ডালাস স্টেডিয়ামের বাইরে ম্যাচ শুরুর ঘণ্টা তিনেক আগে থেকেই চলছিল আর্জেন্টিনার উৎসব। আকাশী-সাদা জার্সির ভিড়ে অস্ট্রিয়ার লাল জার্সি ছিল হাতেগোনা। আর আর্জেন্টিনার বেশিরভাগ জার্সির পেছনেই ছিল একটি নাম—লিওনেল মেসি। যেদিকেই চোখ যায়, শুধু ‘নাম্বার টেন’ আর ‘মেসি’।
চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ঢল নেমেছিল। তবে এবার আবহটা একটু ভিন্ন। তখন ছিল অপেক্ষা, উদ্বেগ আর প্রশ্ন—মেসি কি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিততে পারবেন? এখন যেন সেটি পরিণত হয়েছে এক উদ্যাপনে। ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়কে হয়তো শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখার উপলক্ষ্য।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে আবারও সব আলো কেড়ে নিয়েছেন মেসি। এদিন দুই গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার কীর্তি গড়েন তিনি। তবে এই ম্যাচ শুধু মেসির রেকর্ডের জন্যই না, বরং লাতিন আর ইউরোপীয় দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের লড়াইয়ের জন্যও আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছিল। রালফ রাংনিকের অস্ট্রিয়া পরিচিত তাদের তীব্র প্রেসিং ও দ্রুত প্রতিপক্ষকে চেপে ধরতে পারার কৌশলের জন্য। অন্যদিকে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার খেলা আবর্তিত একজন ৩৮ বছর বয়সী ফুটবলারকে ঘিরে, যিনি আগের মতো দৌড়াতে না পারলেও এখনো ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারেন মুহূর্তেই।

আর একদিন বাদে ৩৯ বছরে পা দিতে যাওয়া লিওনেল মেসির পক্ষে আগের মতো পুরো মাঠজুড়ে দৌড়ানো হয়তো সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টার মায়ামির হয়ে তার পরিসংখ্যানও সেটি বলবে। ২০২৫ মৌসুমে এমএলএসে অন্তত ১০ ম্যাচের সমপরিমাণ সময় খেলা ৪৪৩ জন আউটফিল্ডারের মধ্যে ট্যাকলের হিসেবে তিনি ছিলেন নিচের ১৫ শতাংশে, ক্লিয়ারেন্সে নিচের ২ শতাংশে। অবশ্য তার আক্রমণভাগের অবিশ্বাস্য অবদানের কথা বিবেচনা করলে এসব পরিসংখ্যান মোটেও বিস্ময়কর নয়।
অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিকও ম্যাচের আগে মেসির এই পরিবর্তিত ভূমিকাটির কথা উল্লেখ করেছিলেন। যেমনটা বলছিলেন, ‘আগের মতো হয়তো এখন আর সে এত দৌড়ায় না। অনেক সময় মাঠের প্রান্তে বা আড়ালে থাকে। এর মানে এই নয় যে আর্জেন্টিনা একজন কম নিয়ে খেলছে, বরং কাউন্টার-প্রেসিংয়ের সময় একজন কম কাজ করছে। কিন্তু এটিই তাকে সবচেয়ে বিপজ্জনক করে তোলে। কারণ, বল পেলে সে পুরোপুরি স্বাধীন থাকে। তাই তাকে বল নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না, আর ট্রানজিশনের মুহূর্তগুলোও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।’
ম্যাচের শুরুতে অস্ট্রিয়া পরিকল্পনাটা কিছুটা সফলভাবেই বাস্তবায়ন করেছিল। প্রথম ১৫ মিনিটে দুবার দ্রুত আক্রমণে উঠে বল হারানোর পর সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ থেকে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়কে ঘিরে ধরে তারা বল পুনরুদ্ধার করে। রাংনিকের বিখ্যাত কাউন্টার-প্রেসিং তখন আর্জেন্টিনাকে কিছুটা অস্বস্তিতেই ফেলেছিল। এমনকি পেনাল্টি পেয়েও গোল করতে পারেননি মেসি। সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার পর মনে হয়েছিল, হয়তো দিনটি তার নয়। কিন্তু মেসির গল্প সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি।

