মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ‘প্রিয় বন্ধু’ বলে পরিচয় করিয়ে দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এক যুগের বেশি সময় ধরে ফিফার মসনদে থাকলেও এবারই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আলোচনা তাকে ঘিরে। ব্যক্তিগত জেট বিমানে চড়ে বিশ্বকাপের এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুতে চষে বেড়ান। সোশ্যাল মিডিয়াতেও তুমুল সক্রিয়। আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনার তীরও তার দিকে কম নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড স্থগিত কাণ্ড ছাড়াও চলতি বিশ্বকাপে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তার বিরুদ্ধে ইউরোপিয়ান সংসদে তদন্তের দাবি তুলেছেন ৩৫ জন সংসদ সদস্য। এতক্ষণে হয়তো নামটা জেনে গেছেন সবাই। তিনি আর কেউ নন, জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো। বিশ্ব ফুটবলের নীতি নির্ধারণী সংস্থা ফিফার সর্বোচ্চ নেতা তথা প্রেসিডেন্ট। অথচ এক দশক আগেও ইনফ্যান্তিনো ছিলেন এক নিরীহ আইনজীবী।
যেভাবে বিশ্ব ফুটবলের মসনদে
একটু পেছনে ফেরা যাক, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ওয়েলসের কার্ডিফের একটি হোটেলের বারে সাংবাদিকদের বিয়ার খাইয়ে উদ্যাপন করেছিলেন জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো। ঘুষ ও দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে সেপ ব্ল্যাটার যুগের পতনের পর ইনফ্যান্তিনোকে দেখা হচ্ছিল ফুটবলের নতুন ‘জনবান্ধব’ মুখ হিসেবে। যিনি সবার সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারতেন। ফুটবলের হারানো সুনাম ফিরিয়ে আনতে তার ওপর ভরসা করছিলেন সবাই।
দশ বছর পর সেই সুইস-ইতালীয় আইনজীবী এখন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। বর্তমানে তার বার্ষিক আয় ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সখ্যতার কথা কারও অজানা নয়। কাতার সরকারের দেওয়া ব্যক্তিগত জেটে ভ্রমণ করেন তিনি।

২০১৬ সালে প্রথমবার ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ইনফ্যান্তিনো আরও দুই দফা—২০১৯ ও ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুননির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৭ সালের নির্বাচনেও আবার প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, এবারও কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই তিনি দায়িত্ব ধরে রাখবেন। ফিফার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কোনো সভাপতি সর্বোচ্চ তিনবার তথা চার বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন অর্থাৎ মোট ১২ বছর। তবে ২০১৬ সালে ব্ল্যাটারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ায় নিয়মিত নির্বাচনী চক্রের বাইরে দায়িত্ব নেন ইনফ্যান্তিনো। সে কারণে তার প্রথম তিন বছরের মেয়াদকে ১২ বছরের সীমার মধ্যে ধরা হয়নি। ফলে তার আনুষ্ঠানিক ১২ বছরের মেয়াদ গণনা শুরু হয়েছে ২০১৯ সাল থেকে।
২০১৬ সালে প্রথমবার ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ইনফ্যান্তিনো আরও দুই দফা—২০১৯ ও ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুননির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৭ সালের নির্বাচনেও আবার প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, এবারও কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই তিনি দায়িত্ব ধরে রাখবেন।
তবে ইএসপিএনের সঙ্গে কথা বলা একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২০৩১ সালে চতুর্থ মেয়াদে প্রার্থী হওয়ার কিংবা সে উদ্দেশ্যে ফিফার সংবিধান সংশোধনের চেষ্টা করার কোনো পরিকল্পনা ইনফ্যান্তিনোর নেই। এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়ানো মানসিক ও শারীরিক ধকল।
ইনফ্যান্তিনোকে ঘিরে বিতর্ক ও অন্যদের নীরবতা
