World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা : গোলের জন্য জন্ম নেওয়া এক কিংবদন্তি

গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা : গোলের জন্য জন্ম নেওয়া এক কিংবদন্তি

তার পায়ে কোনো অলৌকিক ড্রিবলিং ছিল না, ছিল না প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে নাচিয়ে বোকা বানানোর জাদুকরী স্কিল। কিন্তু পেনাল্টি বক্সের আশেপাশে তার উপস্থিতি মানেই ছিল প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বুকে কাঁপন আর গোলরক্ষকদের জন্য এক জীবন্ত আতঙ্ক। দূরপাল্লার বুলেট গতির শট, নিখুঁত হেড আর গোলপোস্টের জাল ছিঁড়ে ফেলার মতো আদিম হিংস্রতায় গোল করা- এই ছিলেন গ্যাব্রিয়েল ওমর বাতিস্তুতা। ফুটবল বিশ্ব যাকে এক নামে চেনে ‘বাতিগোল’।

নব্বইয়ের দশকে রক্ষণাত্মক ইতালিয়ান ফুটবলের স্বর্ণযুগে (সেরি আ) যখন ডিফেন্ডাররা স্ট্রাইকারদের পা ভেঙে দেওয়ার জন্য ওঁত পেতে থাকত, তখন সান সিরো থেকে অলিম্পিকো- সব মাঠ শাসন করেছেন এই আর্জেন্টাইন মহানায়ক।

dhakapost

১৯৬৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম বাতিস্তুতার। ছোটবেলায় তার ফুটবলার হওয়ার কোনো তীব্র ইচ্ছে ছিল না। বাস্কেটবল খেলতেন আর স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে ডাক্তার হবেন। কিন্তু ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় এবং ম্যারাডোনার উত্থান তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বোকা জুনিয়র্স এবং রিভার প্লেটের মতো আর্জেন্টিনার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবেই খেলেছেন তিনি। তবে তার ভেতরের আসল দানব জেগে ওঠে ১৯৯১ সালে ইতালিয়ান ক্লাব ফিওরেন্টিনায় যোগ দেওয়ার পর।

আধুনিক ফুটবলে যখন খেলোয়াড়েরা টাকার পেছনে ছোটেন, সেখানে বাতিস্তুতা ছিলেন এক বিরল ব্যতিক্রম। ফিওরেন্টিনাকে ভালোবেসে তিনি ক্যারিয়ারের সেরা সময়টা ফ্লোরেন্স শহরে কাটিয়ে দেন। ১৯৯৩ সালে ফিওরেন্টিনা যখন সেরি আ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে (সেরি বি) রেলিগেটেড হয়ে যায়, তখন ইউরোপের বড় বড় ক্লাব বাতিস্তুতাকে চড়া দামে কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু ক্লাবকে বিপদে ফেলে যাননি এই আর্জেন্টাইন। দ্বিতীয় বিভাগেই খেলেন এবং দলকে আবার চ্যাম্পিয়ন করে প্রথম বিভাগে ফিরিয়ে আনেন। ফ্লোরেন্সের মানুষ ভালোবেসে স্টেডিয়ামের বাইরে তার একটি ব্রোঞ্জের মূর্তিও তৈরি করে ফেলে।

dhakapost

পরবর্তীতে ক্যারিয়ারের শেষভাগে ট্রফি জেতার জন্য এএস রোমাতে যোগ দেন বাতিস্তুতা এবং ২০০১ সালে রোমাকে ঐতিহাসিক সেরি আ শিরোপা জেতান।

আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে বাতিস্তুতা ছিলেন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। লিওনেল মেসি সেই রেকর্ড ভাঙার আগে দীর্ঘদিন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার (৫৪ গোল) রেকর্ডটি তার দখলে ছিল। আর্জেন্টিনার হয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৩ সালে টানা দুটি কোপা আমেরিকা জেতেন তিনি।

বিশ্বকাপের মঞ্চে বাতিস্তুতার রয়েছে এক অনন্য ও অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড। ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার কীর্তি একমাত্র বাতিস্তুতারই আছে। ২০০২ বিশ্বকাপে তার বিদায়টা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। গ্রুপ পর্ব থেকে আর্জেন্টিনার বিদায়ের পর ডাগআউটে বাতিস্তুতার সেই কান্না এখনও কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের বুকে দাগ কেটে আছে।

dhakapost

আজকের যুগে নিখুঁত পাসিং বা ফলস নাইন কৌশলের ফুটবলে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার মতো খাঁটি নম্বর নাইন স্ট্রাইকার বিলুপ্তপ্রায়। লম্বা সোনালী চুল বাতাসে উড়িয়ে, গোল করার পর কর্নার ফ্লাগের কাছে গিয়ে মেশিনগান সেলিব্রেশন করা বাতিস্তুতা কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন নব্বইয়ের দশকের ফুটবল রোমান্টিকতার এক জীবন্ত প্রতীক। ফুটবল যতদিন থাকবে, গোলপোস্ট কাঁপানো সেই বুলেট শটগুলোর জন্য বাতিগোল অমর হয়ে থাকবেন।

এমএমএম/