অস্ট্রিয়ার পরিকল্পনার জন্যও আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল আর্জেন্টিনা। লিওনেল স্কালোনির বর্তমান আর্জেন্টিনা দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, বলের আশপাশে সব সময় একাধিক ছোট পাসের বিকল্প তৈরি রাখা। উইং মিডফিল্ডাররা নামমাত্র প্রান্তে খেললেও বাস্তবে তারা মাঝমাঠেই বেশি ভিড় করেন। ফলে প্রতিপক্ষের চাপের মধ্যে যেখানে অনেক দল আটকে যায়, সেখানে আর্জেন্টিনা দ্রুত ছোট ছোট পাসের ত্রিভুজ তৈরি করে বেরিয়ে আসতে পারে।
প্রথম চাপটা ভেঙে ফেলতে পারলেই আর্জেন্টিনার সামনে খুলে যায় বিশাল ফাঁকা জায়গা। তখন তারা দ্রুত খেলার দিক পরিবর্তন করে বল নিয়ে চলে যায় মাঠের উল্টো প্রান্তে, যেখানে অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড় সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে। ম্যাচের শুরুতে যে পেনাল্টি আদায় করেছিল আর্জেন্টিনা, তার পেছনেও ছিল এমনই একটি আক্রমণ। অস্ট্রিয়ার দুই ডিফেন্ডার যখন লাউতারো মার্তিনেজকে ঘিরে ধরতে এগিয়ে যান, ঠিক তার আগমুহূর্তে মেসি চমৎকারভাবে বল সরিয়ে দেন বা প্রান্তে। দ্রুত দিক পরিবর্তনের সেই আক্রমণেই অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগে তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা, যা শেষ পর্যন্ত পেনাল্টির মতো সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয় আর্জেন্টিনাকে।
পেনাল্টি নিতে এগিয়ে যান মেসি। কিক নেওয়ার আগে একটু থামতে গিয়ে তিনি এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়লেন এবং বলটি বেশ খানিকটা বাইরে মেরে দিলেন। বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল। কিন্তু সেটিও অবশ্য বেশি সময়ের জন্য নয়। খানিক বাদে গোল করে তিনি সেই ঘাটতি পুষিয়েও দেন। এরপর দেখা গেল সেই চিরচেনা দৃশ্য। বক্সের কিনারায় নিজের প্রিয় জায়গাটিতে চলে গেলেন মেসি। সেখানেই পেলেন এমন একটি পাস, যেটি তিনি ক্যারিয়ারে অসংখ্যবার পেয়েছেন—বিশেষ করে বার্সেলোনায় থাকাকালে জর্দি আলবার কাছ থেকে। গোলরক্ষক তখন মাঝখানের দিকে সরে যাচ্ছিলেন। মুহূর্তটি বুঝে নিয়ে বাঁ দিকের পোস্ট ঘেঁষে নিখুঁত শটে বল জালে পাঠান মেসি।
যোগ করা সময়ে পাওয়া দ্বিতীয় গোলটি অবশ্য ছিল বাড়তি প্রাপ্তি। সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টায় অস্ট্রিয়া তখন অনেক খেলোয়াড়কে সামনে তুলে এনেছিল। বারবার লম্বা পাসে বল পাঠাচ্ছিল আর্জেন্টিনার বক্সে। সেই সুযোগেই পাল্টা আক্রমণ থেকে আসে মেসির দ্বিতীয় গোল। ম্যাচ শেষে অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিকও মুগ্ধতা লুকাননি। তার ভাষায়, “আজ সে দেখিয়েছে, সে অন্য এক স্তরের খেলোয়াড়। সে-ই সর্বকালের সেরা।” এমন ম্যাচের পর একটা প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে, আর্জেন্টিনা কি অতিরিক্ত মেসি নির্ভর দল হয়ে পড়ছে কি না।
আর্জেন্টিনা কি অতিরিক্ত মেসি নির্ভর হয়ে পড়ছে?