ক্ষমতাধর বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগে ইনফ্যান্তিনো একাধিকবার বিতর্কে জড়িয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একক সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ফিফা পিস প্রাইজ চালুর ঘোষণা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। তবুও বিশ্ব ফুটবল বলয়ের ভেতরে তাকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করার ঘটনা খুবই বিরল।
২০২৬ বিশ্বকাপের ব্যয়বহুল টিকিট নীতির পক্ষে ইনফ্যান্তিনোর অবস্থান নিয়ে ইএসপিএন একটি শীর্ষ জাতীয় ফুটবল সংস্থার মতামত জানতে চাইলে তারা স্পষ্ট জবাব দেয়, ‘আমরা এ বিষয়ে কিছু বলছি না।’ অবশ্য এমন নীরবতার মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের (এনএফএফ) সভাপতি লিসে ক্লাভেনেস। তিনি ট্রাম্পকে ফিফা পিস প্রাইজ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘ফিফার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নীতিমালার লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে অভিযোগ করেন, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ফিফার ভেতরে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
— Telegraph Football (@TeleFootball) June 16, 2026
বিশ্ব ফুটবলারদের সংগঠন ফিফপ্রোর সভাপতি সার্জিও মার্চিও গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপ চলাকালে ‘দ্য ম্যান হু থিংকস হি’স গড শিরোনামে এক বিবৃতিতে ইনফ্যান্তিনোর তীব্র সমালোচনা করেন। মার্চির ভাষায়, ‘ইনফ্যান্তিনো নিজের এক আলাদা জগতে বাস করেন। তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই বিশাল আয়োজনগুলো।’
তবে বিশ্ব ফুটবলের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই ইনফ্যান্তিনোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে সেভাবে প্রশ্ন তোলেনি। অথচ তিনিই ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে বিশেষ সম্মান জানানোর সিদ্ধান্ত নেন, ২০২৬ বিশ্বকাপের বিতর্কিত টিকিট মূল্য নির্ধারণে অনুমোদন দেন এবং ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে সৌদি আরবকে চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দেন।

২০৩৪ বিশ্বকাপের বিডিং প্রক্রিয়াও ছিল বিতর্কিত। ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর ইনফ্যান্তিনো বিড আহ্বান করেন এবং মহাদেশীয় রোটেশনের যুক্তি দেখিয়ে আবেদন সীমাবদ্ধ রাখেন শুধু এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য। অস্ট্রেলিয়া শুরুতে বিড করার কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের বিপক্ষে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সৌদি আরব একমাত্র প্রার্থী হিসেবে থেকে যায় এবং ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ফিফার বিশেষ কংগ্রেসে দেশটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক ঘোষণা করা হয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফিফা সভাপতির পদে ১০ বছর পূর্তি উদ্যাপন করেছেন ইনফ্যান্তিনো। উপলক্ষ্যটি ঘিরে ফিফা বড় পরিসরে প্রচারাভিযান চালায়। তৈরি করা হয় বিশেষ ‘ইনফান্তিনো ১০’ লোগো, প্রকাশ করা হয় ৩০ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র। যেখানে বিভিন্ন কর্মকর্তা, সাবেক ফুটবলার ও কোচদের শুভেচ্ছাবার্তা যুক্ত করা হয়েছে।
ফিফার সেই তথ্যচিত্রে বলা হয়, ‘সভাপতি হিসেবে ১০ বছর। অগ্রগতির ১০ বছর। সংগঠনের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে দায়িত্ব নেওয়া থেকে শুরু করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজনের প্রস্তুতি—এটাই ফিফার নেতৃত্বে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর এক দশকের গল্প।’
ফুটবলকে অভিজাতদের সার্কাসে রূপান্তর?
২০২৬ বিশ্বকাপজুড়ে একের পর এক বিতর্ক এবং সেসবের কেন্দ্রে জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর ভূমিকা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ফিফা সভাপতির চেয়ারে তার ১০ বছরের আসল গল্পটা কী? নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কি তিনি বাস্তবায়ন করেছেন? নাকি তিনি কেবল একজন দক্ষ বিক্রয়কর্মী, যিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর বিশ্বকাপকে অভিজাতদের জন্য সাজানো এক বিশাল প্রদর্শনীতে পরিণত করেছেন?
