World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

সংশয় জাগানো ভিনিসিয়ুসের আন্তর্জাতিক মঞ্চে উত্থান

সংশয় জাগানো ভিনিসিয়ুসের আন্তর্জাতিক মঞ্চে উত্থান

গত কয়েক বছর ধরে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রমাণ করেছেন।

ফ্ল্যামেঙ্গো অ্যাকাডেমিতে নিজের দক্ষতার বিকাশ ঘটান। তারপর বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে দলবদলের সুযোগ আসে দ্রুত। ভিনিসিয়ুস ততদিনে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় তরুণ প্রতিভা হয়ে উঠেছেন।

মাত্র ১৬ বছর বয়সেই রিয়াল মাদ্রিদ ভিনিসিয়ুসের জন্য প্রস্তাব পাঠায়। সেই সময়ে দলবদল করার মতো পর্যাপ্ত বয়স হয়নি। ২০১৮ সালে তার ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই লস ব্লাঙ্কোসরা তার চুক্তি নিশ্চিত করে। এজন্য ৩৮ মিলিয়ন পাউন্ড পরিশোধ করে তারা। এই দলবদলটি ছিল বেশ বড় একটি ব্যাপার। ওই সময়ে নেইমারের পর ভিনিসিয়ুস ছিলেন ইতিহাসের দ্বিতীয় সবচেয়ে দামি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার। নেইমার শৈশবের ক্লাব সান্তোস থেকে রেকর্ড ৪৮.৬ মিলিয়ন পাউন্ডে বার্সেলোনায় যোগ দিয়েছিলেন।

ওই সময়ে অনূর্ধ্ব-১৯ কোনো ফুটবলারের জন্য কোনো ক্লাবের দেওয়া এটাই ছিল সর্বোচ্চ দলবদল ফি। রিয়াল মাদ্রিদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে তিনি একদিন সুপারস্টার হবেন। তারা সঠিক ছিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র তাদের হয়ে এ পর্যন্ত ২৪২টি লা লিগা ম্যাচে ৭৭টি গোল করেছেন। করেছেন ৪১টি অ্যাসিস্ট। প্রতি ৯০ মিনিটে তার গোল অবদানের হার দাঁড়ায় ০.৬৪। তার ট্রফি ক্যাবিনেটও বেশ সমৃদ্ধ। তিনটি লা লিগা শিরোপা, দুটি কোপা দেল রে, দুটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ মুকুট। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য ব্যক্তিগত অর্জন।

From Scapegoat to Superstar: The Rise of Vinícius Júnior on the International Stage

ভিনিসিয়ুস তার খেলা দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালেই জ্বলে উঠেছেন। দলের জন্য অবদান রেখেছেন। যথাক্রমে ২০২১-২২ এবং ২০২৩-২৪ মৌসুমে লিভারপুল ও বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছেন। এমনকি একটি চমৎকার বছর কাটানোর পর ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ের খুব কাছাকাছি ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত পুরস্কারটি ম্যানচেস্টার সিটির রদ্রি জিতে নেন।

আর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে তিনি দুর্দান্ত ফর্মে আছেন। তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভিনিসিয়ুসের পথচলা সব সময় এতটা সহজ ছিল না। তার আগের টুর্নামেন্টগুলোতে পারফরম্যান্স নিয়ে ব্রাজিলের সমর্থকরা হতাশ হয়ে পড়ছিলেন। ক্লাবের হয়ে তার অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান এবং ধারাবাহিকতার তুলনায় কিছুটা হতাশাজনকই ছিল তার আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্স।

ব্রাজিলিয়ান ফুটবল বিশেষজ্ঞ মার্কাস আলভেসের মতে: ‘প্রত্যাশা ছিল যে তিনি এতদিনে সেলেসাওদের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবেন। অথচ, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে বিদায় নেওয়ার চার বছর পরও তাকে নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।’

সমালোচনা এখানেই শেষ নয়, বেশ কয়েকজন সাবেক ব্রাজিলিয়ান আন্তর্জাতিক তারকা রিয়াল মাদ্রিদের চমৎকার পারফরম্যান্সের তুলনায় জাতীয় দলে তার নিম্নমানের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। ২০০৩ সালে ব্রাজিলের জার্সিতে এক ম্যাচ খেলেন ফাবিও লুসিয়ানো। তিনি বলেন, ‘ভিনিকে নিয়ে একটি সমস্যা রয়েছে, কারণ দুর্ভাগ্যবশত নেইমার যখন দলে থাকে না, তখন সে মনে করে তাকেই নেইমার হতে হবে। আমার মনে হয় এটি তার জন্য অনেক বড় একটি মানসিক চাপ।’

