World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

ব্রাজিলের ‘হ্যাটট্রিক’ বিদায়ের সাক্ষী

ব্রাজিলের ‘হ্যাটট্রিক’ বিদায়ের সাক্ষী

বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশিবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। গত তিন বিশ্বকাপে ব্রাজিল সেমিফাইনালের আগেই বিদায় নিয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্রাজিলের তিন বিদায়ী ম্যাচেই উপস্থিত থাকা হয়েছে। 

২০১৮ সালে কাজানে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে হেরেছিল ব্রাজিল। বেলজিয়াম ফুটবল ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ব্রাজিলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা দল। তবে ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্ম ছিল। সেই প্রজন্মের কাছেই মূলত ব্রাজিল হার মেনেছিল। ওই ম্যাচে ব্রাজিল খানিকটা দুর্ভাগ্যেরও শিকার হয়। পোস্টে লেগে একাধিকবার বল ফেরত এসেছে আবার বেলজিয়ান গোলরক্ষক অসাধারণ কিছু সেভও করেছেন। দিন শেষে যোগ্যতর দল হিসেবেই বেলজিয়াম জিতেছিল। 

কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়াম ও ব্রাজিল ম্যাচ চূড়ান্ত হওয়ার পরই আলোচনায় ছিল ব্রাজিল পারবে তো? এটাই মূলত ব্রাজিলের স্বর্ণযুগ বা সেই দিন আর নেই এটারই বহিঃপ্রকাশ। বেলজিয়াম র‌্যাংকিং ও খেলোয়াড়দের নামের ভারেও এগিয়ে ছিল সেই সময়ে। ফলে ব্রাজিল হারতে পারে সেই অনুমান আগে থেকেই ছিল। 

বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের কাছেই আটকে গিয়েছিল ব্রাজিল। ফাইল ছবি

২০১৮ সালে তিতে ব্যর্থ হওয়ার পরও ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন তার ওপরই ভরসা রাখে। ২০০২ সালে এশিয়ায় হওয়া বিশ্বকাপে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আবার এশিয়ার দেশ কাতারে বিশ্বকাপ এই একটা আত্মবিশ্বাস ছিল ব্রাজিলের। পরিসংখ্যান, ইতিহাস আর মাঠের পারফরম্যান্স ও কৌশল ভিন্ন সেটা ব্রাজিল টের পেয়েছে আবার কোয়ার্টার ফাইনালে। 

কাতার বিশ্বকাপে ব্রাজিল-বেলজিয়াম ও আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডস ম্যাচ একই দিন পড়েছিল। আর্জেন্টিনার ম্যাচ বেশি রাত হওয়ায় বিকেলে ব্রাজিল ম্যাচ কাভারের সুযোগ হয়। ব্রাজিল ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচে ভালোই খেলছিল। কৌশলের কারণে ম্যাচটি আর নিজেদের হয়নি। অতিরিক্ত সময়ে লিড নেওয়ার পর ম্যাচ জিতেছে এমন একটা গা-ছাড়া ভাব এসে যায় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের। ভুল ভাঙতে সময় লাগেনি খুব বেশি। ব্রাজিলের ফুটবলারদের ডিফেন্ডারদের ভুলে ক্রোয়েশিয়া দ্রুত ম্যাচে সমতা আনে। 

দীর্ঘদিন ব্রাজিলকে কোচিং করানো তিতে টাইব্রেকারে ভুল করে বসেন। দলে সবচেয়ে ভালো পেনাল্টি নেন নেইমার। তাকে প্রথমে না দিয়ে শেষে রাখেন। প্রথম দিকে মিস করায় ব্রাজিল আর টাইব্রেকারে ম্যাচে ফিরতে পারেনি। এমনকি নেইমার সেই পেনাল্টি নেওয়ারও সুযোগ পাননি। 

টাইব্রেকারে ভুল চালে স্বপ্নভঙ্গ হয় ব্রাজিলের। ফাইল ছবি

কাতার বিশ্বকাপ শেষে ব্রাজিল হেক্সা মিশনে খুব জোর দেয়। দেশি কোচের প্রথা ভেঙে ক্লাব ফুটবলে সেরা কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়। ব্রাজিলিয়ানদের বাইরে ব্রাজিল সাধারণত কোচ না করলেও ইতালিয়ান আনচেলত্তিকে ভরসা করে ব্রাজিল। 

ব্রাজিল মানেই আক্রমণাত্মক ফুটবল ও গোলের মহড়া। এটা বজায় রাখতে হলে সেই মানের খেলোয়াড় প্রয়োজন। ব্রাজিলের সেই মানের ফিনিশার ও ফরোয়ার্ড কম। নেইমার বড় তারকা হলেও ইনজুরি ও ফর্ম নিয়ে নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিলেন। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র একাধিক গোল ও আক্রমণে নেতৃত্ব দিলেও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জ্বলে উঠতে পারেননি। নরওয়ের বক্সে একাধিকবার ভুল পাস দিয়ে আক্রমণ নষ্ট করেছেন। আবার অতিরিক্ত বল পায়ে রেখে কাটাতে গিয়ে আক্রমণের ইতি ঘটেছে। 

