মাঠের পারফরম্যান্সে যে অমরত্ব লাভ করছিলেন, কেবল সেটাই হতে পারত তার চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট। ফ্রান্স ফুটবলের ইতিহাসে মিশেল প্লাতিনি শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলার নন, বরং দেশটির ফুটবল আত্মবিশ্বাসের ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাতা। প্লাতিনির আগপর্যন্ত ফ্রান্সকে বিশ্ব ফুটবলের মাঝারি মানের দল হিসেবেই দেখা হতো। জাস্ট ফন্টেইনের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড় থাকলেও আন্তর্জাতিক সাফল্যের মুখ দেখেনি দলটি। প্লাতিনি সেই বাস্তবতা বদলে দেন।
১৯৮৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ফ্রান্সকে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা এনে দিয়ে নিজেকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা টুর্নামেন্ট পারফর্মার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন প্লাতিনি। স্বাগতিক ফ্রান্সের হয়ে টুর্নামেন্টের পাঁচ ম্যাচেই গোল করেন তিনি, যা এখনও ইউরোর ইতিহাসে অনন্য। ডেনমার্কের বিপক্ষে একমাত্র গোল, বেলজিয়াম ও যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে টানা দুই হ্যাটট্রিক, সেমিফাইনালে পর্তুগালের বিপক্ষে ১১৯তম মিনিটের নাটকীয় গোল এবং ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে গোল- সবমিলিয়ে তিনি একাই যেন পুরো টুর্নামেন্ট নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। স্ট্রাইকার না হয়েও পাঁচ ম্যাচে ৯ গোল করে তিনি এখনও ইউরোর এক আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতা।

আরও পড়ুন
ক্লাব ফুটবলেও প্লাতিনির সাফল্য ছিল অসাধারণ। ইতালির জুভেন্তাসে যোগ দিয়ে তিনি ক্লাবটিকে নিয়ে যান নতুন উচ্চতায়। ১৯৮৫ সালে জুভেন্তাস প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান কাপ বা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতে তার নেতৃত্বে। ফাইনালে লিভারপুলের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটিও ছিল প্লাতিনির। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। একই সময়ে জুভেন্তাসকে প্রথম ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জেতাতেও বড় ভূমিকা রাখেন তিনি।

প্লাতিনির ব্যক্তিগত অর্জনের পাল্লাও বেশ ভারী। তিনিই প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা তিনবার ব্যালন ডি’অর জেতেন (১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৫)। তার খেলার সৌন্দর্য, নিখুঁত পাস, অসাধারণ ফ্রি-কিক ও বড় ম্যাচে জ্বলে ওঠার ক্ষমতা তাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও ১৯৮২ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে তুলতে নেতৃত্ব দেন তিনি। বিশেষত ১৯৮২ আসরে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে স্মরণীয় সেমিফাইনাল এবং ১৯৮৬ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তার পারফরম্যান্স আজও ফুটবল ইতিহাসে উজ্জ্বল।
ফ্রান্স জাতীয় দলের ৭২ ম্যাচে ৪১ গোল করা প্লাতিনি দীর্ঘদিন দেশটির সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। জিনেদিন জিদানের ভাষায়– ‘ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে নামলে আমি সবসময় প্লাতিনির মতো হতে চাইতাম।’ এই উক্তিই বলে দেয়, শুধু সাফল্য নয়—ফরাসি ফুটবলের স্বপ্ন দেখার সাহসটাও প্লাতিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন।

কিন্তু আদর করে যাকে বলা হতো ‘লে রোয়া’ বা ‘দ্য কিং’, সেই মিশেল প্লাতিনির গৌরবময় ভাবমূর্তি পরে দুর্নীতি কেলেঙ্কারির অভিযোগের মাঝে ডুবে গেছে। তবে তার প্রশাসনিক শুরুটা ছিল ফুটবল ক্যারিয়ারের মতোই সুন্দর। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের আয়োজক কমিটির যৌথ সভাপতি হিসেবে প্লাতিনির প্রথম বড় প্রশাসনিক ভূমিকা শুরু হয়। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপ স্বাগতিক দেশের জন্য বিশাল সাফল্য বয়ে আনে। বহুজাতিক সংস্কৃতির ফরাসি দল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে। পরে তিনি উয়েফার নির্বাহী কমিটির সদস্য হন এবং ২০০৭ সালে নির্বাচনে লেনার্ট জোহানসনকে হারিয়ে হয়েছেন উয়েফার নির্বাচিত সভাপতি। তিনিই ছিলেন প্রথম সাবেক ফুটবলার যিনি উয়েফার সভাপতি হলেন।
ফিফার তৎকালীন সভাপতি সেপ ব্লাটার ও প্লাতিনির বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, অব্যবস্থাপনা ও ২০ লাখ সুইস ফ্রাঁ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। মূলত ২০১১ সালে ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটারের অনুমোদনে মিশেল প্লাতিনিকে ২০ লাখ সুইস ফ্রাঁ প্রদান করা হয়। প্লাতিনি ও ব্লাটারের দাবি ছিল, এটি ১৯৯৮–২০০২ সালে ফিফা সভাপতির উপদেষ্টা হিসেবে প্লাতিনির কাজের বকেয়া পারিশ্রমিক, যা একটি মৌখিক সমঝোতার ভিত্তিতে পরে পরিশোধ করা হয়। পরে ২০১৫ সালে ফিফা-সংক্রান্ত দুর্নীতি তদন্তের সময় সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এই অর্থপ্রদানকে। অভিযোগ ওঠে অর্থপ্রদানের পক্ষে কোনো লিখিত চুক্তি ছিল না এবং ফিফা কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এর ফলে প্লাতিনি ও ব্লাটার দুজনেই ফিফার নৈতিকতা কমিটির শাস্তির মুখে পড়েন এবং প্লাতিনির ফিফা সভাপতি হওয়ার দৌড় কার্যত শেষ হয়ে যায়।

দীর্ঘ তদন্ত ও বিচার শেষে ২০২২ সালে সুইস আদালত দুজনকেই খালাস দেয়। যদিও আইনজীবীদের মতে, প্রসিকিউশন দুর্নীতি বা প্রতারণার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি এবং মৌখিক চুক্তির ব্যাখ্যাটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। পরে প্রসিকিউটররা আপিল করলেও ২০২৫ সালে আপিল আদালতও একই সিদ্ধান্ত দেয় এবং প্লাতিনি ও ব্ল্যাটারকে পুনরায় খালাস প্রদান করে। আইনি দৃষ্টিতে দুজনই নির্দোষ প্রমাণিত হন, যদিও ১০ বছরে নিষ্পত্তি হওয়া এই মামলা প্লাতিনির ফুটবল প্রশাসনিক ক্যারিয়ারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। নইলে তিনি হতে পারতেন ব্লাটার-পরবর্তী ফিফার প্রভাবশালী সভাপতি! এ ছাড়া প্লাতিনির বিরুদ্ধে ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজনে কাতারের স্বত্ব পাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক কৌশল খাটানোরও অভিযোগ শোনা যায়।
এদিকে, ২০১৬ সালের ফিফার নির্বাচনে জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও উয়েফার নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হন আলেক্সান্ডার সেফরিন। এর আগে দুর্নীতি-সংক্রান্ত ঘটনাটি আলোড়ন সৃষ্টি করলে ব্লাটারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এবং তিনি ফিফা সভাপতির পদ ছেড়ে দেন।
এএইচএস

