World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

মারিও কেম্পেস/

আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক, বিতর্ক-অবমূল্যায়ন ও আক্ষেপের নাম

আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক, বিতর্ক-অবমূল্যায়ন ও আক্ষেপের নাম

উরুগুইয়ান লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানো তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’–তে মারিও কেম্পেসকে তুলনা করেছিলেন ‘এক অবিনাশী বুনো ঘোড়া’র সঙ্গে—যে কনফেটির (উৎসবে ব্যবহৃত কাগজ বা ধাতবের রঙিন ছোট টুকরো) তুষারঝড়ের মধ্যে মাঠজুড়ে ছুটে বেড়ায়, বাতাসে উড়তে থাকে তার এলোমেলো কেশর। ১৯৭৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল উদযাপনরত কেম্পেসের সেই দৃশ্য আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ছবি।

১৯৫৪ সালে আর্জেন্টিনার ছোট শহর বেল ভিয়েতে জন্ম নেওয়া মারিও আলবের্তো কেম্পেস এমন এক অঞ্চলে বড় হয়েছিলেন, যেখানে ফুটবল শুধু খেলা নয়, এক ধরনের শিল্প। কর্দোবা ও রোজারিওর মাঝামাঝি অবস্থিত শহরটি ফুটবল তৈরির কারখানার জন্য বিখ্যাত। তাই কেম্পেসের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ফুটবল–ই।

তার পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরু কর্দোবার ইনস্টিতুতো ক্লাবে। অল্প সময়েই গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে আলাদা করে তোলে। পরে রোজারিও সেন্ট্রালে যোগ দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন দেশের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে। ১৯৭৫ মৌসুমে ২৫ ম্যাচে ২৫ গোল করে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। পরের মৌসুমেও গোলের সেই ধার অব্যাহত থাকে তার।

এই পারফরম্যান্সের সুবাদেই খুব অল্প বয়সে জাতীয় দলে ডাক পান কেম্পেস। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে অংশ নিলেও সেটি ছিল হতাশার টুর্নামেন্ট। ওই আসরে আর্জেন্টিনা প্রথম পর্ব পার করার পর দ্বিতীয় রাউন্ডে নেদারল্যান্ডস, ব্রাজিল ও পূর্ব জার্মানির মতো কঠিন প্রতিপক্ষের গ্রুপে পড়ে বিদায় নেয়। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৪-০ ব্যবধানে পরাজয় বিশেষভাবে আঘাত করেছিল আর্জেন্টাইন ফুটবলকে। সেই ব্যর্থতা দেশটির ফুটবল দর্শন ও পরিচয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

এরপর জাতীয় দলের দায়িত্ব পান সেসার লুইস মেনোত্তি। তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা আবারও আক্রমণাত্মক ও শৈল্পিক ফুটবলের পথে ফিরে আসে। এদিকে, ১৯৭৬ সালে কেম্পেস স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ায় যোগ দিয়ে ইউরোপেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। প্রথম মৌসুমেই পিচিচি ট্রফি জেতেন এবং পরের মৌসুমেও লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। ১৯৭৮ বিশ্বকাপের আগে তিনি ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে।

স্বাগতিক আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপ ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিতর্কিত। সামরিক শাসনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং ভয়ের পরিবেশের মধ্যেই টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়। তবুও দেশের মানুষের কাছে ফুটবল ছিল আশা ও গৌরবের একমাত্র আশ্রয়।

বিশ্বকাপের শুরুটা কেম্পেসের জন্য সুখকর ছিল না। হাঙ্গেরি ও ফ্রান্সকে হারালেও ইতালির কাছে পরাজিত হয়ে আর্জেন্টিনা গ্রুপে দ্বিতীয় হয়। ফলে দলকে বুয়েন্স আয়ার্সে ছেড়ে রোজারিওতে যেতে হয়। অনেকের কাছে এটি অসুবিধাজনক মনে হলেও কেম্পেসের জন্য সেটিই হয়ে ওঠে মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত। রোজারিও ছিল তার পুরোনো ঠিকানা। পরিচিত পরিবেশে ফিরে যেন নতুন প্রাণ ফিরে পান তিনি।

দ্বিতীয় পর্বের প্রথম ম্যাচে পোল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-০ ব্যবধানে জয় এনে দেন কেম্পেস। জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ গোলখরা কাটিয়ে সেই ম্যাচেই তিনি টুর্নামেন্টে নিজের ছাপ রাখতে শুরু করেন। তবে ম্যাচটি বিতর্কও সৃষ্টি করে। একটি নিশ্চিত গোল হাত দিয়ে ঠেকিয়ে দেন কেম্পেস। পোল্যান্ড পেনাল্টি পেলেও গোল করতে ব্যর্থ হয়। ফলে লাল কার্ড না দেখায় তিনি মাঠে থেকে যান এবং পরে দ্বিতীয় গোলও করেন। ঘটনাটি অনেক সমালোচনার জন্ম দিলেও তার পারফরম্যান্সের গুরুত্ব কমায়নি।

