বিজ্ঞাপন

বিশ্বকাপে জয়ের রেকর্ড গড়েও কোথায় পিছিয়ে পড়ল বাংলাদেশ

বিশ্বকাপে জয়ের রেকর্ড গড়েও কোথায় পিছিয়ে পড়ল বাংলাদেশ

আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর্দা নামতে আর বাকি মাত্র একটি ম্যাচ। আগামী ৫ জুলাই ফাইনালে মুখোমুখি হবে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড। এবারের আসরে ১২ দলের একটি ছিল বাংলাদেশও। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হলেও নিগার সুলতানা জ্যোতির দল গড়েছে নতুন এক রেকর্ড। প্রথমবারের মতো নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের এক আসরে দুটি ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। তবে ইতিহাস গড়ার পরও সেমিফাইনালের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে। প্রশ্ন হলো, রেকর্ড গড়েও ঠিক কোথায় পিছিয়ে পড়ল টাইগ্রেসরা?

বিশ্বকাপে টাইগ্রেসদের পারফরম্যান্স একেবারেই ফেলে দেওয়ার মতো ছিল না। পরিসংখ্যানের বিচারে, বাংলাদেশ নারী দলের সেরা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও বলা যায় এবারের আসরকে। নেদারল্যান্ডস ও পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় পেয়েছে টাইগ্রেসরা। ডাচদের বিপক্ষে জয়টা অবশ্য প্রত্যাশিত ছিল। তবে শক্তিমত্তার বিচারে পাকিস্তান ম্যাচ কিছুটা কঠিন হবে, সেটা দেশ ছাড়ার আগেও বলেছিলেন অধিনায়ক। তবে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে পাকিস্তানকে উড়িয়ে দিয়েছে বাঘিনীরা।

নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগের কোনো আসরেই একটির বেশি ম্যাচ জিততে পারেনি বাংলাদেশ। এবার সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে প্রথমবারের মতো এক আসরে দুটি জয় তুলে নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে টাইগ্রেসরা। উদ্বোধনী ম্যাচে ওপেনার জুয়াইরিয়া ফেরদৌস জয়িতা দুর্দান্ত সূচনা এনে দিলেও পরের ম্যাচগুলোতে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি। টপ অর্ডারের এই ছন্দপতনের প্রভাব পড়েছে পুরো দলের ব্যাটিংয়েও।

বাংলাদেশের নাজুক অবস্থা ছিল অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে, সেদিন একদমই লড়তে পারেনি টাইগ্রেসরা। ২০ ওভার ব্যাট করে ৮ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তুলেছিল মাত্র ৭৭ রান। জবাব দিতে নেমে অর্ধেকের বেশি বল হাতে রেখেই ৯ উইকেটে জিতে যায় অজিরা। তবে অস্ট্রেলিয়া ছাড়া বাকি প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জ্যোতিরা দারুণ পারফর্ম করেছে।

নেদারল্যান্ডসকে উড়িয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ মিশন শুরু

অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের শোক কাটিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। স্বল্প সংগ্রহের ম্যাচে ফাতিমা সানাদের উড়িয়ে দিয়েছে জ্যোতিরা। ম্যাচে আগে ব্যাট করতে নেমে ১২৩ রান তোলা বাংলাদেশ স্বল্প পুঁজি নেই অবিশ্বাস্য লড়াই করেছে। ব্যাটিংয়ে পাকিস্তান দারুণ শুরু পেলেও মারুফা-নাহিদাদের কার্যকরী বোলিংয়ের সুবাদে পাকিস্তানকে ১০০ রানেই আটকে দেয় বাংলাদেশ। তাতে ২৩ রানের জয় নিয়ে বিশ্বকাপে এক আসরে সর্বোচ্চ জয়ের ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ।

পরের দুই ম্যাচে শক্ত প্রতিপক্ষ ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা হলেও হাল ছাড়েনি বাংলাদেশ। ভারত ম্যাচে বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে ব্যাটিংয়ে। ক্যাচ মিস সুযোগের পরেও ১৩৬ রানের বেশি করতে পারেনি বাংলাদেশ। জবাবে ভালো শুরু পাওয়া ভারতীয় ব্যাটারদের রানের লাগাম টেনে ধরেন টাইগ্রেস বোলাররা। তবুও শেষ পর্যন্ত ৫ উইকেটের পরাজয় বরণ করে বাংলাদেশ।

দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচেও চলে লড়াই, কেবল জয়টা আসেনি। একদম শেষ ওভারে গিয়ে ৪ উইকেটের জয় তুলে নেয় প্রোটিয়ারা নারীরা।

ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি। পাঁচ ম্যাচে করেছেন ১২৭ রান। যদিও স্ট্রাইকরেট ছিল ১০০ এর চেয়েও কম, যা আধুনিক ক্রিকেটে বেশ বেমানান। ১১৫ ছাড়ানো স্ট্রাইকরেটে জুয়াইরিয়া ফেরদৌস পাঁচ ম্যাচে করেছেন ৯৮ রান। এছাড়া ফিনিশিং রোলে পাঁচ ম্যাচে ৭৪ রান করেছেন স্বর্ণা আক্তার, স্ট্রাইকরেট প্রায় ১৩০। 

