World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

কাঠমিস্ত্রি থেকে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা, ক্লোসার অবিশ্বাস্য রূপকথা

কাঠমিস্ত্রি থেকে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা, ক্লোসার অবিশ্বাস্য রূপকথা

শুরুটা স্থানীয় ক্লাব দিয়ে, নামী কোনো ক্লাবে প্রশিক্ষণের সুযোগ মেলেনি। এমনকি তরুণ বয়সে কাঠমিস্ত্রির শিক্ষানবিশ হিসেবেও কাজ করেছেন। মিরোস্লাভ ক্লোসা নামে বিশ্ব ফুটবলের এক রহস্যময় ব্যক্তির বয়সটা যখন স্রেফ একুশ, ওই সময়েও খেলছিলেন জার্মানির পঞ্চম স্তরের লিগে। প্রথম স্তরের প্রতিযোগিতা কিংবা জার্মান জাতীয় দলে তাকে দেখার ভাবনাটা হয়তো অকল্পনীয়ই ছিল। তবে সেখান থেকেই উত্থানটা ঘটে ক্লোসার। 

পোল্যান্ডে জন্ম এবং সেখানে তার শৈশব কেটেছে। তবে আট বছর বয়সে ১৯৮৬ সালে দেশটির কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থা থেকে পালিয়ে পরিবারের সঙ্গে পশ্চিম জার্মানির ব্লাউবাখে আসার পর স্থানীয় ক্লাবের হয়ে খেলা শুরু করেন ক্লোসা। ক্যারিয়ারের মতোই তার ফুটবলযাত্রার সূচনাটা ছিল বিনয়ী। ২০০২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তোলার মাত্র তিন বছর আগে তিনি খেলছিলেন জার্মানির পঞ্চম স্তরের দল এফসি-০৮ হোমবুর্গে। তার বাবা ছিলেন জার্মান বংশোদ্ভূত এবং ফুটবল খেলতেন পোল্যান্ডের তৃতীয় বিভাগ ট্রেচিয়া লিগায়। 

dhakapost

অন্যদিকে, ক্লোসার মা ছিলেন ভলিবল খেলোয়াড়। যিনি পোল্যান্ডের হয়ে ৬২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। এই ক্রীড়ামুখর পরিবারেই বেড়ে ওঠেন জার্মান স্ট্রাইকার। স্থানীয় ক্লাবে খেলার একপর্যায়ে কাকতালীয়ভাবে এফসি কাইজারস্লটার্নের এক স্কাউটের নজরে পড়েন ক্লোসা। প্রথমে ক্লাবটির অপেশাদার দলের হয়ে খেলে ২০০০ সালের এপ্রিলে বুন্দেসলিগায় অভিষেক হয় তার। ২০০১-০২ মৌসুমে তিনি ১৬টি গোল করেন, যা তাকে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে নিয়ে যায়। বলা চলে সেখানেই ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ক্লোসার।

২০০১ সালে আন্তর্জাতিক অভিষেকেই তিনি গোল করেন। তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ভের্দার ব্রেমেন, বায়ার্ন মিউনিখ ও লাৎসিওর মতো বড় ক্লাবগুলোতে খেললেও তার আসল মঞ্চ হয়ে ওঠে বিশ্বকাপ। বয়সটা যখন ২৩, তখন পোল্যান্ডের কোচ জেরজি অ্যাঙ্গেল তাদের হয়ে ক্লোসাকে খেলাতে রাজি করানোর মিশনে নামেন। কিন্তু ক্লোসার স্পষ্ট সিদ্ধান্ত– ‘আমার জার্মান পাসপোর্ট আছে। আর যদি সবকিছু এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে (তৎকালীন জার্মান কোচ) রুডি ফোলারের দলে খেলার সুযোগ পাব।’ ওই এক কথায় ফুটে উঠেছিল তার জার্মানির হয়ে খেলার তীক্ষ্ণ আবেগ। 