২০১৬ সালে ইনফ্যান্তিনো যখন ফিফার সভাপতির দায়িত্ব নেন, তখন সংস্থাটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম বড় দুর্নীতিকাণ্ডে জর্জরিত। এর এক বছর আগে, ২০১৫ সালে এফবিআইয়ের তদন্তে ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তাদের জড়িত ১৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঘুষ ও অবৈধ কমিশনের তথ্য সামনে আসে। ওই বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের (ডিওজে) অনুরোধে সুইস পুলিশ জুরিখের বিলাসবহুল এক হোটেলে অভিযান চালিয়ে ফিফার সাতজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে।
এই কেলেঙ্কারিই শেষ পর্যন্ত পতন ঘটায় তৎকালীন ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার এবং তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি, উয়েফা সভাপতি মিশেল প্লাতিনির। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ফিফা দুজনকেই ফুটবল-সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম থেকে আট বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। এমন এক অস্থির প্রেক্ষাপটেই ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হন জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো। নির্বাচনে তিনি বাহরাইনের শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল-খলিফাকে ১১৫-৮৮ ভোটে হারান। তার নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে ছিল-বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা বাড়ানো,সদস্য দেশগুলোর জন্য উন্নয়ন তহবিল বৃদ্ধি এবং ব্ল্যাটার-পরবর্তী সময়ে ফিফার হারানো সুনাম পুনরুদ্ধার করা।
শৈশবের বর্ণবাদ থেকে বিশ্ব ফুটবলের চূড়ায়
শৈশবে সবাই ডাকত 'পিকোলো' (ছোট্টটি)। ১৯৭০ সালে সুইজারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ইনফ্যান্তিনো শৈশবে গুরুতর অসুস্থ ছিলেন—ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল ও যুগোস্লাভিয়ার বেলগ্রেড থেকে রক্ত নিয়ে বাঁচানো হয় তাকে। ইতালীয় অভিবাসী বাবা ভিঞ্চেনজো ও মা মারিয়ার সন্তান হিসেবে তিনি সুইজারল্যান্ডে বড় হয়েও নিজেকে ইতালিয়ান ভাবতেন। পারিবারিক আর্থিক সংগ্রাম ছিল চরমে। বাবা রাতের ট্রেনে কাজ করতেন, মা স্টেশনে সিগারেট বিক্রি করতেন।
ইতালীয় অভিবাসী দম্পতির ঘরে জন্ম নেওয়া ইনফ্যান্তিনোর চুল ছিল লাল। এই চেহারার কারণে স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রায়ই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ শুনতে হতো তাকে। সুইজারল্যান্ডের দেয়ালে দেয়ালে তখন লেখা থাকত,‘কুকুর এবং ইতালীয়দের প্রবেশ নিষেধ’। ইনফ্যান্তিনো নিজেই স্বীকার করেছেন, শৈশবে দেখা সেই বৈষম্যই পরবর্তীতে তাকে ফুটবলকে শান্তি ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
আইন বিষয়ে পড়াশোনা ৫৬ বছর বয়সী ইনফ্যান্তিনো বিয়ে করেছেন এক লেবানিজ নারীকে এবং তিনি চার সন্তানের জনক। তিনি আরবিসহ মোট ৭টি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন এবং একই সঙ্গে সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও লেবাননের নাগরিকত্ব রয়েছে তার।
সুইজারল্যান্ডের ফ্রিবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস করা ৫৬ বছর বয়সী ইনফ্যান্তিনো বিয়ে করেছেন এক লেবানিজ নারীকে এবং তিনি চার সন্তানের জনক। তিনি আরবিসহ মোট ৭টি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন এবং একই সাথে সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও লেবাননের নাগরিকত্ব রয়েছে তার। বর্তমানে নিউইয়র্ক, মায়ামি ও জুরিখের ফিফা অফিস মিলিয়ে চষে বেড়ানো এই সংগঠক নিজেই স্বীকার করেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একাধিক মহাদেশ সফর করায় তার শরীরের জৈবিক ঘড়ি (বডি ক্লক) কোন টাইম জোনে চলে, তা তিনি নিজেও জানেন না।