‘মেসি আর্জেন্টিনার জন্য খেলে না, বরং আর্জেন্টিনাই মেসির জন্য খেলে’—অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর মেসির প্রশংসা করতে গিয়ে এভাবেই বলছিলেন সুইডিশ কিংবদন্তি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ। আর্জেন্টিনাকে দেখে কখনো কখনো আপনার মনে হতে পারে, দলটি যেন অতিরিক্ত মেসিনির্ভর হয়ে পড়ছে। এবারের বিশ্বকাপে দলের করা পাঁচটি গোলই এসেছে মেসির পা থেকে। অন্যরা কেউই এখনো গোলের খাতা খুলতে পারেননি।
তবে সাম্প্রতিক ম্যাচগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আর্জেন্টিনা শুধু মেসির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। তার পেছনে আছে এমন একটি দল, যারা একে অপরের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিতে প্রস্তুত। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও যাদের ক্ষুধা এতটুকুন ফুরিয়ে যায়নি।

অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের কথাই ধরা যাক। স্বাভাবিকভাবে আক্রমণভাগে খেলতে স্বচ্ছন্দ হলেও দলের প্রয়োজনে কখনো নেমে আসেন রক্ষণে। বল কাড়েন, খেলা গড়েন, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করে দেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোলের সূচনাও হয়েছিল তার মাধ্যমে। পরে ম্যাচের শেষ দিকে বদলি হিসেবে নামা লিয়ান্দ্রো পারেদেস বল ছিনিয়ে এনে দ্বিতীয় গোলের পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন।
লিওনেল স্কালোনির দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তাদের মাঠের ‘বোঝাপড়া’। প্রতিপক্ষের চাপ সামলে ছোট ছোট পাসে খেলা গড়া, আবার প্রয়োজন হলে আক্রমণ। কখনো ধীরলয়ে, কখনো বিস্ফোরক। কখনো প্রতিরোধ গড়ে, কখনোবা মুহূর্তেই ম্যাচের গতি বদলে দেয়। হ্যাঁ, এটি ঠিক, কাতার বিশ্বকাপজয়ী দলের সঙ্গে তুলনা করলে এটা স্পষ্ট—অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার মতো তারকা নেই দলে। তবে বর্তমান আর্জেন্টিনাও কম ভারসাম্যপূর্ণ নয়।
স্কালোনি কয়েক দিন আগে এই দলকে বলেছিলেন ‘বন্ধুদের দল’। মাঠে তাদের উদ্যাপন, হাসি কিংবা চোখ বন্ধ করে খুঁজে নেওয়া পাসগুলো দেখলে কথাটা অমূলক মনে হয় না। যেন দীর্ঘদিনের একসঙ্গে বেড়ে ওঠা একদল মানুষ একই স্বপ্নকে বয়ে নিয়ে চলেছেন।
স্কালোনির পাসিং ট্রায়াঙ্গেল
আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আপাত দৃষ্টিতে আর্জেন্টিনাকে মনে হয়েছে মেসির নির্ভর একটি দল। কিন্তু আসলেই কি তাই? দুই ম্যাচে মেসির নির্ভরতার মাঝেই চোখে পড়েছে এক ভিন্ন দৃশ্যও।
এই যে অস্ট্রিয়া ম্যাচের কথাই ধরা যায়। অস্ট্রিয়ান কোচ রালফ রাংনিকের বিশ্বখ্যাত কাউন্টার প্রেসিং রুখতে আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি সাজিয়েছিলেন এক নিঁখুত দাবার চাল। ৩৯ ছুঁইছুঁই মেসিকে ট্যাকটিক্যাল স্বাধীনতা দিতে মাঠের বাকি ১০ জনকে নিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন এক অভেদ্য পাসিং নেটওয়ার্ক।

মাঠের উইঙ্গারদের প্রথাগত প্রান্তে না রেখে স্কালোনি তাদের খেলিয়েছেন কিছুটা ভেতরে এনে। ফলে অস্ট্রিয়া যখনই আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের ওপর চড়াও হতে গেছে, তখনই ম্যাক অ্যালিস্টার, রদ্রিগো ডি পলরা দ্রুত ছোট ছোট পাসের ক্রিকোণ তৈরি করে সেই চাপ ভেঙে বের হয়ে গেছেন।
স্কালোনির এই কৌশলের মূল সৌন্দর্য ছিল- প্রথম প্রেসটা ভেঙে ফেলার পরপরই আর্জেন্টিনা মাঠের প্রান্ত বদলে লং পাসে বল পাঠিয়েছে উল্টো দিকে, যেখানে অস্ট্রিয়ার ফুটবলারদের সংখ্যা ছিল কম। ম্যাচের প্রথম পেনাল্টি এবং মেসির প্রথম গোল- দুটিই এসেছে স্কালোনির এই অতি-স্মার্ট ট্রানজিশন ও ঝটিকা আক্রমণ কৌশলের হাত ধরে। এটি কেবল মেসির একক জাদুতে জেতা ম্যাচ নয়, বরং রাংনিকের হাই-প্রেসিং দর্শনের বিপক্ষে স্কালোনির ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাসের এক অনন্য নিদর্শন।
এফআই

