World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

আসল রূপে ফিরল ব্রাজিল

আসল রূপে ফিরল ব্রাজিল

ম্যাচ শুরুর আগেই বেঞ্চে থাকা নেইমারকে ঘিরে উৎসুক ফটোগ্রাফারদের ভিড়। ভক্ত-সমর্থকরাও তার অপেক্ষায় অধীর ছিলেন। ৭৫ মিনিটে তিনি মাঠে বদলি নামার পর মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে উপস্থিত সমস্ত ব্রাজিলিয়ান ভক্তরা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। কিন্তু ম্যাচের আসল নায়ক ছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। প্রতি ম্যাচেই পারফরম্যান্স দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিচ্ছেন তিনি। তিন ম্যাচেই হয়েছেন ম্যাচসেরা, গোল চারটি। গোল্ডেন বুটের জয়ে শীর্ষে থাকা লিওনেল মেসির চেয়ে এক গোল পেছনে। রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ডের দুই গোলের মাঝেরটি বাতিল না হলে হ্যাটট্রিক হতো এবং নামের পাশে গোলসংখ্যা হতে পারতো পাঁচটি।

দুই বছরেরও বেশি সময় পর ‘হলুদ জার্সি’ গায়ে জড়িয়ে নেইমারের ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামা কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে গেছে। দলের একজন অন্যতম নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন ভিনিসিয়ুস। তিনি স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

প্রকৃতপক্ষে ভিনিসিয়ুসের গোল হয়েছিল তিনটি। কিন্তু তার মধ্যে একটি গোল ‘অন্যায়ভাবে’ বাতিল করে দেওয়া হয়। তবে কোনো কিছুই তার জ্বলে ওঠার দৃঢ় সংকল্পকে নাড়াতে পারেনি। গোলের পাশাপাশি ড্রিবলিং এবং উইং ও মাঝমাঠ থেকে অনবরত আক্রমণভাগে সচল ছিলেন তিনি।

রাফিনিয়ার বদলে রায়ান ডানপ্রান্তে রায়ান নিজেকে চিনিয়েছেন। প্রথম গোলেই ছিল তার অবদান। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার বল ক্লিয়ার করতে গেলে তার পায়ে লেগে ভিনিসিয়ুসের সামনে পড়ে। তারপর যা হওয়ার তাই হলো, ফাঁকা গোলপোস্টে জালে বল জড়ালেন। এই ম্যাচে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে শুরুর একাদশে নামেন ১৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড। তরুণ এই ফুটবলারের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ আনচেলত্তি। তিনি বলেন, ‘রায়ান আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই দিকেই অসাধারণ কাজ করেছে। বয়স কম হলেও তার মধ্যে দারুণ পরিণতিবোধ আছে। সে কঠোর পরিশ্রম করে, গুণও আছে। সত্যি বলতে, তার সামর্থ্যের শেষ কোথায়, সেটা কেউ জানে না।’

তারপর প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে গিমারায়েসের ক্রসে বিরল হেডে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ভিনিসিয়ুস। রোমারিও, জিকো ও গারিঞ্চার পর তিন ম্যাচে পাঁচ গোল করলেন ভিনিসিয়ুস, ‘আমি সংখ্যার হিসাব নিয়ে চিন্তিত নই। দলের জয়ে যতটা সম্ভব সাহায্য করার জন্য আমি আমার কাজে মনোনিবেশ করছি। গোল পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত। আজকে এমনকি একটি হেড থেকেও গোল এসেছে।’ হেড থেকে সাধারণত গোল করতে দেখা যায় না তাকে। তবে কার্লো আনচেলত্তির সঙ্গে চ্যালেঞ্জ জয়ের আনন্দ ৭ নম্বর জার্সিধারীর, ‘আমি কোচকে কথা দিয়েছিলাম যে হেড থেকে গোল করব, তিনি বলেছিলেন এটা একপ্রকার অসম্ভব এবং আমি যদি করতে পারি তবে তিনি আমাকে একটি উপহার দেবেন। আমি এখন সেই উপহারের অপেক্ষায় আছি।’

ভিনিসিয়ুসের হেড গোল নজর কেড়েছে আনচেলত্তির, ‘আজ সে হেড থেকেও গোল করেছে, যা তার ক্ষেত্রে খুব একটা দেখা যায় না। ভিনিসিয়ুসকে নতুন করে আবিষ্কার করার কিছু নেই। আমার কাছে সে বিশ্বের সেরাদের একজন।’

