বিজ্ঞাপন

হামজা চৌধুরী : বাংলাদেশের ফুটবলে নবজাগরণের অগ্রদূত

হামজা চৌধুরী : বাংলাদেশের ফুটবলে নবজাগরণের অগ্রদূত

২০ হাজারের অধিক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়াম। ২০২৫ সালের ১০ জুন সেখানকার একটি ম্যাচ ঘিরে দেশজুড়ে তুমুল উন্মাদনা শুরু হয়। কিন্তু ম্যাচের টিকিট যেন সোনার হরিণ। সাধারণ সমর্থকের পাশাপাশি দেশের বড় বড় ক্লাব, সাবেক ফুটবলার, ক্লাব সংগঠক এবং রেফারিরাও হন্য হয়ে ঘুরছিলেন একটি টিকিট পেতে। আর সেই উন্মাদনার কেন্দ্রে ছিলেন একজন, হামজা দেওয়ান চৌধুরী।

বাংলাদেশের জার্সিতে তারও সাড়ে তিন মাস (২৫ মার্চ) আগেই অভিষেক হয়েছিল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা এই সিলেটি বংশোদ্ভুত তারকার। কিন্তু দেশের মাটিতে তখনও হামজার খেলা হয়নি। ফলে লাল-সবুজের ফুটবলে নতুন জাগরণ সৃষ্টি করা এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ম্যাচ নিয়ে যেন আবেগের অন্ত ছিল না। যথারীতি হামজা মাঠে নামলেন, এখনও নামেন; আর মাঠজুড়ে ছন্দময় মন্ত্রে মুগ্ধ করে চলেছেন ভক্তদের।

dhakapost
বাংলাদেশের হয়ে ফুটবল খেলার লক্ষ্যে সিলেটে পা রাখতেই প্রবল উন্মাদনার সাক্ষী হন হামজা চৌধুরী

হ্যালির ধুমকেতু হয়ে আসা হামজা এখন পর্যন্ত ৯টি ম্যাচ খেলেছেন বাংলাদেশের জার্সিতে, অসাধারণ নৈপুণ্যে বুঁদ রেখে করেছেন ৪ গোল ও এক অ্যাসিস্ট। বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে হামজার আশার প্রতীক হয়ে ওঠার শুরুটা ছিল আরও বিস্ময়কর। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) হামজার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। তবে প্রয়োজন ছিল এ দেশের নাগরিকত্ব, সংশ্লিষ্ট ফুটবল সংস্থার অনুমতি এবং ফিফার অনুমোদন। সেসব আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হামজা হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের, আর বাংলাদেশ হামজার!

পরের বছর মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামজার আগমন যেন স্মরণীয় এক দৃশ্যের জন্ম দেয়। একজন ফুটবলারের দেশে ফেরাকে ঘিরে মানুষের এমন আগ্রহ বাংলাদেশের ফুটবলে বিরল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিমানের ট্র্যাকিংয়ে নজর, সবার অপেক্ষাটা ছিল ওই একজনের জন্য। হবিগঞ্জে তার শেকড়, তবে ইংল্যান্ডের শীর্ষ ফুটবলের মঞ্চ পেরিয়ে অবশেষে তিনি পা রেখেছেন বাংলাদেশের ফুটবল আঙিনায়।

২৫ মার্চ শিলংয়ে ভারতের বিপক্ষে এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয় আগেই বাংলাদেশের পোস্টার-বয়ে পরিণত হওয়া হামজার। মাঠে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, মাঠের বাইরেও নিজের উপস্থিতিকে নিয়ে গেছেন ভিন্ন উচ্চতায়। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হলেও হামজাকে দেখা গেছে মাঠের প্রায় প্রতিটি পজিশনে। ইংলিশ ফুটবলে ‘ডেস্ট্রয়ার’ হিসেবে তার সুনাম থাকলেও বাংলাদেশে তিনি একইসঙ্গে ডেস্ট্রয়ার ও ক্রিয়েটরের ভূমিকা পালন করছেন। হামজার বড় শক্তির জায়গা বল ডিস্ট্রিবিউশন। মাঠের পরিকল্পনা ঠিকঠাক কাজে লাগলে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন খেলায় গতি-প্রকৃতি।

