World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

ফিফা বিশ্বকাপ

বিয়েলসার কৌশল নাকি অস্থির ড্রেসিংরুম, ‍উরুগুয়ের ব্যর্থতার দায় কার?

বিয়েলসার কৌশল নাকি অস্থির ড্রেসিংরুম, ‍উরুগুয়ের ব্যর্থতার দায় কার?

২০২২ কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল উরুগুয়ে। এবারও তারা সেই অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি। তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ সৌদি আরব ও কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্র করার পর আজ (শনিবার) শেষ ম্যাচে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরেছে। স্রেফ ২ পয়েন্ট নিয়েই তাই বাড়ির পথ ধরল ১৯৩০ ও ১৯৫০ বিশ্বকাপজয়ী উরুগুয়ে।

‘এইচ’ গ্রুপের শেষ ম্যাচের পর উরুগুয়ের এই ব্যর্থ বিশ্বকাপ অভিযানের দায় নিজের কাঁধে নিলেন কোচ মার্সেলো বিয়েলসা। ৭০ বছর বয়সী কোচ বলেন, ‘এই হতাশার জন্য আমি দায়ী। আমি মনে করি না এই পারফরম্যান্সের ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন আছে। যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন জাতীয় দলের সঙ্গে আমার সময়কে কীভাবে মনে রাখা হবে, তাহলে বলব– এটি এমন এক অধ্যায়, যা কোনো স্থায়ী ছাপ রাখতে পারেনি।’

এমনকি উরুগুয়ের সঙ্গে ৩ বছরের অধ্যায়ে কিছু দিতে না পারারও অসহায় স্বীকারোক্তি এই বিয়েলসার, ‘আমি উরুগুয়ের ফুটবলে কিছুই দিতে পারিনি। কোনো দেশে তিন বছর কাজ করে যে অবদানই রাখার চেষ্টা করি, ফলাফল না এলে সেটি কখনোই শিকড় গাড়তে পারে না।’ স্পেনের বিপক্ষে ৪২ মিনিটে নিজের ভুলে গোল হজম করা গোলরক্ষক মুসলেরাকে তুলে নেওয়ার বিষয়ে উরুগুয়ে কোচ বলেন, ‘মুসলেরা নিজেই হাফটাইমে বের হয়ে যেতে চেয়েছিল। আমি বরং তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করার চেয়ে সেটি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলাম।’

অথচ ৪০ বছর বয়সী মুসলেরা বিয়েলসার অনুরোধেই মার্চে আন্তর্জাতিক অবসর ভেঙে জাতীয় দলে ফিরেছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনিই প্রথম গোলরক্ষক, যিনি এক আসরে তিনটি গোলের পেছনেই সরাসরি দায়ী। ২০১০ বিশ্বকাপে উরুগুয়ের সেমিফাইনালে ওঠার নায়ক মুসলেরার এটি ছিল ১৩৭তম এবং সম্ভবত শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

উরুগুয়ের ব্যর্থতায় দায় কার

বিয়েলসার মডেল কি পুরোনো হয়ে গেছে?

সম্ভবত ৭০ বছর বয়সী বিয়েলসার দীর্ঘ ও বর্ণময় কোচিং ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় কাছে চলে এসেছে। অবশ্য উরুগুয়ের হয়ে খুব বেশি সফলতা পাননি তিনি। দলের অধারাবাহিক পারফরম্যান্স ছিল স্পষ্ট। তবে বিয়েলসার শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। কাতার বিশ্বকাপের পর তিনি এমন একটি দলের দায়িত্ব নেন, যাদের প্রজন্ম পরিবর্তনের আশায় ছিল। আগেও তিনি চিলির মতো এমন একটি দল পেয়েছিলেন, যারা তার দ্রুতগতির আক্রমণাত্মক ফুটবল দর্শনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়।

dhakapost
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে উরুগুয়ে কোচ মার্সেলো বিয়েলসা

দক্ষিণ আমেরিকার বিশ্বকাপ বাছাইয়েও উরুগুয়ের শুরুটা অসাধারণ ছিল। আর্জেন্টিনার মাঠে জয়, ব্রাজিলকে হারানো এবং প্রথম ছয় ম্যাচ শেষে অন্য যেকোনো দলের প্রায় দ্বিগুণ গোল করা। এরপর আসে ২০২৪ কোপা আমেরিকা। উরুগুয়ে শুরুতে প্রচুর গোল করলেও হোঁচট খাওয়ার পর আর আগের ছন্দে ফিরতে পারেনি। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত এবং মার্চে ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ ড্র করলেও উরুগুয়ে খুব কমই মাঝমাঠ পেরোতে পেরেছিল। যা বিয়েলসার দলের ক্ষেত্রে একসময় কল্পনাই করা যেত না।

বিয়েলসার উচ্চ-চাপ (হাই প্রেসিং) ও প্রতিপক্ষকে দমবন্ধ করে রাখা ফুটবল একসময় ছিল বিপ্লবী, কিন্তু এখন সেটি আধুনিক ফুটবলে সাধারণ কৌশলের অংশ হয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে– বিয়েলসার কৌশল কি এখন খুব সহজেই অনুমান করা যায়?