ব্রাজিলের এবার সবচেয়ে বড় ভরসার নাম ছিল কোচ আনচেলত্তি। তিনি এতটাই অভিজ্ঞ যে সংকটময় মুহূর্তে খেলার কৌশল বদলে বাজিমাত করেন। জাপান ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে তার খেলোয়াড় পরিবর্তন ও কৌশল কাজে দিয়েছিল। নরওয়ে ম্যাচে আর হয়নি। উল্টো নরওয়ের হালান্ড দুটো সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ম্যাচ নিজের করে নিয়েছেন। ব্রাজিলের ভিনি, এনরিকেরা যেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। 

আধুনিক ফুটবলে দুই ফুলব্যাক খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের সাম্প্রতিক স্বর্ণযুগে ফুলব্যাক ছিল কার্লোসের মতো ফুটবলার। রক্ষণের পাশাপাশি আক্রমণেও যিনি ছিলেন সমান দক্ষ। বিশেষ করে জোরালো ফ্রি কিকে তার দক্ষতা অনবদ্য। কার্লোসের কাছাকাছি মানের ফুটবলারও ছিল না আনচেলত্তির একাদশে। ক্যাসিমেরো এক সময় অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। তিনি তার সেরা সময় পেছনে ফেলেছেন। ফলে অনেক সময় গতির কাছে পরাস্ত হয়েছেন। জাপানের বিপক্ষে গোল হজমে তার দায় অনেক। যদিও পরবর্তীতে গোল দিয়ে সেটা মোচন করেছেন। 

প্রতি বিশ্বকাপেই বড় তারকাদের নিয়ে আলোচনা হয়। মেসি, এমবাপে ও হালান্ডের মতো বৈশ্বিক বড় তারকা ব্রাজিল স্কোয়াডে তেমন ছিল না। নেইমার বড় তারকা হলেও তিনি মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরে বেশি সময় কাটিয়েছেন। এতেই বোঝা যায় ব্রাজিলের ফুটবলারদের কোয়ালিটি ও তারকা খ্যাতি আগের চেয়ে কমছে। 

প্রথা ভেঙে বিদেশি কোচ এনেও ভাগ্য বদলায়নি ব্রাজিলের। তিন যুগের মধ্যে সবচেয়ে বাজে বিশ্বকাপ কেটেছে এবার। 

মাঠে খেলেন ফুটবলারা। সেই খেলার চাবি থাকে কোচদের হাতে। কোচের হাতে অস্ত্র থাকলে তিনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। টুর্নামেন্টের মাঝপথে পাকেতা ও রাফিনিয়া ইনজুরিতে পড়ায় আনচেলত্তির মাথায় হাত পড়ার পরিস্থিতি হয়েছিল। দুই যুগ আগে ব্রাজিলের রিজার্ভ বেঞ্চ দিয়েও অন্য দল সাজানো যায় এমন রসিকতা চলত ফুটবলাঙ্গনে। 

আনচেলত্তি অবশ্যই ইউরোপীয়ান ক্লাব ফুটবলে বড় মাপের কোচ। ক্লাব ও জাতীয় দলের কোচিংয়ের তারতম্য এবার ঠিকই টের পেয়েছেন এই ট্যাকটিশিয়ান। ক্লাবে অর্থের জোরে অনেক ফুটবলারকে দলে ভেড়ানো গেলেও জাতীয় দলে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়। কোয়ালিটি খেলোয়াড় সংখ্যা কম ও রিজার্ভ বেঞ্চ শক্তিশালী না হলে অবস্থা বেগতিক ঠিকই টের পেয়েছেন। এরপরও কোচ হিসেবে ব্যর্থতার দায় নিতেই হবে আনচেলত্তিকে। এক বছর আগে দায়িত্ব নিয়ে বিশ্বকাপের জন্য দলকে ঠিকমতো প্রস্তুত করতে না পারার। 

ফুটবলে প্রজন্ম খুব গুরুত্বপূর্ণ। রোনালদো-রিভালদো-কাফু-কার্লোসরা টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলছেন। এমবাপে-দেম্বেলেরা টানা দুটি মেসি-ডি মারিয়ারাও দুটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন। মেসি ও এমবাপেরা একবার করে সফল হয়েছেন। বিশ্বকাপ জিততে ভালো মানের একঝাঁক ফুটবলার যেমন প্রধান শর্ত এরপর কোচের কৌশল, খানিকটা সৌভাগ্যও প্রয়োজন। গত তিন বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রথম শর্তই ঘাটতি। এবার এক শর্ত পূরণ হলেও অন্যগুলো ঘাটতি থাকায় আবারও হেক্সা মিশন বাস্তবায়ন হয়নি। 

এজেড/এফআই