World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

বেঞ্চের গরম দেখাল আর্জেন্টিনা

বেঞ্চের গরম দেখাল আর্জেন্টিনা

শুরুর একাদশে লিওনেল মেসি নেই, ছিলেন না দলের নিয়মিত ৯ ফুটবলার। তবুও আর্জেন্টিনার খেলার ছন্দে তেমন পরিবর্তন দেখা গেল না। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে জর্ডানকে ৩–১ গোলে হারিয়ে যেন বেঞ্চ শক্তির প্রদর্শনী করলেন ‘মাস্টারমাইন্ড’ লিওনেল স্কালোনি। 

টানা তিন জয়ে শতভাগ সাফল্য নিয়ে গ্রুপ ‘জে’র শীর্ষে থেকে নকআউটে উঠেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। জর্ডানের বিপক্ষে জয় শুধু তিন পয়েন্টের নয়, স্কালোনির বেঞ্চ শক্তির সামর্থ্যেরও বড় প্রমাণ। নিয়মিত একাদশকে বলতে গেলে খোলনলচে পাল্টে ফেললেন এদিন। মূল একাদশকে বসিয়ে রেখেও আর্জেন্টিনার খেলার ধরনে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং সুযোগ পাওয়া ফুটবলাররা দেখিয়েছেন, প্রয়োজনে তারাও দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে প্রস্তুত।

টানা দুই জয়ে গ্রুপ শীর্ষস্থান ও নকআউট নিশ্চিত হওয়ায় স্কালোনি এদিন প্রথম একাদশে রেখেছিলেন কেবল গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ও স্ট্রাইকার লাউতারো মার্টিনেজকে। তবুও আর্জেন্টিনা ছিল নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দেই। স্কালোনিও ট্যাকটিক্সে তেমন বদল আনেননি। মাঝমাঠে ছোট ছোট পাস, বলের দখল ধরে রেখে আক্রমণ গড়া এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা—যেন চেনা সেই আর্জেন্টিনারই দেখা মিলল মাঠে। 

এই ম্যাচে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন তরুণ মিডফিল্ডার নিকো পাজ। ইতালির কোমোতে খেলা এই ফুটবলার একের পর এক পাস ও বুদ্ধিদীপ্ত টাচে আর্জেন্টিনার আক্রমণকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। মাঝমাঠে লিয়ান্দ্রো পারেদেসও কেবল রক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বারবার উঠে এসে আক্রমণেও ধার বাড়িয়েছেন।
ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন জিওভান্নি লো সেলসো। পরে লাউতারো পেনাল্টি থেকে ব্যবধান বাড়ান। জর্ডানের মুসা আল-তামারি একটি গোল শোধ করলেও আর্জেন্টিনা কখনোই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করেনি। 

কৌশলগত দিক থেকে এই আর্জেন্টিনা বহুবার প্রমাণ করেছে, তারা শিরোপা জেতার মতো পরিপূর্ণ একটি দল। ২০২২ বিশ্বকাপের পাশাপাশি টানা দুটি কোপা আমেরিকাও জিতেছে তারা। তবে এই দলের শক্তি শুধু লিওনেল স্কালোনির কৌশল বা প্রতিপক্ষকে নিয়ে করা ভিডিও বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি দেশের জন্য সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা।

অনেকেই বলেন, এই দলটি মেসির জন্য খেলে। রদ্রিগো ডি পলের মতো ফুটবলাররা প্রয়োজনে মেসিকে রক্ষা করতে সবকিছু করতে প্রস্তুত। মেসিকে সঙ্গে নিয়ে জয়ের আনন্দটাও যেন অন্যরকম। কিন্তু আর্জেন্টিনার গল্পটা কেবল একজন তারকাকে ঘিরেই নয়। এটি সেই সমর্থকদেরও গল্প, যারা কানসাস সিটি, ডালাস, মায়ামি কিংবা বুয়েন্স এইরেস, রোজারিওর গ্যালারিতে আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে চড়িয়ে একই আবেগে দলের জন্য গলা ফাটায়।

এই দর্শনই যেন বারবার ফুটে উঠেছে স্কালোনির কথাতেও। জর্ডান ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনেও আর্জেন্টাইন কোচ যেমনটা বলেছিলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মানুষ যেন এই দলটার সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পায়। তারা যেন অনুভব করে, এই দল তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করছে। এর বেশি আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। সেটাই যথেষ্ট।’

আর্জেন্টিনার ঘরোয়া ক্লাবগুলো ভালো নেই। চরম বিভাজনে পিষ্ঠ প্রায়। তবে জাতীয় দলের খেলা আসলেই যেন কী হয়। ম্যাজিকের মতো কাজ করে। বোকা জুনিয়র্স, রিভার প্লেট, রেসিং কিংবা সান লোরেঞ্জো—দলের জার্সিতে সবাই এক। এই ঐক্যই বর্তমান আর্জেন্টিনা দলের সবচেয়ে বড় শক্তি।

নকআউট আগেই নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় মেসির বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ ছিল আজকের ম্যাচে। আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে ইতিহাস গড়ে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পর তার না খেললেও তেমন কিছু আসতো যেত না। কিন্তু বদলি হিসেবে নেমে আবারও নিজের ছাপ রেখেছেন তিনি। দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিক থেকে গোল করে বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে নিজের গোলসংখ্যা ১৯-এ নিয়ে গেছেন এবং টুর্নামেন্টে ছয় গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার অবস্থানও ধরে রেখেছেন। 

খুব বেশি আত্মতুষ্টিতে ভোগারও খুব বেশি কিছু নেই অবশ্য। আর্জেন্টিনার প্রকৃত পরীক্ষা এখনো বাকি। শেষ বত্রিশে তাদের প্রতিপক্ষ চলতি বিশ্বকাপের চমক কেপ ভার্দে। তবে শক্তিশালী স্কোয়াড আর দলগত ফুটবলই আর্জেন্টিনাকে যে আরেকটা বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার করে তুলছে, সেটা মানবেন ঘোর সমালোচকও। 

এফআই