স্পেন তাদের ১৭তম ফিফা বিশ্বকাপের জন্য মাঠে নামতে প্রস্তুত। কাতারে গত আসরে শেষ ১৬ থেকে বিদায় নেওয়ার আক্ষেপ মেটাতে চাইছে তারা। তার চেয়েও বড় স্বপ্ন দেখছে। ২০১০ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আগে ইউরোর ট্রফি জিতেছিল স্পেন। সবশেষ ইউরোপিয়ান ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট অর্জন করে সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি চাইছে তারা।
উয়েফা ইউরো ২০২৪ জয় ও ২০২৪-২৫ উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে পৌঁছানোর পর লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল উচ্চ মনোবল নিয়ে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে টুর্নামেন্টে নামবে। তারা প্রায় নিখুঁত একটি বাছাইপর্ব পার করেছে। শেষ ম্যাচের আগে তাদের জানা ছিল টিকিট পেতে তুরস্কের বিপক্ষে শুধুমাত্র বড় ব্যবধানে পরাজয় এড়াতে হবে। তাদের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হলো দেশটির সোনালি প্রজন্মের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করা।
স্পেন কোচ: লুইস দে লা ফুয়েন্তে
দে লা ফুয়েন্তে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কোচের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২১ দলের দায়িত্বে সফলভাবে কাজ করার পর পদোন্নতি পান। কাতার ২০২২ শেষে লুইস এনরিকের দল মরক্কোর কাছে শেষ ১৬-তে হেরে বিদায় নেওয়ার পর তার মেয়াদ শুরু হয়।
এই কৌশলী কোচ আক্রমণাত্মক ফুটবলের মূল নীতিতে অটল থেকেছেন এবং দলের খেলায় বৈচিত্র্য যোগ করেছেন। তিনি বল দখলে রাখার শৈলীর সঙ্গে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ ও স্থানান্তরের ক্ষমতার সমন্বয় ঘটিয়েছেন। এই প্রাক্তন ফুল-ব্যাক পাউ কুবারসি, ডিন হুইজেন, নিকো উইলিয়ামস ও লামিন ইয়ামালের মতো একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়কে কাজে লাগিয়েছেন। তাদের অনেকের সাথেই তিনি যুব পর্যায়ে কাজ করেছেন।

স্পেনের বিশ্বকাপ সূচি
১৫ জুন: স্পেন বনাম কাবো ভার্দে - আটলান্টা স্টেডিয়াম
২১ জুন: স্পেন বনাম সৌদি আরব - আটলান্টা স্টেডিয়াম
২৬ জুন: উরুগুয়ে বনাম স্পেন - এস্তাদিও গুয়াদালাজারা
স্পেনের বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: উয়েফা
সেরা বিশ্বকাপ: চ্যাম্পিয়ন
শেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২
প্রথম বিশ্বকাপ: ইতালি ১৯৩৪
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ১৭ বার (১৯৩৪, ১৯৫০, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬)
টানা অংশগ্রহণের রেকর্ড: ১৩ বার (১৯৭৮ থেকে)
বিশ্বকাপ আয়োজক: ১৯৮২ (দ্বিতীয় রাউন্ড পর্যায়)
সামগ্রিক বিশ্বকাপ রেকর্ড: ম্যাচ ৬৭, জয় ৩১, ড্র ১৭, হার ১৯, গোল করেছে ১০৮, গোল খেয়েছে ৭৫।
স্পেনের শেষ বিশ্বকাপ
কাতার ২০২২ স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে ‘কী হতে পারত’ তার একটি উদাহরণ হিসেবে থেকে গেছে। লুইস এনরিকের পছন্দের দলটির একটি অত্যন্ত স্বতন্ত্র শৈলী ছিল: বল দখল রাখা, চরম চাপ প্রয়োগ করা এবং নিচ থেকে ধীরে ধীরে আক্রমণ তৈরি করা। টুর্নামেন্টের শুরুতে সমর্থকদের কল্পনা জয় করে শিরোপার দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করলেও আসল সময়ে তারা প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।
