ইতিহাস গড়েছে কেপ ভার্দে। সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তারা। আটলান্টিক মহাসাগরের ১০টি দ্বীপের প্রতিনিধি নিয়ে গড়া এই দলের জন্য পুরস্কার হতে যাচ্ছে শেষ ৩২ এ আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়া।
সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র হওয়ার পরপর কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা জড়ো হয়ে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখেছিল। স্পেন ও উরুগুয়ের ম্যাচের ফল নিয়ে উত্তেজিত ছিল তারা। স্পেন উরুগুয়েকে হারাতেই এইচ গ্রুপের রানার্সআপের জায়গাটি নিশ্চিত করে কেপ ভার্দে।
হিউস্টনের গ্যালারির পরিবেশ জানান বিবিসি রেডিও ৫ লাইভ কমেন্টেটর রব ল, ‘পুরো গ্যালারিজুড়ে গর্ব ও আনন্দের অশ্রু। খুব সুন্দর একটা মুহূর্ত ছিল যখন খেলোয়াড়রা জড়ো হয়ে তাদের ফোনে শেষ বাঁশি বাজার জন্য অপেক্ষা করছিল। যখনই বাজল, মাঠে ও গ্যালারিতে কান্নার রোল পড়ে গেল। কী সুন্দর মুহূর্ত। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সেরা মুহূর্ত।’
স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ে নায়ক ছিলেন ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ভোজিনহা। উরুগুয়ের সঙ্গেও ২-২ গোলে ড্র। স্পেনের সাবেক বিশ্বকাপ জয়ী হুয়ান মাতা বলেছেন, ‘তারা যা করছে, সেটা অসাধারণ। এটা শুধু স্পেনের বিপক্ষে এক ম্যাচেই ছিল না, তিন ম্যাচেই তারা উচ্চস্তরের খেলা খেলেছে।’
ক্যামেরুনকে ছাপিয়ে মাত্র সোয়া পাঁচ লাখ মানুষের দেশটি কীভাবে পুরো বিশ্বকে চমকে দিলো, তা রহস্যজনকই বটে। আসলেই কি তাই?

প্রবাসী নীতি ও বড় মঞ্চে খেলার পরিকল্পনা
ব্লু শার্কদের এই সাফল্যের প্রধান কারণ, কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশনের একটি সিদ্ধান্ত—দেশটির প্রবাসী ফুটবলারদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা। এক সময়ের ঔপনিবেশিক শক্তি পর্তুগালের সঙ্গে এর দৃঢ় যোগসূত্র রয়েছে। গত শতাব্দিতে লাগাতার ভয়াবহ খরার কারণে দ্বীপগুলো থেকে ব্যাপক অভিবাসন ঘটেছিল। অন্যদিকে সমুদ্রযাত্রার ঐতিহ্য ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে জড়িত থাকার কারণে রটারডামে কেপ ভার্দের বংশোদ্ভূত একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে।
২৬ জনের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ১৪ জনই দেশের বাইরে জন্ম নেওয়া। তাদের মধ্যে ছয়জন ডাচ বন্দর শহরের বাসিন্দা। এর মধ্যে ফরোয়ার্ড ডাইল লিভ্রামেন্তো গত মৌসুমে পর্তুগালের প্রিমেইরা লিগের দল কাসা পিয়ার সঙ্গে খেলেছেন। গত বছর সেপ্টেম্বরে ক্যামেরুনের বিপক্ষে বাছাইপর্ব জয়ে একমাত্র গোল করেছিলেন।
কেপ ভার্দের এক সাংসদ জসিনা ফ্রেইতাস ফোর্তেস বলেছেন, ‘উদ্যম, প্রতিশ্রুতি ও একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে এফসিএফ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। আমরা যে ফলাফল দেখছি, তা মূলত বছরের পর বছর ধরে ধারাবাহিক পরিশ্রম, দৃঢ় বিশ্বাস ও এই প্রকল্পে মনপ্রাণ বিলিয়ে দেওয়া মানুষদের অবদানের ফল।’
২০১৯ সালে ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং ওয়েবসাইড লিঙ্কডইন-এর মাধ্যমে ডাবলিনে জন্ম নেওয়া সেন্টার ব্যাক রবার্তো লোপেসকে দলে অন্তর্ভুক্তি বেশ চর্চিত গল্প। পর্তুগালের অনূর্ধ্ব-২১ দলে খেলার পর সাবেক ম্যানইউ উইঙ্গার বেবে তাদের ২০২৩ আফ্রিকা নেশনস কাপের অংশ ছিলেন।
লোপেস বলেছেন, ‘এই দলের মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ আত্মবিশ্বাস আছে যে আমরা বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো যথেষ্ট ভালো। এটা এমন কিছু নয় যা শূন্য থেকে তৈরি হয়েছে। আমি যুক্ত হওয়ার পর থেকে এবং তার আগেও, কেপ ভার্দেকে বিশ্বের বড় ফুটবল দেশগুলোর কাতারে নিয়ে আসার একটি চলমান পরিকল্পনা ছিল।’