অভিষেক ম্যাচেই ঘরের মাঠে ভারতের ফরোয়ার্ডদের কার্যত বোতলবন্দি করে নিজের জাত চেনান তিনি। ওই ম্যাচে ভারতের গোলের ভরসা ছিলেন অভিজ্ঞ সুনিল ছেত্রী। যিনি বছরের পর বছর বাংলাদেশকে ভুগিয়েছেন, তাকেই একাধিকবার গোলবঞ্চিত করেন হামজা। তবু ম্যাচটি না জেতার আক্ষেপ থেকেই যায়। জুনে ঢাকায় ভুটানের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে জামাল ভূঁইয়ার কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে নিখুঁত হেডে গোল করে নিজের গোলের খাতা খোলেন হামজা। ১০ জুন ঢাকায় সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ২-১ গোলে হেরে যাওয়া ম্যাচেও ছিল তার ছাপ। ম্যাচ শেষে সিঙ্গাপুরের কোচ স্বীকার করেন, হামজার কারণেই জয় পেতে তাদের ঘাম ঝরাতে হয়েছে।

হংকংয়ের বিপক্ষে ঘরের মাঠে বাংলাদেশের হয়ে তার চতুর্থ ম্যাচটি শুরু হয় ফ্রি-কিক থেকে দুর্দান্ত গোলে লিড এনে দিয়ে। তবে ম্যাচটি শেষ হয় সাত গোলের নাটকে। শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে ৪-৩ ব্যবধানে হারে বাংলাদেশ। অসাধারণ ফুটবল খেলেও হারের হতাশায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন হামজা। সেই ক্ষত কিছুটা সারিয়ে নেয় বাংলাদেশ হংকংয়ে গিয়ে ১-১ ড্র করে। এরপর প্রায় এক মাস পর নেপালের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ঢাকায় খেলতে নামে বাংলাদেশ। সে ম্যাচে হামজার জোড়া গোল একটি দর্শনীয় বাইসাইকেল কিকে, অন্যটি ঠান্ডা মাথার পানেনকা পেনাল্টিতে। 

dhakapost

শেষদিকে হালকা চোট পেয়ে মাঠ ছাড়ার পরই বাংলাদেশের রক্ষণে ফাঁক তৈরি হয়। অতিরিক্ত সময়ে গোল হজম করে নিশ্চিত জয় হাতছাড়া করে বাংলাদেশ। তবে পাঁচদিন পরই (১৮ নভেম্বর) ভারতকে ২২ বছর পর হারিয়ে (১-০) এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে জামাল ভূঁইয়ার দল প্রথম জয়ের স্বাদ পায়। সেই ম্যাচে জয় দিয়ে হামজা ভবিষ্যতের জন্য আশার রসদও জোগান। এরপর আর তিন ম্যাচ খেলে ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে সঙ্গী হয় হতাশার হার। তবে সর্বশেষ ৬ জুন প্রীতি ম্যাচে প্রথম ইউরোপীয় দল হিসেবে সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে নতুন কোচ থমাস ডুলির বাংলাদেশ।

২৮ বছর বয়সী এই ফুটবলারের ক্যারিয়ারের গতিপথ অবশ্য ভিন্ন হতে পারত। ১৯৯৭ সালের ১ অক্টোবর হামজার জন্ম ইংল্যান্ডের লেস্টারে। মা রাফিয়া চৌধুরী বাংলাদেশি, জন্মদাতা বাবা গ্রেনাডিয়ান হলেও তিনি  সৎ বাবা মোরশেদ দেওয়ান চৌধুরীর স্নেহে বেড়ে উঠেছেন। হবিগঞ্জের বাহুবলে তাদের বাড়ি হওয়ায় জন্মের পরপর তো এসেছেন, এরপর পা পড়েছে অনেকবার। হামজার সিলেটি ভাষাও প্রায় নির্ভুল। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলে আগ্রহী হামজা লেস্টার সিটিতে যোগ দেন ৭-৮ বছর বয়সে। সেখানেই পান পেশাদার ফুটবলার হওয়ার হাতেখড়ি।