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিল হোঁচট খাওয়ার আশঙ্কা মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই উধাও হয়ে যায়। প্রতিপক্ষ যে ব্রাজিলের জন্য বিপজ্জনক নয়, তা দ্রুতই প্রমাণিত হয়। প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের কৌশল ছিল কাউন্টার-অ্যাটাকের সঠিক সুযোগের জন্য অপেক্ষা করা, কিন্তু সেই সুযোগ আসেইনি। বরং রায়ান, কুনহা ও ভিনির আক্রমণ থামাতে বেশিরভাগ সময় রক্ষণে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে ইউরোপীয় দলটির। তাদের হাইপ্রেসে ঘাটতির কারণে ব্রাজিল খুব সহজেই বল দেওয়া-নেওয়া করার সুযোগ পায়।

একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে আগের ম্যাচের তুলনায় দল অনেক উন্নত ফুটবল খেলেছে। খেলোয়াড়রা দেখিয়েছেন যে তারা আনচেলত্তির কৌশলগত পদ্ধতি দিনকে দিন ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পেরেছেন। আক্রমণভাগে ভিনি ও রায়ান মাঠের দুই প্রান্তে ছড়িয়ে খেলছিলেন, আর কুনহা তাদের পেছনে ফলস নাইন হিসেবে খেলছিলেন। দানিলোর তুলনায় ডগলাসের সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা বেশি ছিল। যেখানে দানিলো আক্রমণ গড়ার ক্ষেত্রে কিছুটা রক্ষণাত্মক ভূমিকায় ছিলেন।

আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের প্রধান অস্ত্রগুলো বেশ ভালো কাজ করেছে। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের ওপর হাই-প্রেসিং ফুটবল খেলে চাপ তৈরি করেছে তারা। খেলার মাত্র ছয় মিনিটের মাথায় রায়ান স্কটিশ রবার্টসনের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে বল কেড়ে নেন। বলটি গিয়ে পড়ে ভিনির পায়ে, যিনি গোলরক্ষক গুনকে ড্রিবল করে কাটিয়ে বল জালে জড়ান।

এই গোলটি ভিনি ও রায়ানের চমৎকার আক্রমণাত্মক জুটির সুফল। অভিষেকের চাপ কাটিয়ে উঠেছেন ভাস্কো দা গামার প্রাক্তন খেলোয়াড় রায়ান। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ থেকেই নিষ্ক্রিয় থাকা আক্রমণভাগের ডান প্রান্তকে বেশ ভালোভাবে সচল করে দিয়েছেন তিনি। পুরো মাঠের ডানদিক জুড়ে তার দাপট ছিল। প্রয়োজনে উইংয়ে গেছেন, আবার কখনো ভেতরের দিকে কেটে ঢুকেছেন এবং পেনাল্টি বক্স নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।

ব্রাজিল দলের প্রথমার্ধের পারফরম্যান্স আকর্ষণীয় হয়নি মাঝমাঠের খেলোয়াড়রা সঠিক ভূমিকা পালন করতে না পারার কারণে। আক্রমণভাগের সাথে সংযোগ বাড়াতে মাঝমাঠের প্রধান খেলোয়াড় গিমারায়েস ও পাকেতা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জটলার কারণে বেশ ভুগছিলেন। এ কারণে ব্রাজিলকে হয় উইং দিয়ে আক্রমণ করতে হচ্ছিল নয়তো লং বলে খেলতে হচ্ছিল। আবার কখনো পাসিং করে সময় কাটাতে হচ্ছিল।

পাকেতা ও গিমারায়েস যখন ছন্দ খুঁজে পেলেন, বিশেষ করে প্রথমার্ধের শেষের দিকে। তখনই আক্রমণভাগ আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। দলের দ্বিতীয় গোলের বিল্ড-আপটি এর উপযুক্ত দৃষ্টান্ত। রায়ানকে খোঁজার জন্য গিমারায়েস ব্যর্থ চেষ্টা করেন। তবে বলটি আবার তার কাছে ফিরে আসে এবং ৪৭ মিনিটে তিনি দূরের পোস্টে থাকা ভিনির উদ্দেশ্যে একটি নিখুঁত ক্রস বাড়ান, যা থেকে মাদ্রিদ তারকা চমৎকার হেডে গোল করেন।

খেলার দ্বিতীয়ার্ধের ১৪ মিনিটে এই ৮ নম্বর আবারো নিজের গুরুত্ব বোঝান। কাসেমিরোর কাছ থেকে একটি দুর্দান্ত পাস পেয়ে তিনি গোলপোস্ট সামনে পেলেও প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জের মুখে সেটি ডানদিকে কুনহার উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে দেন। পেছন থেকে এসে প্রত্যাশিত চমক হিসেবে দলের তৃতীয় গোলটি করেন কুনহা।