পরের ম্যাচে ব্রাজিলের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর আর্জেন্টিনার সামনে কঠিন সমীকরণ দাঁড়ায়। ফাইনালে উঠতে হলে পেরুকে বড় ব্যবধানে হারাতে হবে। সেই ম্যাচটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে। নানা রাজনৈতিক প্রভাব ও অনৈতিক সুবিধার অভিযোগের মধ্যে আর্জেন্টিনা ৬-০ ব্যবধানে জয় পায়। কেম্পেস করেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ গোল এবং দলকে ফাইনালে তোলার প্রধান কারিগর হয়ে ওঠেন।

ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল নেদারল্যান্ডস, চার বছর আগের সেই দলের উত্তরসূরি। যাদের কাছে ১৯৭৪ সালে অপমানজনকভাবে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৩৮ মিনিটে কেম্পেস গোল করে স্বাগতিকদের এগিয়ে দেন। শেষ মুহূর্তে ডাচরা সমতা ফেরালে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। তখনই আবার জ্বলে ওঠেন কেম্পেস। ১০৫ মিনিটে তার দ্বিতীয় গোল আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেয়। পরে ড্যানিয়েল বের্তোনির গোল ব্যবধান বাড়ালে নিশ্চিত হয় ৩-১ ব্যবধানের জয়। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের উন্মাদনায় মাতে আর্জেন্টিনা। সাময়িকভাবে মানুষ ভুলে যায় সামরিক শাসনের দগদগে ক্ষত।

‘এল ম্যাটাডোর’ কেম্পেস হয়ে ওঠেন জাতীয় বীর। তিনি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সেরা খেলোয়াড়– উভয় পুরস্কারই জেতেন। নিচ থেকে বল নিয়ে দ্রুতগতিতে আক্রমণে ওঠা, শক্তিশালী দৌড় এবং গোলের সামনে নির্ভুল সমাপ্তি তাকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। তবে এই সাফল্যের ওপর সামরিক শাসনের ছায়া সবসময়ই থেকে গেছে। বিশ্বকাপকে রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে আর্জেন্টাইন জান্তার বিরুদ্ধে।

পরবর্তী সময়ে কেম্পেস নিজেকে এসব বিতর্ক থেকে দূরে রেখে বলেন, খেলোয়াড়রা মূলত নিজেদের, দেশের মানুষ এবং আর্জেন্টাইন ফুটবলের জন্য খেলেছিলেন। বিশ্বকাপ জয়ের পর তিনি আবার ভ্যালেন্সিয়ায় ফিরে যান এবং আরও সাফল্য অর্জন করেন। কোপা দেল রে, ইউরোপিয়ান কাপ উইনার্স কাপ ও উয়েফা সুপার কাপ জয়ের পাশাপাশি গোল করতে থাকেন ছন্দময় ফুটবলে। পরে রিভার প্লেটে ফিরে এসে ১৯৮১ সালের নাসিওনাল শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কেম্পেস। সেটিই ছিল তার ক্যারিয়ারের একমাত্র আর্জেন্টাইন লিগ শিরোপা।

১৯৮২ বিশ্বকাপে তিনি আবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপান। এবার তার সতীর্থ ছিলেন তরুণ দিয়েগো ম্যারাডোনা। কিন্তু আর্জেন্টিনা আগের সাফল্য আর ধরে রাখতে পারেনি। ইতালি ও ব্রাজিলের কাছে হেরে বিদায় নেয় আসর থেকে। সেই টুর্নামেন্টের পরই কার্যত শেষ হয়ে যায় কেম্পেসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

ক্লাব ফুটবলে পরে কেম্পেস আবারও স্পেনে ফেরেন, খেলেন হারকিউলেসে। এরপর অস্ট্রিয়া, চিলি ও ইন্দোনেশিয়াতেও ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় কাটান। অবসর নেওয়ার পর বিভিন্ন দেশে কোচিং করিয়েছেন এবং পরে মিডিয়ায় বিশ্লেষক ও ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেছেন। ভ্যালেন্সিয়ায় তার জনপ্রিয়তা এতটাই গভীর যে ক্লাবের শতবর্ষ উদযাপনেও তিনি বিশেষভাবে সম্মানিত হন। আর কর্দোবায় ১৯৭৮ বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘এস্তাদিও মারিও আলবের্তো কেম্পেস’। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু ‘কেম্পেস’ নামেই পরিচিত।

দিয়েগো ম্যারাডোনা একবার লিখেছিলেন, আর্জেন্টিনায় কেম্পেস তার প্রাপ্য স্বীকৃতি পুরোপুরি পাননি। কারণটা– হয়তো তার ক্যারিয়ারের সেরা সময় কেটেছে স্পেনে। তবু ইতিহাসের বিচারে তার অবস্থান অটুট। কারণ সব বিতর্ক, সব অসম্পূর্ণতা আর ক্লাব পর্যায়ের অপূর্ণ সাফল্যের ঊর্ধ্বে একটি সত্য রয়ে গেছে– ১৯৭৮ সালে তিনি আর্জেন্টিনাকে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন। আর ফুটবলে এর চেয়ে বড় পরিচয় খুব কম খেলোয়াড়েরই আছে।

এএইচএস/এমএমএম