োজনীয় সাপোর্ট স্টাফদের ভিসা দেওয়া হলেও ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ভিসা পাননি।

শুধু তাই নয়, ভিসার শর্ত অনুযায়ী ইরান দলকে ম্যাচের দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে ম্যাচ শেষে একই দিনে দেশ ছাড়তে হবে। ফলে দলটি তাদের পূর্বনির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা ক্যাম্প বাতিল করে ফিফার অনুমোদন নিয়ে মেক্সিকোর তিজুয়ানায় ঘাঁটি গেড়েছে। এ দিকে, টুর্নামেন্ট শুরুর আগ মুহূর্তে আকস্মিকভাবে ইরান দলের সমর্থকদের জন্য বরাদ্ধকৃত সব টিকিট বাতিল করেছে ফিফা। ফলে ভিসা জটিলতার পর ভ্রমণের প্রস্তুতি নিলেও মাঠে বসে খেলা দেখতে পারবেন না হাজার হাজার ইরানি সমর্থকরা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা এসে দাঁড়ায় এসবের দায় আসলে কার—আঙুল তোলা সবচেয়ে সহজ হয়েছে ফিফার দিকে। এর মধ্যেও সংস্থাটি আশা করছে, পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবল আসরের চিরন্তন আকর্ষণ টিকিটের আকাশছোঁয়া মূল্য নিয়ে ক্ষোভ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ছায়াকে ছাপিয়ে যেতে পারবে।
এফআই