ভিনিসিয়ুসকে তার পরামর্শ, ‘তাকে এই বোঝা নিজের কাঁধ থেকে নামাতে হবে, জাতীয় দলকেও তার ওপর থেকে এই চাপ কমাতে হবে। তুমি নেইমার নও। তুমি একাই সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। আমরা সবাই তোমাকে সাহায্য করব। তুমি যা সবচেয়ে ভালো পারো তা-ই করো, নিজের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রাখো।’

ভিনিসিয়ুসের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলটি পেতে অনেক দীর্ঘ সময় লেগেছিল। ২০২২ সালে চিলির বিপক্ষে একটি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে নিজের ১৯তম ম্যাচে তিনি জালের দেখা পান। এর আগের তিনটি বড় টুর্নামেন্ট—কোপা আমেরিকা ২০২৪, বিশ্বকাপ ২০২২ এবং কোপা আমেরিকা ২০২১ মিলিয়ে ভিনিসিয়ুস ৬১৭ মিনিটের ফুটবলে মাত্র তিনটি গোল এবং দুটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন।

বড় টুর্নামেন্টগুলো ছাড়াও ব্রাজিলের হয়ে তার সামগ্রিক রেকর্ড ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চেয়ে কম ছিল। এই বিশ্বকাপের আগে তার ৪৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভিনিসিয়ুস গড়ে প্রতি দুই ম্যাচে একটি করে গোলে অবদান রেখেছিলেন।

গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে তিনি প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ২.৫টি শট নিতে ভূমিকা রাখেন। ১.৫টি সুযোগ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু এবারের টুর্নামেন্টে প্রায় প্রতিটি পরিসংখ্যানেরই উন্নতি হয়েছে। ভিনিসিয়ুস দেশের হয়ে বড় মঞ্চে পারফর্ম করা শুরু করেছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম চার ম্যাচে তিনি চারটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করতে সক্ষম হয়েছেন। তাতে বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের দৌড়ে বেশ ভালোভাবেই টিকে আছেন। এখন পর্যন্ত কেবল কিলিয়ান এমবাপে (৬), লিওনেল মেসি (৬), আর্লিং হালান্ড (৫) এবং হ্যারি কেন (৫) তার চেয়ে বেশি গোল করেছেন।

ভিনিসিউসের মূল শক্তি হলো বল পায়ে গতি নিয়ে ছুটে চলা। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও চোখে পড়ার মতো। ২০১৮-১৯ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদে তার প্রথম সিজন থেকে একটি পরিসংখ্যান দেখা যাক। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগে কেবল এমবাপে (৪৬২টি শটে ভূমিকা, ৮০টি গোলে অবদান) বল ড্রিবল বা ক্যারি করার পর শট বা গোলের ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন। ভিনিসিয়ুস ৪৪১টি শটে ভূমিকা এবং ৫৬টি গোলে অবদান রেখেছেন। তবে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ভিনিসিয়ুস এই দুটি তালিকাতেই শীর্ষে রয়েছেন।  বল ক্যারি করার পর ১৫৯টি শটে ভূমিকা রেখেছেন, আর ২২টি গোলে অবদান।

Vinícius Júnior stats Brazil - Opta

এবারের টুর্নামেন্টে বল ক্যারি করার পর শট নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি যৌথভাবে শীর্ষে (৯টি) রয়েছেন। তার পাশে স্পেনের লামিন ইয়ামাল। এর মধ্যে দুটিতে তিনি গোল করেছেন। কেবল উসমান দেম্বেলে (৩) তার চেয়ে বেশি গোল করেছেন। প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে বল নিয়ে ঢোকার ক্ষেত্রেও তিনি ২০২৬ বিশ্বকাপের র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষে (১৮ বার) আছেন।

ভিনিসিয়ুস ক্রমাগত নিজেকে এবং বলকে সঠিক অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিপক্ষের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। তিনি যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে সবচেয়ে বেশি এক্সপেক্টেড গোল (৩.৮৭) তৈরি করেছেন এবং লক্ষ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শট (১০টি) নিয়েছেন।

ব্রাজিলের পরবর্তী ম্যাচটি নকআউট পর্বের ম্যাচ নিয়ে অপ্টা সুপারকম্পিউটার ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। তাদের মতে, সেলেসাওদের পরবর্তী পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনা ৬৪.৭%। ভিনিসিয়ুসের আরেকটি সেরা পারফরম্যান্স দুই দলের মধ্যে ব্যবধান গড়ে দিতে পারে।

সুপারকম্পিউটারের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ব্রাজিলের ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি জেতার সম্ভাবনা ৯.১%। ভিনিসিয়ুস কি সত্যিই এবার তার দেশকে গৌরবের চূড়ায় নিয়ে যেতে পারবেন? সেটা করতে পারলে টুর্নামেন্টের আগে তার যোগ্যতা নিয়ে ওঠা সব প্রশ্ন মিলিয়ে যাবে।

এফএইচএম