World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

রোমারিও : বস্তির গলি থেকে বিশ্ব ফুটবলের অমর কিংবদন্তি

রোমারিও : বস্তির গলি থেকে বিশ্ব ফুটবলের অমর কিংবদন্তি

ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর জাকারেজিনহো বস্তির সরু গলি থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের মঞ্চ– রোমারিও ডি সুজা ফারিয়ার জীবন যেন এক রূপকথার গল্প। দারিদ্র্য, বিতর্ক, প্রতিভা, সাফল্য আর বর্ণিল ব্যক্তিত্বের এক অনন্য মিশেলে গড়ে ওঠা এই ফুটবলারের নাম আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করেন ফুটবলপ্রেমীরা।

১৯৬৬ সালে জন্ম নেওয়া রোমারিওর শৈশব কেটেছে ব্রাজিলের অন্যতম বড় বস্তি এলাকায়। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার অসাধারণ ঝোঁক ছিল। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ওলারিয়া ক্লাবে যোগ দিয়ে দ্রুতই নিজের প্রতিভার জানান দেন তিনি। খাটো গড়নের হওয়ায় অনেকে তাকে অবহেলা করলেও তার গতি, ভারসাম্য, বল নিয়ন্ত্রণ এবং গোল করার সহজাত ক্ষমতা খুব অল্প সময়েই নজর কেড়ে নেয়।

dhakapost

তবে পথটা মোটেও সহজ ছিল না। কিশোর বয়সে ভাস্কো দা গামায় ট্রায়াল দিতে গিয়ে এক কোচ তাকে ‘অতিরিক্ত খাটো’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রত্যাখ্যানই হয়ে ওঠে রোমারিও’র প্রেরণা। পরে ভাস্কোর বিপক্ষে এক যুব ম্যাচে চার গোল করে তিনি সমালোচকদের জবাব দেন এবং ১৯৮১ সালে ক্লাবটিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান।

রোমারিওর ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই প্রতিভার পাশাপাশি বিতর্কও ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। ১৯৮৫ সালের বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপে অসদাচরণের অভিযোগে তাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তিন বছর পর ১৯৮৮ সিউল অলিম্পিকে সাত গোল করে ব্রাজিলকে ফাইনালে তোলেন এবং নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

dhakapost

সেই পারফরম্যান্সই তার জন্য ইউরোপের দরজা খুলে দেয়। ডাচ ক্লাব পিএসভি আইন্দহোভেনে যোগ দিয়ে তিনি দ্রুতই ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের ছাপ রাখেন। কোচ গুস হিডিঙ্কের অধীনে পাঁচ মৌসুমে ১৪২ ম্যাচে ১২৭ গোল করেন রোমারিও এবং জেতেন তিনটি এরেডিভিসি শিরোপা। তার বিখ্যাত ‘টো-পোক’ শট, দুর্দান্ত পজিশনিং এবং গোলের সামনে অসাধারণ স্থিরতা তাকে প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগের আতঙ্কে পরিণত করেছিল।

মাঠের বাইরেও রোমারিও ছিলেন সমান আলোচিত। আমোদ আর পার্টিপ্রিয়, স্বাধীনচেতা এবং জীবন উপভোগে বিশ্বাসী এই ফুটবলার কখনোই প্রচলিত নিয়মের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তবুও তার প্রতিভা এতটাই ব্যতিক্রমী ছিল যে বড় বড় ক্লাবগুলো তাকে দলে নিতে আগ্রহী ছিল।

রোমারিও ১৯৯৩ সালে যোগ দেন বার্সেলোনায়। কিংবদন্তি কোচ ইয়োহান ক্রুইফের ‘ড্রিম টিম’–এর অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠেন তিনি। মাত্র দেড় বছরে ৩৯ গোল করেন, জেতেন লা লিগা শিরোপা এবং এল ক্লাসিকোতে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে স্মরণীয় হ্যাটট্রিক উপহার দেন। বুলগেরিয়ার হ্রিস্টো স্তইচকভের সঙ্গে তার জুটি সে সময় ইউরোপীয় ফুটবলে অন্যতম ভয়ঙ্কর আক্রমণভাগ হিসেবে পরিচিত ছিল।

রোমারিওর ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সাফল্য আসে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত সেই আসরে তিনি ছিলেন ব্রাজিল দলের প্রাণভোমরা। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালে গুরুত্বপূর্ণ গোল এবং ইতালির বিপক্ষে ফাইনালে সফল পেনাল্টিতে ব্রাজিলকে চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্ব দেন। সেই বছরই ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হন রোমারিও।

ব্রাজিলের সাধারণ মানুষের কাছে রোমারিও কেবল একজন ফুটবলার নন, ছিলেন স্বপ্নপূরণের প্রতীক। জাকারেজিনহোর বস্তি থেকে উঠে এসে বিশ্বজয় করা এই মানুষটি প্রমাণ করেছিলেন প্রতিভা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে কোনো বাধাই অতিক্রম করা অসম্ভব নয়।

পরবর্তী সময়ে তিনি দেশে ফিরে ফ্ল্যামেঙ্গো ও ভাস্কো দা গামার হয়ে খেলেন। ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে মিলিয়ে ৮১ গোল করে আবারও নিজের অসাধারণ গোল করার ক্ষমতার প্রমাণ দেন। একই সময়ে তরুণ রোনালদো নাজারিওর সঙ্গে গড়ে তোলেন বিখ্যাত ‘রো-রো’ জুটি, যা ব্রাজিলকে ১৯৯৭ কোপা আমেরিকা জিততে সাহায্য করে।

তবে চোটের কারণে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ মিস করেন তিনি। আর ২০০২ বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলজুড়ে তাকে দলে নেওয়ার দাবিতে ব্যাপক জনমত গড়ে উঠলেও কোচ লুইজ ফেলিপে স্কলারি তাকে বাদ দেন। সিদ্ধান্তটি ব্রাজিলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়েও রোমারিওর গোল করার ক্ষুধা কমেনি। ৩৯ বছর বয়সে ব্রাজিলিয়ান লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি। ভাস্কো দা গামার হয়ে নিজের ১০০০তম গোলের দাবি করেও আলোচনায় আসেন, যদিও সেই সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

Image
দুই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোমেরো ও বেবেতো

বর্তমানে রাজনীতিতে সক্রিয় রোমারিও মাঠ ছেড়েছেন অনেক আগেই। কিন্তু তার উত্তরাধিকার আজও অমলিন। ইয়োহান ক্রুইফ একবার তাকে বলেছিলেন, ‘আমি যাদের কোচিং করিয়েছি, তাদের মধ্যে সেরা।’ এই মূল্যায়নই হয়তো তার অসাধারণ ফুটবল প্রতিভার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।

দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলে, সমালোচনাকে শক্তিতে রূপান্তর করে এবং নিজের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে রোমারিও বিশ্বফুটবলে যে ছাপ রেখে গেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনুপ্রেরণা জোগাবে। ফুটবল ইতিহাসে তিনি শুধু একজন কিংবদন্তি গোলদাতা নন, বরং অসম্ভবকে সম্ভব করার এক জীবন্ত প্রতীক।

এএইচএস