পুরো নাম মার্কোস ইভানজেলিস্তা ডি মোরাইস, কিন্তু কাফু নামেই কিংবদন্তি ডিফেন্ডার হয়েছেন তিনি। ১৯৭০ সালে তার জন্ম, এর দুই সপ্তাহ পর ব্রাজিল তৃতীয় বিশ্বকাপ ঘরে তোলে। বিশ্বের সবচেয়ে সফল ফুটবল জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বছরে আগমন করা শিশুর মানসপটেও নিশ্চয়ই ফুটবলের ছাপ পড়ার কথা। অবশ্য ব্রাজিলিয়ানদের ধমনীতে এমনিতেই ফুটবলের সহজাত প্রতিভা বয়ে চলে! সেই কাফু পরবর্তীতে বিশ্বসেরা রাইটব্যাকদের একজনে পরিণত হন। একমাত্র ফুটবলার হিসেবে টানা তিন বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছেন তিনি।
সাও পাওলোর দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর একটি জার্দিম ইরেন কাফুর আঁতুড়ঘর। সেখানেই এখন তিনি মানবসেবায় ব্যস্ত। ইরেনের কঠিন রাস্তাঘাট তাকে জীবনে হার না মানার শিক্ষা দিয়েছে। শৈশবে খেলতেন ডানপ্রান্তে, সাবেক ফুটবলার কাফুরিঙ্গার সঙ্গে খেলার ধরন মিলে যাওয়া কাফু ডাকনামটি পেয়েছেন তিনি। চেয়েছিলেন পালমেইরাস বা সান্তোসের মতো ক্লাবের হয়ে খেলতে। কিন্তু সেখানে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ১৮ বছর বয়সে যোগ দেন সাও পাওলো এফসিতে। সেটিও হয়েছিল ক্লাবটির বিপক্ষে স্থানীয় দল ইতাকুয়াকেসেতুবার হয়ে এক প্রীতি ম্যাচে পারফর্ম করার বদৌলতে।
রাইট মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা শুরু করা তরুণ কাফুর সাফল্যের পেছনে বড় অবদান ছিল কিংবদন্তি কোচ টেলে সান্তানার। তবে সাম্বা ফুটবলে আক্রমণাত্মক দর্শন ফিরিয়ে আনার জন্য বিখ্যাত এই কোচই তাকে মিডফিল্ডার থেকে রাইট-ব্যাকে রূপান্তর করেন। যদিও সাও পাওলোর প্রথম পছন্দের রাইট-ব্যাক জে তেওদোরোর চোটও এ সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে। তবে সেটাই ছিল ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী কৌশলগত পরিবর্তন। এর ফলেই দেশটি পায় সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডারকে।

সান্তানার অধীনে কাফুর ডান প্রান্ত দিয়ে দুরন্ত গতিতে উঠে যাওয়ার ক্ষমতা সাও পাওলোকে আক্রমণে বাড়তি শক্তি দেয়। শুরুতে রক্ষণ সামলাতে কিছুটা সমস্যায় পড়লেও দ্রুত মানিয়ে নেন তিনি। ১৯৯০ সালে তিনি চমকপ্রদভাবে ব্রাজিল জাতীয় দলে ডাক পান, যার মাধ্যমে দেশের হয়ে তার ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়। ২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে কাফু বলেন, ‘শুরুতে ফুল-ব্যাক পজিশনে খেলতে ভালো লাগত না। ভিন্নভাবে ক্রস করা শিখতে সময় লাগে। কিন্তু ১৯৯০ সালে যখন পাওলো রবার্তো ফ্যালকাও আমাকে ব্রাজিল দলে ডাকলেন, তখন বুঝলাম সান্তানা ঠিকই ছিলেন। সেলেসাওর হয়ে খেলাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।’
দুই বছর পর নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুল-ব্যাক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন কাফু। ব্রাজিলিয়ান লিগে ফাইনালের প্রথম লেগে সাও পাওলো পালমেইরাসকে ৪-২ গোলে হারায়, চারটি গোলেই অবদান ছিল কাফুর। দুর্বল বাম পায়ে এক দুর্দান্ত ভলিতে গোলের পাশাপাশি দুটি অ্যাসিস্ট করেন এবং আরেকটি পেনাল্টি আদায় করেন। টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জেতে সাও পাওলো। এক সপ্তাহ পর তারা টোকিওতে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনাকে হারিয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপও জিতে নেয়। ২৪ বছরে পা দেওয়ার আগেই কাফুর ঝুলিতে ছিল দুটি কোপা লিবার্তাদোরেস, দুটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ, একাধিক পোলিস্তা শিরোপা এবং প্রায় ৩০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
ডান প্রান্তে বিধ্বংসী ওভারল্যাপিং রান আলাদা পরিচিতি এনে দেয় এই ডিফেন্ডারকে। যদিও নিখুঁত ক্রস তার শক্তিশালী দিক ছিল না, তবে তার গতি ও বহুমুখিতা সাও পাওলোকে আক্রমণে দুর্ধর্ষ করে তোলে। কখনও কখনও তিনি ডান মিডফিল্ডার হিসেবেও খেলতেন। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ বিশ্বকাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রগামী ব্রাজিলের বিমানে জায়গা হয়ে যায় কাফুর। কোচ কার্লোস আলবার্তো পেরেইরার অধীনে গড়া সেই দলে অভিজ্ঞ ও তরুণ তারকাদের দারুণ সমন্বয় ছিল। মাত্র ২৪ বছর বয়সী কাফু তখনও অভিজ্ঞ জর্জিনহোর ছায়াতেই ছিলেন। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি মাত্র তিন ম্যাচ খেলেন, তাও বদলি হিসেবে।

