সয়েছেন অপমান, সংশয় ছিল তার সামর্থ্য নিয়ে। সেই গ্লানি ও দ্বিধার দিন পেরিয়ে ফুটবল প্রতিভায় অমরত্ব লাভ করেন আলজেরিয়ান দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান। সংগ্রামটা ছিল ছোটবেলা থেকেই। তাই হয়তো স্নায়ুটা বরাবরই শক্ত রাখতে পেরেছিলেন। সেই প্রমাণ আরও ভালোভাবে মেলে ফুটবল মাঠে। বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ ফ্রান্সকে চার বছরের ব্যবধানে চ্যাম্পিয়নে পরিণত করার মধ্য দিয়ে শুরু, পরে মিশ্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়া ক্যারিয়ারে জিজু অমরত্ব পেয়েছেন।
১৯৯৩ সালের ১৭ নভেম্বর ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে এক কালো দিন। ঘরের মাঠ পার্ক দে প্রিন্সেসে বুলগেরিয়ার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলে হেরে ১৯৯৪ বিশ্বকাপের টিকিট হারায় ফ্রান্স। ভেঙে পড়ে জাতীয় দল, সমর্থকদের আস্থা তলানিতে নামে এবং পদত্যাগ করেন কোচ জেরার হুলিয়ে। পরে সেই ধ্বংসস্তূপের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় সহকারী কোচ আইমে জ্যাকের হাতে। তখন খুব কম মানুষই বিশ্বাস করতেন, মাত্র চার বছরের মধ্যে এই দলই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে।

ফ্রান্সের পুনর্জাগরণের শুরুটা হয় ১৯৯৪ সালের আগস্টে। চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে অভিষেক হয় ২২ বছর বয়সী জিদানের। বদলি হিসেবে নেমে তিনি মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা ফরাসিদের ড্র উপহার দেন। তখন সমর্থকরাও যেন নতুন আশার আলো খুঁজে পায়। তবে জিদানের পথ মোটেও সহজ ছিল না। অভিষেকে ঝলক দেখালেও জাতীয় দলে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি তিনি। ১৯৯৬ ইউরোতেও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হন। পরে জানা যায়, টুর্নামেন্টের আগে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হয়েও খেলেছিলেন তিনি।
কোচ জ্যাক অবশ্য সমালোচনার মুখেও জিদানের ওপর আস্থা হারাননি। বরং তিনি বুঝেছিলেন, ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ গড়তে হলে তাকে কেন্দ্র করেই দল সাজাতে হবে। এই লক্ষ্যেই ফরাসি কোচ সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ধীরে ধীরে দল থেকে সরিয়ে দেন আগের প্রজন্মের বড় তারকা এরিক কান্তোনা, ডেভিড জিনোলা ও জ্যঁ-পিয়ের পাপাঁকে। তার পরিকল্পনা ছিল শক্তিশালী রক্ষণভাগ, কঠোর দলীয় শৃঙ্খলা এবং জিদানকে ঘিরে সৃজনশীল ফুটবল গড়ে তোলা। জিদানের সঙ্গে ইয়োরি ইয়র্কায়েফের জুটি দ্রুতই ফ্রান্সের আক্রমণের মূল শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত তারা একসঙ্গে ৩৪ ম্যাচ খেলে একটিও হারেননি।