তিন গোলে পিছিয়ে পড়ে দ্বিতীয়ার্ধে স্কটল্যান্ড বাধ্য হয়ে আক্রমণাত্মক খেলতে শুরু করে। স্বাভাবিকভাবেই ব্রাজিল রক্ষণভাগে কিছুটা চাপে পড়ে। আর ঠিক তখনই দলের সাথে সাথে নিজেকে সামনে নিয়ে আসেন আলিসন। ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক তার কাছে আসা প্রতিটি আক্রমণ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে সামাল দিয়েছেন। এই অর্ধে পাঁচ পাঁচটি শট ঠেকিয়ে ব্যবধান কমতে দেননি তিনি। ৬৪ মিনিটে ফার্গুসনের ফ্রি কিক ও পরের মিনিটে ম্যাকটমিনের হেড ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রুখে দেন আলিসন।

ম্যাচ যখন হাতের মুঠোয়, তখন কুনহাকে তুলে ৭৬তম মিনিটে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মাঠে নামেন নেইমার। জয় সুনিশ্চিত হওয়ার পর এক মাসেরও বেশি সময় মাঠের বাইরে থাকা সুপারস্টারকে স্বাগত জানাতে গর্জে ওঠে মায়ামির গ্যালারি। ৯৮১ দিন পর ব্রাজিলের জার্সি পরা এই ফরোয়ার্ডের একটি গোলের অপেক্ষায় দর্শকরা অধীর আগ্রহে ছিলেন। ৯০ মিনিটে তার লক্ষ্যে নেওয়া একটি শট ঠেকাতে কষ্ট করতে হয়নি গোলকিপার গুনকে। তার পাস থেকেই ভিনিসিয়ুসের হ্যাটট্রিকের একটি সুযোগ এসেছিল। তিনি গোল করতে না পারলেও আভাস দিলেন, ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে তার জুটি ভবিষ্যতে প্রতিপক্ষকে বড় বিপদে ফেলতে যাচ্ছে।

শুরুর দুই ম্যাচের চাপ, অস্থিরতা আর কৌশলগত ভুল পেছনে ফেলে জেগে উঠেছে ব্রাজিল। নকআউট পর্ব শুরুর আগে ব্রাজিল তাদের নাম আর যশের সুবিচার করেছে। মূল কথা দল এখন ঐক্যবদ্ধ। এই ব্রাজিলকেই দেখতে চেয়েছিলেন আনচেলত্তি, ‘এখন আমরা একটি দল হিসেবে খেলছি, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা নিখুঁত নই, উন্নতির জায়গা এখনও আছে। বলের নিয়ন্ত্রণে থাকলে আরও দ্রুত খেলতে পারি। তবে আমি খুশি, কারণ দল অনেক উন্নতি করেছে। এখন আমরা অনেক বেশি সংগঠিত ও দৃঢ়। নকআউট পর্বে এই দৃঢ়তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

ভিনিসিয়ুস ও কুনহা আক্রমণভাগের উজ্জ্বল তারকা, আর তাদের পেছনে আছে মাঝমাঠে নিজেদের খুঁজে পাওয়া পাকেতা-কাসেমিরোররা, আর মাগালায়েস ও মারকুইনহোসের দুর্দান্ত রক্ষণের ফাঁক গলে আসা বল ঠেকাতে প্রস্তুত আলিসন। নকআউটের আসল পরীক্ষা শুরুর আগে এই ব্রাজিল মুগ্ধ করল ফুটবল সমর্থকদের। এই পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারলে হেক্সা মিশনের স্বপ্ন ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে সেলেসাওরা।

ব্রাজিল দেখিয়ে দিয়েছে, তারা আবার নিজেদের আসল রূপ ফিরে পেয়েছে। আনন্দের সঙ্গে খেলেছে, আক্রমণে গেছে, তারা দেখিয়েছে কেন তাদের বুকে পাঁচ তারকা। হেক্সা মিশন সফলভাবে শেষ করতে এখনো পাঁচ ম্যাচ বাকি এবং অনেক কঠিন ধাপ পার করতে হবে, আর উন্নতির শেষ নেই। শেষ ম্যাচে পাওয়া আত্মবিশ্বাস কাজে লাগিয়ে এবার ট্রফি জয়ের কঠিন মিশন শুরু।

এফএইচএম