ইনফ্যান্তিনোর সমালোচকদের অভাব না থাকলেও, ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের বড় অংশই তাকে ‘ত্রাতা’ মনে করে। কারণ তার ১০ বছরের শাসনামলে অনুদান তহবিল প্রায় আট গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নে প্রায় ৫১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে ফিফা।

২০১৬ সালে ফিফার বার্ষিক আয় যেখানে ছিল মাত্র ৫০ কোটি ২০ লাখ ডলার, সেখানে ২০২৫ সালের হিসাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬৬ কোটি ডলারে। আর চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে ৪৮ দলের টুর্নামেন্ট থেকে ফিফার রেকর্ড ৯০০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতি বন্ধে তিনি কড়া নিয়ম চালু করেছেন। হিসাবপত্রের গরমিল ধরতে প্রতিটি সদস্য দেশে আর্থিক বিশেষজ্ঞদের পাঠাচ্ছেন তিনি। ফিফার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জিয়ান্নি একটি বহুজাতিক কোম্পানির সিইও-র মতো কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল ও এফবিআই পরিচালক যখন ব্যক্তিগতভাবে তার মায়ামি অফিসে এসে দেখা করেন, তখনই বোঝা যায় গত এক দশকে ফিফা কতটা বদলে গেছে।’
ইনফ্যান্তিনো নিজেকে ফিফার একজন ‘সেলসম্যান’ বা বিক্রেতা মনে করেন। ২০২৫ সালে আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি ও প্রচারের জন্য তিনি স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওভাল অফিসের ডেস্কে টুর্নামেন্টের ট্রফিটি সাজিয়ে রেখেছিলেন। এমনকি পক্ষপাতিত্বের তোয়াক্কা না করে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নিউইয়র্কের বিতর্কিত ‘ট্রাম্প টাওয়ার’-এ ফিফার অফিস ভাড়া নেওয়া প্রসঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, হেডলাইন বা গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য, কারণ শিরোনাম প্রচার বাড়ায়।
বিশ্বকাপের পরিধি ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ দলে রূপান্তর করে ফুটবলকে বিশ্বায়ন করার কৃতিত্ব তিনি পেতেই পারেন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঝপথে এসে মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো।
তবে প্রচারের এই তীব্র নেশা অনেক সময় তাকে বিপাকে ফেলেছে। ২০২৩ সালে কিংবদন্তি পেলের শেষকৃত্যে সাবেক ফুটবলারদের সাথে সেলফি তুলে সমালোচিত হন তিনি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভ্যাঙ্কুভারে ফিফা কংগ্রেসে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানদের জোর করে হ্যান্ডশেক করাতে গিয়ে পরিস্থিতি চরম বিব্রতকর করে তোলেন তিনি, যা ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা ‘উদ্ভট তামাশা’ বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর বৈঠকে ট্রাম্পের নির্বাচনী লাল টুপি পরার কারণে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির নিরপেক্ষতার তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে।
বিশ্বকাপের পরিধি ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ দলে রূপান্তর করে ফুটবলকে বিশ্বায়ন করার কৃতিত্ব তিনি পেতেই পারেন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঝপথে এসে মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র দলের একটি লাল কার্ড বাতিল করা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং ইনফ্যান্তিনোর ‘রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব’ বিশ্ব ফুটবলে এক নজিরবিহীন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ইউরোপীয় ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা উয়েফা ও ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, স্বাগতিক দেশের রাজনৈতিক চাপের কাছে মাথা নত করে ফিফা সভাপতি ফুটবলের সততা ও ‘ফেয়ার-প্লে’র সব নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করেছেন।
এফআই