তবে লেস্টারের একাডেমি ছেড়ে পেশাদার ফুটবলে হামজার অভিষেক হয় বার্টন অ্যালবিয়নের হয়ে। এক মৌসুম পর ২০১৭ সালে ফেরেন লেস্টারে। ওই বছরই লিগ কাপে লিভারপুলের বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে মূল দলে অভিষেক হয় তার। নভেম্বরে প্রিমিয়ার লিগে অভিষেক হয় টটেনহামের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। লেস্টার সিটির হয়ে খেলেছেন প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, লিগ কাপসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়। ২০২১ সালে হামজা ক্লাবটির হয়ে এফএ কাপ জয়ের স্বাদও পেয়েছেন। মাঝে শেফিল্ড ইউনাইটেডে কাটিয়ে আবারও হামজার ঠিকানা সেই লেস্টার।

ফুটবল মাঠের হামজাকে কতটা চেনেন আপনি?

হামজা একসময় ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই পথেই তিনি ইংল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেলেছেন এবং উয়েফা ইউরোপিয়ান অনূর্ধ্ব-২১ চ্যাম্পিয়নশিপেও অংশ নিয়েছেন। তবে ইংল্যান্ড জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সময়ের সঙ্গে নিজের শেকড়েই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরুর বিষয়টি গুরুত্ব পেতে থাকে। বাংলাদেশের হয়ে খেলা জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন হামজা, ‘ভাগ্যবশত আমার সামনে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার আরেকটি দারুণ সুযোগ আসে। যখন সেই সুযোগটি পেয়েছি, মনে হয় এটি আমার জীবনের অন্যতম সেরা একটি সিদ্ধান্ত ছিল।’

মাঠের মতো মাঠের বাইরেও হামজা নিজেকে আলাদা করে চিনিয়েছেন। দারুণ হাসিখুশি এই ফুটবলার শুরুর দিন থেকেই মিশে গেছেন পুরো দলের সঙ্গে। তার মতো মানের একজন ফুটবলারের সঙ্গে খেলা নিয়ে যে সংশয় ছিল, তা দ্রুতই কেটে গেছে সতীর্থদের। শেখ মোরসালিন, রাকিব হোসেনরা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, হামজার উপস্থিতিতে তারা আরও মনোযোগী হয়েছেন। একইভাবে হামজার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিদেশ-বিভূঁই থেকে এসে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে তুলেছেন শামিত সোম, ফাহমিদুল ইসলাম, জায়ান আহমেদ ও কিউবা মিচেলের তরুণ প্রতিভারা।

dhakapost

ধীরে ধীরে হামজা বাংলাদেশ ফুটবলের প্রধান বিজ্ঞাপনী আইকনে পরিণত হয়েছেন। নিজে যেমন বহুজাতি ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তেমনি নবজোয়ারের অংশ হতে বাংলাদেশ ফুটবলেও দীর্ঘমেয়াদী পৃষ্ঠপোষকতার আগ্রহ দেখাচ্ছে নামী-দামী সংস্থাগুলো। হামজার জন্য এমন উন্মাদনা কিংবা মাঠের পারফরম্যান্সে হয়তো তিনি একাই বাংলাদেশের ফুটবল বদলে দেবেন না, কিন্তু তার আগমন প্রমাণ করে– বাংলাদেশের ফুটবলের সঙ্গে বিশ্বমঞ্চের সংযোগ তৈরি করা সম্ভব। লেস্টারের মাঠ থেকে লাল-সবুজ জার্সি, হামজার এই যাত্রা যেন এখন বাংলাদেশ ফুটবলের নতুন গল্পের শুরু।

এএইচএস