টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সেরা বোলারের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কারও কাছে তা পরিমাপের মূল মানদণ্ড নিয়ন্ত্রণ, কারও কাছে আবার উইকেট। টাইগার স্পিনার শেখ মেহেদীর মতে মূল মানদণ্ড ইকোনমি রেট। কিন্তু আধুনিক ক্রিকেটের বাস্তবতা বলছে, শুধু রান কম দেওয়াই সেরা বোলারের বৈশিষ্ট্য না। বরং উইকেটও নিতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে বাংলাদেশ দল যখন খেলোয়াড়দের ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সুযোগ দিয়েছে, তখনই আলোচনায় এসেছে দলীয় পরিকল্পনা বনাম ব্যক্তিগত অবস্থানের প্রশ্ন। চট্টগ্রামে প্রধান কোচ ফিল সিমন্স স্পষ্ট করেছেন, সবাইকে পরীক্ষা করার লক্ষ্যেই রোটেশন নীতি নেওয়া হয়েছে। সেই পরিকল্পনায় মোস্তাফিজকে দেওয়া হয়েছে বিশ্রাম।
এই রোটেশন নীতির কারণেই প্রথম ম্যাচের পর একাদশের বাইরে থাকতে হয় শেখ মেহেদীকে। কিন্তু ১৩১ রানের সেই ম্যাচে মেহেদী ব্যাট হাতে ২৯ ও বল হাতে নিয়েছেন এক উইকেট। তবুও পরবর্তী ম্যাচে একাদশে সুযোগ না পেয়ে ক্ষোভ ঝেড়েছেন। তাতেই প্রশ্ন উঠেছে, দলীয় সিদ্ধান্ত, নাকি ব্যক্তিগত অর্জন—ক্রিকেটারদের কাছে কোনটা বড়?

নিজেকে বাংলাদেশের সেরা বোলারদের একজন হিসেবে দেখেন শেখ মেহেদী। তার দাবি, বাংলাদেশের সেরা দুই ব্যাটসম্যানকে যেমন নিয়মিত সুযোগ দেওয়া হয়, তেমনি সেরা দুই বোলারের ক্ষেত্রেও একই নীতি থাকা উচিত।
টি-টোয়েন্টি সিরিজ শেষে শেখ মেহেদী ব্রডকাস্টকে বলেন, ‘আপনি যদি বাংলাদেশের সেরা দুই টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানের কথা ভাবেন, তাদের তো বাদ দেওয়া হয় না। তাহলে সেরা দুই বোলারের ক্ষেত্রে কেন হবে? যাদের মধ্যে একজন প্রায় আমি নিজেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে বাংলাদেশের সবচেয়ে কম ইকোনমি রেট আমার। এরপরেও আমি দলে নিয়মিত নই। ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে যে নিয়মটা খাটছে, বোলারদের বেলায় ঠিক তার উল্টোটা হচ্ছে।’
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দেশে বোলিং ইউনিটে যতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, ব্যাটিং ইউনিটে তা নেই। বরং বিকল্প ক্রিকেটার না থাকায় ম্যাচের পর ম্যাচ ব্যর্থ হওয়ার পরেও ব্যাটারদের খেলাতে বাধ্য হচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু বোলার দারুন পারফর্ম করায় তাসকিন, শরিফুল, নাসুমদের ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলাচ্ছে বাংলাদেশ।
এদিকে শেখ মেহেদী নিজেকে সেরা বোলার দাবি করলেও তা নিয়ে আছে প্রশ্ন। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চিত্রটা আরও স্পষ্ট হয়। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ইনিংসপ্রতি তার উইকেটসংখ্যা গড়ে একের কাছাকাছি। বোলিং গড় ও স্ট্রাইক রেটেও তিনি পিছিয়ে আছেন দলের অন্য স্পিনারদের তুলনায়।

রিশাদ হোসেন তুলনামূলক কম ম্যাচ খেলেও উইকেট শিকার ও স্ট্রাইক রেটে এগিয়ে, আর নাসুম আহমেদ ধারাবাহিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকারিতার প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন। পেস আক্রমণেও প্রতিযোগিতা কম নয়। শরিফুল ইসলাম পাওয়ারপ্লে থেকে ডেথ ওভার, দুই জায়গাতেই কার্যকর ভূমিকা রাখছেন। তবুও দলীয় কম্বিনেশনের কারণে সব ম্যাচে সুযোগ পান না।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, পারফরম্যান্সের জায়গায় প্রতিযোগিতা যখন তীব্র, তখন ব্যক্তিগত দাবি কতটা যুক্তিসঙ্গত? পাশাপাশি বাকি ক্রিকেটারদের যখন পরখ করতে কোচ আগেভাগেই একাদশ পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন, তবুও পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে শেখ মেহেদীর এমন বক্তব্য বেমানানই বটে।
জাতীয় দলে অলরাউন্ডার হিসেবে খেলেন শেখ মেহেদী। কিন্তু ব্যাট হাতে লোয়ার অর্ডারে তার অবদান বেশ সীমিত। ৭২ ম্যাচ খেলেও রান ও গড় খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি তিনি। অন্যদিকে স্ট্রাইক রেট আধুনিক টি-টোয়েন্টির সঙ্গে মোটেই মানানসই নয়।
এদিকে কোচিং স্টাফ যেখানে দলীয় ভারসাম্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেখানে ব্যক্তিগত অর্জন নিয়ে ক্রিকেটারদের ভাবনা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। বরং আত্মকেন্দ্রিক পারফরম্যান্সের বাইরে গিয়ে দলীয় লক্ষ্য অর্জনের স্পৃহা বাংলাদেশকে বড় দল হিসেবে গড়ে তুলবে।
আইএইচ