এ ছাড়া বিশ্বকাপের আগে উরুগুয়ে কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেনি। এর বদলে অনুশীলনে নতুন কৌশল প্রয়োগের দিকে মনোযোগ দেয়। যেখানে ভালভার্দেকে ডান দিকে খেলানো এবং দুই স্ট্রাইকার ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটি কাজৈ আসেনি। সৌদি আরবের বিপক্ষে হাফটাইমেই সেই পরিকল্পনা বাদ দিয়ে তিনি আবার নিজের পরিচিত ৪-৩-৩ ফরমেশনে ফিরে যান।

এরপর কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ২-২ ড্র ম্যাচেও উরুগুয়ে সুযোগ তৈরি করেছিল। দুইটি আত্মঘাতী ভুল না হলে তারা আগেই শেষ ৩২ নিশ্চিত করতে পারত।

ফুটবলারদের পারফরম্যান্সে অবনতি

বিষয়টি হয়তো উরুগুয়ে কোচের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দেশটির তারকা খেলোয়াড়রা ক্লাব পর্যায়ে প্রত্যাশামতো ফর্ম ধরে রাখতে পারেননি। আর এই বিশ্বকাপে নিজের সেরা ছন্দে ছিলেন না রিয়াল মাদ্রিদের তারকা মিডফিল্ডার ফেদেরিকো ভালভার্দে। এ ছাড়া রদ্রিগো বেনতানকুর, ম্যানুয়েল উগার্তে, ফাকুন্দো পেলিস্ত্রি ও ডারউইন নুনিয়েজরাও নিজেদের হারিয়ে খুঁজছেন।

dhakapost

ড্রেসিংরুমে অস্থিরতা

শুধু কৌশলগত সমস্যাই হয়তো আসল কারণ নয়। বড় ভূমিকা থাকতে পারে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কোচের সম্পর্ক। ২০২৪ কোপা আমেরিকার জন্য এক মাসের ক্যাম্প ড্রেসিংরুমে চাপ তৈরি করেছিল বলে মনে হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার সময় লুইস সুয়ারেজ সরাসরি বিয়েলসার সমালোচনা করেন। তিনি বলেছিলেন, কোচের মধ্যে উষ্ণতার অভাব, খেলোয়াড়দের সঙ্গে আচরণ এবং দলের ভেতরের উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ নিয়ে তার আপত্তি।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দলের কেউই উরুগুয়ের সর্বোচ্চ এই গোলদাতার বক্তব্যের বিরোধিতা করেননি। স্পেনের বিপক্ষে আজ লাল কার্ড দেখা উইঙ্গার আগুস্তিন কানোবিওর সঙ্গেও বিয়েলসার বিরোধ হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, কোচ তার বসার ধরন নিয়েও সমালোচনা করেছিলেন, যা বড় বিরোধের সূচনা করে।

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বড় হারের পর বিয়েলসা সম্পর্কে অবনতি হওয়ার কথাও স্বীকার করেছিলেন। তিনি নিজেকে বলেছিলেন একজন ‘বিষাক্ত পারফেকশনিস্ট’। এখনকার খেলোয়াড়রা কোচের কাছ থেকে আরও ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সম্পর্ক আশা করেন। বিয়েলসা নিজেও স্বীকার করেছেন, ক্রীড়া বিজ্ঞানের উন্নতি সত্ত্বেও একটি দলকে একসঙ্গে চালাতে প্রস্তুতির চেয়ে উৎসাহ ও মানসিক সংযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আধুনিক ফুটবলের সঙ্গেও অনেক সময় বিয়েলসাকে বেমানান মনে হয়েছে। বিশ্বকাপের হাইড্রেশন বিরতির সমালোচনা করে তিনি বলেছিলেন, এগুলো ‘ফুটবলকে বোঝার সাংস্কৃতিক ধারণায় হস্তক্ষেপ করে’ এবং ‘বাড়তি কিছু যোগ করে না।’ এ ছাড়া বিশ্বকাপের আগমুহূর্তে তিনি টুর্নামেন্ট শেষে বিদায়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন। যা বড় মঞ্চে যাওয়ার আগমুহূর্তে অনেকেই ভালো চোখে দেখেননি। ৩.৪ মিলিয়ন মানুষের দেশ উরুগুয়ে হয়তো বিশ্ব ফুটবলে নতুন স্পিরিট নিয়ে আসবে, তবে আকর্ষণীয় কোচিং অধ্যায়ের বিদায়ঘণ্টা বাজল বিয়েলসার!

এএইচএস