নারী ক্রিকেটের উন্নতিতে ৩ উদ্যোগ

বল হাতে সবচেয়ে বেশি উইকেট তুলেছেন নাহিদা আক্তার। ৪ ম্যাচে ৬ উইকেট নিয়েছেন এই স্পিনার। এছাড়া রিতু মনি পাঁচ ম্যাচে নিয়েছেন ৫ উইকেট। ৬.৯৮ ইকোনমিতে পেসার মারুফাও পাঁচ ম্যাচে ৫ উইকেট শিকার করেছেন।

জ্যোতিদের পারফরম্যান্স নিয়ে বিসিবির নারী বিভাগের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবু ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের মেয়েরা ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ভালোই লড়াই করেছে। ভারতের সঙ্গে কিন্তু সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তবে শুরুর ক্যাচ আর শেষের রানআউটে পিছিয়ে যায় দল। সবশেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে আসলে জিততে জিততে হারলাম। সবমিলিয়ে ছোটখাটো কিছু ভুল হয়েছে, তবে মেয়েরা বিশ্বকাপে ভালো খেলেছে।’

বিসিবির এই পরিচালকের নজর এখন নারী দলের পাইপলাইনে, ‘পাইপলাইন ঠিক করতে আমরা স্কুল ক্রিকেট শুরু করতে যাচ্ছি। একটা “এ” টিম করব। সেখানে জাতীয় নারী দলের সাবেক যারা কাজ করতে আগ্রহী তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে। খেলোয়াড় বের করার জন্য যা যা করা দরকার, আমরা সব কিছুই করব।’

বাবুর লক্ষ্য প্রথমে স্কুল ক্রিকেট শুরু করা, ‘স্কুল ক্রিকেট নিয়ে মূলত আমাদের বড় পরিকল্পনা শুরু হচ্ছে। পরিকল্পনা রয়েছে ট্যালেন্ট হান্ট করার। এছাড়া নারীদের ফ্যাসিলিটিজ যা আছে সেগুলো বাড়ানোর পরিকল্পনা আমরা করছি। মেয়েদের অবশ্যই প্রায়োরিটি দেয়া হবে সর্বোচ্চ।’

বিশ্বকাপের মাঝেই বড় সুখবর পেল বাংলাদেশ

জ্যোতিদের বেতন বৃদ্ধি ও কোচিং প্যানেলের পরিবর্তন নিয়ে বাবু আরও বলেন, ‘নারী ক্রিকেট এখন বড় বিভাগ, অনেক খেলা তাদের। আমরা সবকিছুই বিবেচনা করছি (বেতন বাড়ানো), যদি দরকার হয় আমরা অবশ্যই সেটা করব। এছাড়া কোচিং প্যানেলে দেশের যারা তাদের উপরে আস্থা রয়েছে, প্রয়োজন হলে তখন পরিবর্তন করব। ক্রিকেটারদের সাথে এখনো আলোচনায় বসা হয়নি। দুই এক দিনের মধ্যে আমরা তাদের সাথে বসব।’

নারী দলের প্রধান নির্বাচক সাজ্জাদ আহমেদ শিপন এমন পারফরম্যান্সে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা দেশ থেকে যাওয়ার আগে যেমন লক্ষ্য নির্ধারণ করে গিয়েছিলাম, তার মধ্যে একটা ম্যাচ মিস হয়েছে। বাকি দলগুলোর সঙ্গে যে আমরা খুব ভালো করেছি, সেটা অবশ্য বলবো না।’

‘আমরা প্রথমেই তো বলে গিয়েছিলাম যে এমন কিছু করবো না, যাতে আমাদের আফসোস হয়। অস্ট্রেলিয়ার সাথে আমরা খারাপ খেলেছি। কারণ আমাদের ব্যাটসম্যানরা ভালো করতে পারেনি, পাওয়ার-প্লে ব্যবহার করতে পারেনি। যখনই জুটি হয়েছে তখনই উইকেট হারাতে হয়েছে, যে কারণে আমরা ৭৭ রানে অলআউট হয়েছি। আমরা এত কম রানে অলআউট হওয়ার মতো দল না’-যোগ করেন শিপন।

এমন সমস্যার কারণ হিসেবে টপঅর্ডারকে দায়ী করছেন শিপন। তিনি আরও বলেন, ‘ওপেনিং সমস্যা হয়েছে ধারাবাহিক রান করতে পারেনি, সঙ্গে টপঅর্ডার। সামনে অনেক সিরিজ রয়েছে, সেখানে আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করব। পেসারদের নিয়ে আলাদা করে পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা এখন থেকে দুইজন পেসার খেলানোর চিন্তায় রয়েছি।’

এসএইচ/আইএইচ