World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো : সংগ্রামের জীবন থেকে কিংবদন্তির আসনে

‘সে কখনও সন্তুষ্ট হয় না। বিশেও ছিল না, ত্রিশেও না এবং এখন চল্লিশেও না’, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো দোস সান্তোস আভেইরোকে নিয়ে এই মন্তব্য সাবেক এজেন্ট হোর্হে মেন্দেজের। নিজেকে নিয়ে অতৃপ্তিতে ভোগার অভ্যাসটা পর্তুগিজ সুপারস্টারের জন্য নিত্য দিনের। তাই তো ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের পরই যার বিদায়ের কল্পনা করেছিলেন অনেকে, তাদের ভুল প্রমাণ করে রোনালদো নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা আসরে।

তার জীবনের শুরুটা ছিল সংগ্রামমুখর। মাঠের পারফরম্যান্স ধরে রাখার লক্ষ্যে অবশ্য সেই সংগ্রাম তিনি ভিন্নভাবে অব্যাহত রেখেছেন। ৪১ বছর বয়সেও ফিটনেস ঠিক রাখতে রোনালদো যা করেন, তা অনুকরণীয় হতে পারে লম্বা ক্যারিয়ার গড়তে চাওয়া ফুটবলারদের জন্য। ১৯৮৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্তুগালের মাদেইরার ফুনচালে জন্ম। শ্রমজীবী পরিবারে বেড়ে ওঠা রোনালদোর শৈশব ছিল নানা চ্যালেঞ্জে ভরা। তার বাবা স্থানীয় একটি ফুটবল ক্লাবে কিটম্যান হিসেবে কাজ করতেন এবং মা ছিলেন একজন রাঁধুনি।

dhakapost

ছোট ও সাধারণ একটি বাড়িতে বসবাসরত পরিবারটি আর্থিকভাবে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গেলেও, তারা রোনালদোর মধ্যে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মূল্যবোধ গড়ে তুলেছিলেন। তিনিও শৈশব থেকে মাঠে অসাধারণ প্রতিভার জানান দেন। বাবার কর্মরত স্থানীয় ক্লাব অ্যান্ডোরিনিয়ায় যোগ দেন আট বছর বয়সে। সেখানে নজর কাড়েন খুব দ্রুত। চার বছর পর মাদেইরো ছেড়ে লিসবনের স্পোর্টিং সিপির একাডেমি হয় তার ঠিকানা। 

পরিবার থেকে দূরে নতুন শহরে মন খারাপ হতো তার, বড় শহরের চাপ তো আছেই। ১৪ বছর বয়সে বুঝতে পারেন পড়াশোনা ও ফুটবল একসঙ্গে সামলানো কঠিনতর হয়ে উঠছে। ততক্ষণে রোনালদোর ফুটবল সামর্থ্য জানা হয়ে গেছে আশপাশের সবার, ফলে ছেলের সঙ্গে মা ও স্পোর্টিং কোচ মিলে বসে সিদ্ধান্ত নেন পড়া ছেড়ে পুরো মনোনিবেশ করুক খেলায়।

স্পোর্টিংয়ের যুব দলে অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে দ্রুতই মূল দলে সুযোগ পেয়ে যান রোনালদো। ১৭ বছর বয়সে ‍উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বাছাইপর্বে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে তার আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয়। মোড় ঘুরে যায় ২০০৩ সালে, যখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন মুগ্ধ হন তার পারফরম্যান্সে। স্পোর্টিংয়ের সঙ্গে প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতি ম্যাচ দেখে নিজের ক্লাবকে পরামর্শ দেন যাতে রোনালদোকে দলে ভেড়ায়। 

dhakapost

প্রথম পর্তুগিজ খেলোয়াড় হিসেবে কিশোর রোনালদো ইউনাইটেডে যোগ দেন ইংল্যান্ডের তৎকালীন রেকর্ড ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড ট্রান্সফার ফিতে। এরপর ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ এবং জুভেন্তাস হয়ে আবারও ইউনাইটেড দিয়ে ক্লাব ফুটবলের বর্ণাঢ্য একটি চক্র পূরণ করেছেন পর্তুগালের এই ফরোয়ার্ড। পুরো গল্পটাতে অসংখ্য ইতিহাস রচিত হয়েছে। দীর্ঘ ও গৌরবময় ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে রোনালদোর দৃষ্টি এখন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে। ধারণা করা হচ্ছে, এটাই হতে পারে তার শেষ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। 