কাফুর ভাগ্য খুলে যায় ইতালির বিপক্ষে ফাইনালের ২০ মিনিটেই জর্জিনহো চোট পেলে। তখন মাঠে নামেন কাফু। ব্রাজিল ক্লিনশিট ধরে রাখে এবং টাইব্রেকারে ইতালিকে হারিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপ জিতে নেয়। সেটিই ছিল তখন পর্যন্ত কাফুর জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা। বিশ্বকাপ জয়ের পর ইউরোপে তার প্রথম গন্তব্য ছিল রিয়াল জারাগোজা। তবে চোট ও ক্লাব কিংবদন্তি আলবার্তো বেলসুয়ের উপস্থিতিতে সেখানে নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। পরে ব্রাজিলের ছোট ক্লাব জুভেন্তুদে ফিরে মনোযোগ দেন ক্যারিয়ার পুনর্গঠনে। সেখান থেকে পালমেইরাসে যোগ দিয়ে জেতেন পোলিস্তা কাপ। ১৯৯৭ সালে কোচ মারিও জাগালোর অধীনে ব্রাজিল কোপা আমেরিকা জেতে। রোনালদো, রোমারিও, লিওনার্দোদের নিয়ে গড়া দলটি পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষদের গুঁড়িয়ে দেয়।
কাফু আবারও ইউরোপে ফেরেন ইতালির এএস রোমার জার্সিতে। যেখানে ডান প্রান্তে তার স্বাধীনভাবে আক্রমণে ওঠা যেন শৈশবের স্বপ্ন পূরণ করে দেয়। এরপর ১৯৯৮ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের জয়সূচক গোলে কাফুর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যদিও পরে সেটি আত্মঘাতী গোল হিসেবে গণ্য হয়েছে। পুরো টুর্নামেন্টে নিয়মিত খেলেছেন তিনি। মাঝে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেমিফাইনালে হলুদ কার্ডের কারণে নিষিদ্ধ ছিলেন। আর ব্রাজিল ফাইনালে উঠে হেরে যায় জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সের কাছে।
২০০১ সালে ফ্রান্সিসকো টট্টি, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও ভিনসেনজো মন্টেলাদের নিয়ে গড়া রোমা যখন সিরি আর শিরোপা জেতে, তাদের উইং-ব্যাকে প্রধান শক্তি হয়ে ওঠেন কাফু। ২০০২ বিশ্বকাপে তিনি ব্রাজিলের অধিনায়কত্ব পান। কোচ লুই ফেলিপে সোলারির অধীনে ব্যাক-থ্রি কৌশলে উইং-ব্যাক হিসেবে দুর্দান্ত খেলেন। আর আক্রমণভাগে রোনালদিনহো, রোনালদো, রিভালদোদের নেতৃত্বে পঞ্চম শিরোপা জেতে সেলেসাওরা। ফাইনালে জার্মানিকে হারানোর পর কাফু ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার কীর্তি গড়েন। ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সময় তার জার্সিতে লেখা ছিল ‘১০০ পার্সেন্ট জার্দিম ইরেন’।

বিশ্বকাপের এক বছর পর কাফু যোগ দেন এসি মিলানে। ২০০৫ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে উঠে নাটকীয়ভাবে হার দেখেন লিভারপুলের কাছে, দুই বছর পর তাদের হারিয়ে প্রতিশোধ এবং শিরোপা উৎসব করে মিলান। ফিলিপো ইনজাঘির জোড়া গোলে মিলান সপ্তম ইউরোপিয়ান শিরোপা জেতে এবং কাফু পূরণ করেন নিজের শেষ স্বপ্নটিও। ২০০৬ বিশ্বকাপেও তিনি ব্রাজিলের অধিনায়ক ছিলেন, তবে আবারও জিদানের ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়।
দীর্ঘদিন ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ (১৪২) খেলা ফুটবলার ছিলেন কাফু। ইতালিতে তিনি জিতেছেন দুটি সিরি আ, দুটি ইতালিয়ান সুপার কাপ, দুটি ইউরোপিয়ান সুপার কাপ এবং একটি ক্লাব বিশ্বকাপ। এ ছাড়া রোমা ও এসি মিলান উভয় ক্লাবেরই হল অব ফেমে জায়গা পেয়েছেন। মাঠের বাইরেও তিনি সমান অনুকরণীয়। জন্মস্থান জার্দিম ইরেনে সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও পরিবারদের সহায়তার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘কাফু ফাউন্ডেশন’। যারা খেলাধুলা ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন জীবন গড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
এএইচএস/