তবে ১৯৯৮ বিশ্বকাপেও জিদানের যাত্রা ছিল নাটকীয়। সৌদি আরবের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখে দুই ম্যাচ নিষিদ্ধ হন তিনি। ফ্রান্স যদি প্যারাগুয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে হেরে যেত, তাহলে জিদান হয়তো জাতীয় খলনায়কে পরিণত হতেন। কিন্তু লরঁ ব্লঁ’র ‘গোল্ডেন গোল’ ফ্রান্সকে বাঁচিয়ে দেয় এবং তৈরি করে জিদানের প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ। ১৯৯৮ সালের ১২ জুলাই, স্তাদে দ্য ফ্রান্সে ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালেই জিদান নিজেকে অমর করে তোলেন। কর্নার থেকে জোড়া হেডে গোল করে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন তিনি। পরে ইমানুয়েল পেতির আরেক গোলে ৩-০ ব্যবধানে জিতে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে ফ্রান্স।
আরও পড়ুন
বাবা ছিলেন একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের নাইটওয়াচম্যান। পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ জিদানের জন্ম ফ্রান্সের মার্সেইতে। পাঁচ বছর বয়সেই প্রতিবেশী শিশুদের সঙ্গে খেলা শুরুর পর স্থানীয় ক্লাব ইউএস সেইন্ট হেনরির জুনিয়র দলে তার আনুষ্ঠানিক ফুটবল যাত্রা শুরু হয়। ছোট্ট জিজুর প্রতিভা নজরে আসে এএস কান ক্লাবের রিক্রুটার জিন ভ্যারার্ডের। মাত্র ছয় সপ্তাহ থাকার উদ্দেশে কান শহরে গেলেও সেখানে জিদান কাটিয়ে দেন চার বছর। তার অসাধারণ পারফরম্যান্সে এএস কান প্রথমবারের মতো উয়েফা কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। এরপর ১৯৯২ সালে তিনি যোগ দেন বোর্দো ক্লাবে। সেখানে ১৯৯৪ সালে মৌসুমের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন এবং ১৯৯৫ সালে জেতেন উয়েফা ইন্টারটোটো কাপ।

১৯৯৬ সালে নিউক্যাসল ইউনাইটেড জিদানকে দলে নিতে আগ্রহ দেখালেও পরে প্রস্তাব ফিরিয়ে নেয়। বলা হয়েছিল–প্রিমিয়ার লিগের গতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মতো ফিট নন তিনি। ওই বছরেই জিজু যোগ দেন ইতালির জুভেন্তাসে। সেখানে কোচ মার্সেলো লিপ্পির অধীনে জিদান দ্রুতই দলের মূল ভরসায় পরিণত হন। তার নেতৃত্বে জুভেন্তাস টানা দুই মৌসুম সিরি আ জেতে এবং সেরা বিদেশি খেলোয়াড়ের পুরস্কার অর্জন করেন এই ফরাসি মিডফিল্ডার। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সও জিদানকে বিশ্বসেরা মিডফিল্ডারদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
২০০১ সালে রেকর্ড ট্রান্সফার ফি-তে তিনি যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে। সেখানে তিনি একটি লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ ছয়টি শিরোপা জেতেন। বিশেষ করে ২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে তার বিখ্যাত বাঁ-পায়ের ভলি গোল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে জিদান ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ ও ইউরো জিতেছেন। তার সুযোগ ছিল আলজেরিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিনিধিত্ব করার। কিন্তু তৎকালীন কোচ তাকে ‘যথেষ্ট গতিসম্পন্ন নন’ বলে দলে নিতে অস্বীকৃতি জানান। সেই জিদান নিজের দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অসাধারণ কৌশলী ফুটবল দিয়ে সব সীমাবদ্ধতা পুষিয়ে নিয়েছিলেন। তার ক্যারিয়ার প্রমাণ করে, প্রকৃত চ্যাম্পিয়নরা দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপ দিতে জানেন।

ব্যক্তিগতভাবে জিদান ১৯৯৮ সালে ব্যালন ডি’অর এবং তিনবার (১৯৯৮, ২০০০, ২০০৩) ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন। কোচ হিসেবেও সফল ছিলেন ফরাসি এই বিশ্বকাপজয়ী তারকা। রিয়াল মাদ্রিদের ম্যানেজার হিসেবে আধুনিক ফুটবল ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র কোচ হিসেবে টানা তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (২০১৬, ২০১৭, ২০১৮) ট্রফি রয়েছে তার ঝুলিতে।
এএইচএস