জাতীয় দলের জার্সিতে উয়েফা নেশন্স লিগ ও ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে পর্তুগালকে শিরোপা জেতালেও ছোঁয়া হয়নি সর্বোচ্চ ট্রফি বিশ্বকাপের। তবে ২০২৬ আসরের তালিকায় আছেন তরুণ-অভিজ্ঞের মিশেলে গড়া পর্তুগাল দর। আর রোনালদো ৪১ বছর বয়সেও অসাধারণ ফিটনেস ধরে রেখেছেন। প্রতিযোগিতা করছেন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে তার কঠোর জীবনযাপন ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। তার খাদ্যাভ্যাস বেশ নিয়ন্ত্রিত, যেখানে প্রোটিন–কার্বোহাইড্রেট এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির সুষম সমন্বয় থাকে।

রোনালদো চিনি-সমৃদ্ধ পানীয় এড়িয়ে চলেন এবং প্রতিদিন পান করেন ৩ থেকে ৫ লিটার পর্যন্ত পানি। তার প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে শক্তি বৃদ্ধি, কার্ডিও ব্যায়াম এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক অনুশীলনের সমন্বয় রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত ঘুমকে তিনি ফিটনেস রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। রোনালদোর প্রভাব কেবল মাঠের পারফরম্যান্সেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম এবং পেশাদারিত্বের কারণে তিনি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস।

পরিসংখ্যানের দিক থেকেও অনন্য সিআরসেভেন। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে তার গোলসংখ্যা ৯৭০ ছাড়িয়েছে। তবে এখানেই থামছেন না নিজেকে নিয়ে অতৃপ্ত এই তারকা, ১০০০ গোলের লক্ষ্যটা নিজ থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের ৫ আসরেই গোল করেছেন সিআরসেভেন। মোট ১৮ ম্যাচে করেছেন ৮ গোল। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ (২২৬) ও সর্বোচ্চ গোলের (১৪৩) রেকর্ডও তার দখলে।

ফুটবলে অর্জনের পাশাপাশি রোনালদো তার মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্যও পরিচিত। শিশু হাসপাতাল, দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলসহ বিভিন্ন দাতব্য খাতে তিনি কোটি কোটি ডলার অনুদান দিয়ে আসছেন। এমনকি তার একটি ব্যালন ডি’অরসহ ব্যক্তিগত পুরস্কার নিলামের মাধ্যমে দাতব্য কাজে সহায়তারও নজির রয়েছে। ফুটবলের ইতিহাসে নিজের নামটি খোদাই করতে রোনালদোর বিশ্বকাপ জয় অপরিহার্য কি না? সংক্ষিপ্ত উত্তর হতে পারে– ‘না’। কারণ তিনি ইতোমধ্যেই এমন সব সাফল্য অর্জন করেছেন যা তাকে কোটি ভক্তের কাছে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে। 

অবশ্য পর্তুগাল যদি রোনালদোর বিদায়ের আগে বিশ্বকাপ জিততে না পারে, সেটি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অন্যতম আক্ষেপ হয়ে থেকে যেতে পারে। রোনালদো নিজেও নিশ্চয়ই অপ্রাপ্তি নিয়ে পিচ ছাড়তে চাইবেন না! ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায় সাদামাটা পারফরম্যান্সের দিনে মেজাজ হারানো, দর্শকদের দুয়ো শুনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া কিংবা আল-নাসরের শিরোপা হাতছাড়া হওয়ায় কান্নায় ভেঙে পড়ার মতো দৃশ্য এখনও তরতাজা উদাহরণ!

এএইচএস