World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

ফেরেঙ্ক পুসকাস : গোল করা যার কাছে ছিল এক জাদুকরি শিল্প

ফেরেঙ্ক পুসকাস : গোল করা যার কাছে ছিল এক জাদুকরি শিল্প

ফুটবল ইতিহাসের পাতায় যে ক’জন কিংবদন্তি নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে গেছেন, তাদের মধ্যে হাঙ্গেরির মহানায়ক ফেরেঙ্ক পুসকাস অন্যতম। ফুটবল মাঠে গোল করাকে যিনি এক জাদুকরি শিল্পে রূপান্তর করেছিলেন, তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার ও গোলদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে বিশ্ব কাঁপানো হাঙ্গেরির সেই বিখ্যাত ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স’ দলের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন তিনি।

১৯২৭ সালের ১ এপ্রিল বুদাপেস্টে জন্ম নেওয়া পুসকাস শৈশব থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিলেন দারুণ অনুরাগী। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বুদাপেস্ট হনভেদ ক্লাবের হয়ে তার সিনিয়র ক্যারিয়ার শুরু হয়। ক্লাবটি হাঙ্গেরির সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকায় নিয়মানুযায়ী পুসকাসকে সামরিক পদ দেওয়া হয় এবং মাঠের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে তিনি পরবর্তীতে ‘গ্যালপিং মেজর’ উপাধিতে ভূষিত হন। এই ক্লাবের হয়ে তিনি ৩৫০টিরও বেশি গোল করেন এবং দলকে পাঁচটি লিগ শিরোপা জেতাতে সাহায্য করেন।

dhakapost

হাঙ্গেরি জাতীয় দলের হয়ে পুসকাসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল রূপকথার মতো। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত হাঙ্গেরি দল টানা ৩২টি ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন পুসকাস। তার দুর্দান্ত বাঁ পায়ের শট, অসাধারণ ড্রিবলিং এবং নিখুঁত পাসিংয়ের সামনে তৎকালীন বিশ্বের যেকোনো রক্ষণভাগ খড়কুটোর মতো উড়ে যেত।

তার নেতৃত্বে হাঙ্গেরি ১৯৫২ সালের হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জেতে। তবে পুসকাসের ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ ছিল ১৯৫৩ সালে লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে হাঙ্গেরি ৬-৩ ব্যবধানে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে, যা ছিল ঘরের মাঠে কোনো অ-ব্রিটিশ দলের কাছে ইংল্যান্ডের প্রথম পরাজয়। ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে হাঙ্গেরি ফেভারিট হিসেবে ফাইনালে উঠলেও পশ্চিম জার্মানির কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে রানার্স-আপ হয়, যা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে পরিচিত। হাঙ্গেরির হয়ে ৮৫ ম্যাচে ৮৪টি আন্তর্জাতিক গোল করার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েন পুসকাস।

১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরির রাজনৈতিক বিপ্লবের কারণে পুসকাস দেশ ছাড়েন এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নির্বাসিত জীবন কাটান। প্রায় দুই বছর ফুটবল থেকে দূরে থাকার পর ১৯৫৮ সালে ৩১ বছর বয়সে অতিরিক্ত ওজন নিয়ে তিনি স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন। অনেকেই ভেবেছিলেন তার ক্যারিয়ার শেষ, কিন্তু পুসকাস সবাইকে ভুল প্রমাণিত করেন।

আলফ্রেডো ডি স্টিফানোর সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি রিয়াল মাদ্রিদকে ইউরোপের অপরাজেয় দলে পরিণত করেন। রিয়ালের হয়ে ১৮০টি লিগ ম্যাচে তিনি ১৫৬টি গোল করেন। ক্লাবটির হয়ে তিনি চারটি পিচিচি (স্প্যানিশ লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা) ট্রফি, পাঁচটি টানা লা লিগা শিরোপা এবং তিনটি ইউরোপীয় কাপ (বর্তমান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) জেতেন। পরবর্তীতে তিনি স্পেনের নাগরিকত্ব নিয়ে ১৯৬২ বিশ্বকাপে স্পেনের হয়েও ৩টি ম্যাচ খেলেন।