শক্তি, ঐক্য ও সহনশীলতা—কোচিংয়ের দূরদর্শিতা
কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের কৃতিত্ব অবশ্যই দিতে হবে কোচ বুবিস্তাকে। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে দলটির দায়িত্বে আছেন এই সাবেক আন্তর্জাতিক সেন্টার ব্যাক। দীর্ঘদিন ধরে কোচিং সেটআপে থেকে ৫৬ বছর বয়সী কোচ গোছালো রক্ষণভাগ, কৌশলগত মিডফিল্ডার ও প্রতিভাবান ফরোয়ার্ডদের নিয়ে সুসংহত ও সুশৃঙ্খল দল গড়ার সুযোগ পেয়েছেন। যারা ঘানাকে চমকে দিয়েছিল এবং মিসরের সঙ্গে ড্র করে ২০২৩ আফকনের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল, যে টুর্নামেন্টে তাদের অভিষেক হয়েছিল মাত্র ১০ বছর আগে।
স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পেছনে পাঁচটি সেভ করা গোলকিপার ভোজিনহাকে কৃতিত্ব দেওয়া যায়। কিন্তু তাদের সুশৃঙ্খল পারফরম্যান্সকেও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে মাত্র একটি ফাউল করেছিল তারা, ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপ ম্যাচে কোনো দলের যা সবচেয়ে কম।
ডিফেন্ডার সিডনি লোপেস কাবরাল বলেছেন, ‘আমরা সবসময় একটি দল হিসেবে অনুশীলন করি এবং খেলি, সুতরাং ওই ম্যাচে আমরা যা করেছিলাম, তা কিন্তু আমাদের জন্য প্রথম নয়। আমাদের জন্য এটা ছিল আমাদের খেলা। এভাবেই আমরা খেলি, আমরা এমনই। একটি দল ও ডিফেন্ডার হিসেবে এটাই আমাদের ব্যক্তিত্ব।’
উরুগুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে কেপ ভার্দেকে বেশ আক্রমণাত্মক খেলতে দেখা গেছে। দ্বিতীয়ার্ধে সমতা ফিরিয়ে তারা তাদের ইস্পাতসম কঠিন মানসিকতা দেখিয়েছে। বুবিস্তা বলেছেন, ‘ফলাফলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি দল হিসেবে আমাদের পরিচয়, আমাদের শক্তি, আমাদের ঐক্য এবং আমাদের সহনশীলতা প্রদর্শন করতে পারা।’
কেপ ভার্দেকে বিশ্বকাপে তুলেই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন বুবিস্তা। কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল তাকে ২০২৫ সালে মহাদেশের বর্ষসেরা কোচ নির্বাচিত করেছিল। সবসময় তার বিশ্বাস, তার দল বিশ্বের বড় বড় দলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো সামর্থ্য রাখে। ২০২১ সালের আফকনে শেষ ষোলোতে যাওয়ার আগে বুবিস্তা বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশটা কত ছোট, সেই বিবেচনায় আমরা সত্যিই ভালো করেছি। আমি মনে করি ভবিষ্যতে আমরা বিশ্বকাপে থাকব।’
সেই সাহসী ভবিষ্যদ্বাণী ফলে গেছে ঠিকঠাক। শুধু তাই নয়, চমক দেখিয়ে তারা নকআউটে। বুবিস্তা আশা করেন, কেপ ভার্দের এই অর্জন বিশ্বের আন্ডারডগদের অনুপ্রাণিত করবে, ‘আমি বিশ্বাস করি ফুটবল সবার, কিংবা সবার জন্য।’

কী পুরস্কার? আর্জেন্টিনার সঙ্গে দেখা
কেপ ভার্দে পুরস্কার পেতে চলেছে। শেষ ৩২ এ তারা মুখোমুখি হবে লিওনেল মেসির দল ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। সৌদি আরবের সঙ্গে ড্রয়ের পর দেশের পতাকা জড়িয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে বুবিস্তা বলেন, ‘আমাদের কাছে, কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। একেবারে শুরু থেকে, আমরা বলেছিলাম যে আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আমাদের দেশকে বাকি বিশ্বকে চেনানো। এরকম একটা সময়ে আর্জেন্টিনা ও মেসির বিপক্ষে খেলতে পারা সত্যিই আমাদের দেশের জন্য চমৎকার ব্যাপার, ম্যাচটা কেমন তা বিবেচ্য নয়।’
মিডফিল্ডার ডেরয় ডুয়ার্তে। সৌদি আরবের বিপক্ষে খেলা শেষে ম্যাচসেরা হয়েছেন তিনি। তার সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছে, ‘সত্যি বলছি, কেমন যেন পাগলাটে লাগছে। আমার মনে হচ্ছে আমি স্বপ্নের মধ্যে আছি। আগে উদযাপন করব। আমরা অনেক খুশি। আশা করি সব কেপ ভার্দিয়ানরাও খুশি। কাল থেকে আমরা পরের ম্যাচের দিকে মন দিবো। খেলাটা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে, তাই না? একটি কঠিন ম্যাচ, কিন্তু বিশ্বাস তো রাখা যায়। যে কোনো কিছু সম্ভব।’
বিশ্বকাপে রেকর্ড ৪৮ দলের অংশগ্রহণ বিফলে যায়নি মনে করেন সাবেক ইংল্যান্ড ও ম্যানইউর ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিলে, ‘আমি মনে করি যারা বলেছিল বিশ্বকাপ বড় করার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না, তারা হয়তো এই কেপ ভার্দে ভক্তদের দেখার পর নতুন করে ভাবছে, কারণ তারা সত্যিই বিশেষ। ৫ লাখ মানুষের একটি দেশ নকআউট পর্বে। অথচ অন্যতম বড় দেশ উরুগুয়ে বিদায় নিলো এবং অন্যতম একটি ছোট দেশ উতরে গেল। তাদের জন্য কী দারুণ মুহূর্ত।’
এফএইচএম