জার্মানির হয়ে অভিষেক ম্যাচে আলবেনিয়ার বিপক্ষে মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় গোল করেন ক্লোসা। সেটিই ছিল জাতীয় দলের হয়ে তার ৭১ গোলের প্রথমটি। একই ম্যাচে দেখা যায় তার বিখ্যাত ব্যাকফ্লিপ উদযাপন, যা তার সাদামাটা ও কার্যকরী গোল করার ধাঁচের সঙ্গে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছিল। তখনও কেউ জানত না, একদিন এই ক্লোসাই গার্ড মুলার, উভে জেলার, ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান, অলিভার বিয়ারহফ এবং কোচ রুডি ফোলার– জার্মান ফুটবলের সব কিংবদন্তি গোলস্কোরারকে ছাড়িয়ে যাবেন।

এরপর ঝড়ের মতোই ২০০২ বিশ্বকাপে ক্লোসার আবির্ভাব। সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেন হেডে করা তিনটি গোলে। পুরো টুর্নামেন্টে পাঁচ গোল করে জার্মানিকে ফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। ব্রাজিলের কাছে হেরে শিরোপা অধরা থাকলেও তখনই বোঝা যায়, এই স্ট্রাইকার বড় মঞ্চের জন্যই তৈরি। যদিও নিজেকে কখনোই বড় করে দেখাননি ক্লোসা। বরং মাঠের পারফরম্যান্স এবং গোলের পর ‘সাল্টো’ উদযাপনের পর আবারও আড়ালে চলে যেতেন।

dhakapost

 ক্লোসা ওঁৎ পেতে থাকতেন আরেকটি সুবর্ণ সুযোগের! যেমনটা তার কথাতেই ফুটে ওঠে– ‘গোল করা আর মাছ ধরার ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরতে হয়, সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা করে শক্তি আর ঠাণ্ডা মাথার নিখুঁত সমন্বয় ঘটাতে হয়।’ ক্লোসা নিঃশব্দে-নিঁখুত কাজ করে যাওয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন। ২০০৬ বিশ্বকাপ আসর বসে তার দেশ জার্মানিতে। উদ্বোধনী ম্যাচে জোড়া গোলে শুরু, আসরজুড়ে সেই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ক্লান্তিহীনভাবে করে গেছেন এই বিনয়ী ফুটবলার।

তৃতীয় স্থানে থেকে জার্মানরা টুর্নামেন্ট শেষ করলেও, পাঁচ গোল করা ক্লোসা গোল্ডেন বুট জিতেছেন। ২০১০ আসরেও ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার মতো বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে গোলসহ চারবার স্কোরশিটে নাম তোলেন তিনি। জার্মানরা ওই আসরও শেষ করে তৃতীয় দল হিসেবে। ক্লোসার কিংবদন্তি হয়ে ওঠার আসর ২০১৪, যেখানে তার দল ২৪ বছর পর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।

ঘানার বিপক্ষে এক গোল করে ক্লোসা প্রথমে রোনালদো নাজারিও’র সর্বোচ্চ ১৫ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন। আর ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক সেমিফাইনালে করা একটি গোল তাকে আলাদা করে জায়গা দেয় সবার চেয়ে উঁচুতে। প্রথম শট আটকে যাওয়ার পর দ্বিতীয় চেষ্টায় নিখুঁত সমাপ্তি, সব মিলিয়ে গোলটি ছিল পজিশনিং আর ঠাণ্ডা মাথার এক নিখুঁত উদাহরণ। তার ১৬ গোল এখনও বিশ্বকাপে ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ স্কোরের রেকর্ড। যদিও ৩৭ বছর বয়সী এই তারকার জন্য ওই আসরে খেলাটা অনিশ্চিত ছিল, মার্কো রইসের ইনজুরি তার সামনে ইতিহাসের অংশ হওয়ার দুয়ার খুলে দেয়। 

dhakapost

ক্লাব ফুটবলে এই জার্মান স্ট্রাইকার ৬৭২ ম্যাচ খেলে ২৫৯ গোল করেন। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৭১ গোল করেন ১৩৭ ম্যাচে। অর্থ, লোভ, দুর্নীতি ও বিলাসিতায় আক্রান্ত আধুনিক ফুটবলে ক্লোসা ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন ফুটবলের প্রকৃত ভদ্রলোকদের একজন, যিনি চিরকাল মনে করিয়ে দেবেন দীর্ঘ গ্রীষ্মের সেই ফুটবল উৎসব, অসংখ্য গোলের স্মৃতি এবং সময়কেও অতিক্রম করা এক মানবিক কিংবদন্তির কথা। 

এএইচএস