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে পুসকাসের অবদান ও পারফরম্যান্স একাধারে যেমন অবিশ্বাস্য ও গৌরবোজ্জ্বল, তেমনি এক চরম ট্র্যাজেডিতে ঘেরা। তিনি মূলত ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির হয়ে অংশ নেন এবং দলকে ফাইনালে তুলতে একক আধিপত্য বিস্তার করেন।

dhakapost

১৯৫৪ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরি দল এসেছিল ফেভারিটের তকমা নিয়ে। তৎকালীন বিশ্বের সেরা এই দলটির অধিনায়ক এবং প্রধান কৌশলবিদ ছিলেন পুসকাস। তার নেতৃত্বে হাঙ্গেরি তৎকালীন বিশ্ব ফুটবলে আধুনিক ট্যাকটিকস প্রদর্শন করে, যা ফুটবল বিশ্বকাপকে কৌশলগতভাবে সমৃদ্ধ করেছিল।

গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে হাঙ্গেরি ৯-০ ব্যবধানে জয় পায়, যেখানে পুসকাস ২টি গোল করেন। দ্বিতীয় ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৮-৩ গোলের ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচেও তিনি ১টি গোল করেন। তবে এই ম্যাচেই জার্মানির ডিফেন্ডার ভের্নার লিচব্রিখের একটি কড়া ট্যাকলে পুসকাসের গোড়ালি মারাত্মকভাবে মচকে যায়। এই ইনজুরির কারণে তিনি কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনাল খেলতে পারেননি। তবে মাঠে না থাকলেও সাইডলাইনে থেকে দলকে মানসিকভাবে দারুণ অনুপ্রাণিত করেছিলেন তিনি।

পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে পুসকাস পুরোপুরি ফিট না থাকা সত্ত্বেও দেশের জন্য মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেন। ইনজুরি নিয়ে খেলেও ম্যাচের মাত্র ৬ মিনিটের মাথায় গোল করে হাঙ্গেরিকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। এর দুই মিনিট পর হাঙ্গেরি আরও একটি গোল করে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।

dhakapost

তবে জার্মানি অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচটি ৩-২ ব্যবধানে জিতে নেয়। ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে পুসকাস হাঙ্গেরির হয়ে সমতাসূচক একটি গোল করেছিলেন, কিন্তু লাইন্সম্যান বিতর্কিতভাবে তা অফসাইডের কারণে বাতিল করে দেন। এই ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসে ‘মিরাকল অব বার্ন’ নামে পরিচিত। রানার্স-আপ হলেও পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ খেলার জন্য পুসকাসকে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ‘গোল্ডেন বল’ দেওয়া হয়। তিনি সেই বিশ্বকাপে মাত্র ৩ ম্যাচ খেলে ৪টি গোল করেছিলেন।

পুসকাসের ফুটবল ক্যারিয়ারের আরেকটি অনন্য ও বিরল দিক হলো, তিনি দুটি ভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলেছেন। ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরি ছাড়ার পর তিনি স্পেনের নাগরিকত্ব পান। ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে তিনি স্পেনের হয়ে মাঠে নামেন। তবে ততদিনে তার বয়স হয়ে গিয়েছিল ৩৫ বছর এবং তৎকালীন স্প্যানিশ দলে রিয়াল মাদ্রিদের মতো রসায়ন না থাকায় স্পেন গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। স্পেনের হয়ে ৩টি ম্যাচ খেললেও তিনি কোনো গোল করতে পারেননি।

১৯৬৬ সালে ৩৯ বছর বয়সে পুসকাস বুট জোড়া তুলে রাখেন। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে তিনি কোচ হিসেবেও সফল ছিলেন; ১৯৭১ সালে গ্রিক ক্লাব পানাথিনাইকোসকে তিনি ইউরোপীয় কাপের ফাইনালে তুলেছিলেন। ২০০৬ সালের ১৭ নভেম্বর এই মহান ফুটবলার বুদাপেস্টে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

dhakapost

তার গোল করার এই অবিশ্বাস্য দক্ষতাকে সম্মান জানাতে ২০০৯ সালে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্তা সংস্থা ফিফা বছরের সেরা ও নান্দনিক গোলের জন্য ‘ফিফা পুসকাস অ্যাওয়ার্ড’ প্রবর্তন করে। পুসকাস কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন ফুটবলের শুদ্ধতম সৌন্দর্যের প্রতীক, যার বাঁ পায়ের জাদু চিরকাল ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে অম্লান থাকবে।

এফএইচএম