কোস্টারিকার বিপক্ষে ৭-০ গোলের বিশাল জয় দিয়ে তাদের অভিযান শুরু হয়েছিল। এরপর জার্মানির সাথে একটি কষ্টার্জিত ড্র এবং জাপানের কাছে ২-১ গোলে হার। জাপানিদের বিপক্ষে যে গোল খরা তাদের ভুগিয়েছিল, তা শেষ ১৬-তে মরক্কোর শক্তিশালী রক্ষণভাগের সামনে আবারও দেখা দেয়। ১২০ মিনিটের লড়াই গোলশূন্য থাকার পর পেনাল্টি শুটআউটে উত্তর আফ্রিকানরা জয় উদযাপন করে।

স্পেনের প্রথম বিশ্বকাপ
১৯৩৪ সালে স্প্যানিশরা তাদের প্রথম বিশ্বকাপ অভিষেকে চমৎকার পারফরম্যান্স করেছিল। উদ্বোধনী ম্যাচে তারা শেষ ১৬-তে ব্রাজিলকে হারিয়ে দেয়। কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ইতালির বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের পর ১-১ ড্র করে। প্রতিযোগিতার ইতিহাসে প্রথম ড্র ছিল সেটা। তখন পেনাল্টি শুটআউট না থাকায় পুনরায় ম্যাচ খেলার প্রয়োজন হয়। ইতালি ১-০ গোলে জয়ী হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
স্পেনের বিশ্বকাপ সর্বোচ্চ গোলদাতা
৯টি গোল নিয়ে স্পেনের সর্বকালের শীর্ষ বিশ্বকাপ গোলদাতা হলেন ডেভিড ভিয়া। এই স্ট্রাইকার তিনটি বিশ্বকাপে (২০০৬, ২০১০ এবং ২০১৪) অংশ নিয়েছিলেন। যদিও জোহানেসবার্গে ২০১০ সালের ১১ জুলাই শিরোপা জয়ের রাতে তিনি গোল করেননি, তবুও স্পেনের সেই জয়ী অভিযানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
৫টি করে গোল নিয়ে চারজন খেলোয়াড় যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন: এমিলিও বুত্রাগুয়েনো (১৯৮৬), ফার্নান্দো হিয়েরো (১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২), ফার্নান্দো মরিয়েন্তেস (১৯৯৮, ২০০২) এবং রাউল (১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬)।
স্পেনের রেকর্ড বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়
শীর্ষস্থানটি তিনজন খেলোয়াড় ভাগ করে নিয়েছেন। চারটি বিশ্বকাপে ১৭টি করে ম্যাচ খেলেছেন ইকার ক্যাসিয়াস, সার্জিও রামোস ও সার্জিও বুসকেটস। গোলরক্ষক আন্দোনি জুবিজারেতা ১৬টি ম্যাচ খেলেছেন এবং জাভি ১৫টি ম্যাচ নিয়ে শীর্ষ পাঁচ পূর্ণ করেছেন।
স্পেনের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ জয়
২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর কাতারের গ্রুপ পর্বে কোস্টারিকাকে ৭-০ গোলে হারিয়ে স্পেন এক ফুটবলীয় মাস্টারক্লাস প্রদর্শন করেছিল। লুইস এনরিকের দল তাদের সিগনেচার পাসিং স্টাইল এবং ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের পূর্ণ সম্ভাবনা দেখিয়েছিল।
খেলার ১১তম মিনিটে দানি অলমোর গোলে গোলের খাতা খোলে। এরপর মার্কো আসেনসিও ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এবং ফেরান তোরেস পেনাল্টি থেকে গোল করে প্রথমার্ধ ৩-০ করেন। বিরতির পর তোরেস তার দ্বিতীয় গোল করেন, গাভি একটি চমৎকার ভলিতে ৫-০ করেন এবং শেষ দিকে কার্লোস সোলের ও আলভারো মোরাতা গোল করে স্পেনের ইতিহাসের বৃহত্তম বিশ্বকাপ জয় নিশ্চিত করেন।
এফএইচএম

