আজ রাতে বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কোয়ার্টার ফাইনালগুলোর একটি দেখতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব। মায়ামিতে মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড ও নরওয়ে। কাগজে-কলমে ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকলেও, পরিসংখ্যান বলছে, এটি শেষ আটের চার ম্যাচের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই।
অপটার সুপারকম্পিউটার বলছে সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনায় ইংল্যান্ডের পাল্লা কিছুটা ভারী—৬১.৭ শতাংশ। নরওয়ের সম্ভাবনা ৩৮.৪ শতাংশ। তবে কোয়ার্টার ফাইনাল শুরুর আগে ফ্রান্স, স্পেন ও আর্জেন্টিনার তুলনায় ইংল্যান্ডকে কম ফেবারিট হিসেবেই দেখেছিল অপটা।
ইতিহাসে প্রথমবার কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে নরওয়ে। কিন্তু ব্রাজিলকে হারিয়ে শেষ আটে পৌঁছানোর পর আর তাদের সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ করার সুযোগ নেই। স্টালে সলবাকেনের দল পাঁচ ম্যাচে হেরেছে মাত্র একবার। সেটিও গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সের বিপক্ষে, সেই ম্যাচের একাদশে ১০টি পরিবর্তন এনে মূল খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়েছিলেন কোচ। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হলেও সেই সিদ্ধান্ত পরে কাজে দিয়েছে। কারণ এরপর আইভরি কোস্ট ও ব্রাজিলকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে নরওয়ে।
চলতি বিশ্বকাপে নরওয়ের খেলা পাঁচ ম্যাচের প্রতিটিতেই গোল হয়েছে দুই প্রান্তে। এ পর্যন্ত ১২ গোল করেছে নরওয়ে, হজম করেছে ৯টি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ১৯৫৪ সালের জার্মানির পর সেমিফাইনালে ওঠার পথে একই সঙ্গে ১০টির বেশি গোল করা ও হজম করা দলের তালিকায় নাম লেখাল নরওয়ে।
ইংল্যান্ডের যাত্রাপথ ছিল ভিন্ন ধরনের। কখনো তারা দাপট দেখিয়েছে, কখনো প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তবে শেষ ষোলোতে মেক্সিকোর বিপক্ষে অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের নাটকীয় ৩-২ গোলের জয় তাদের নতুন করে আলোচনায় এনেছে। সেই ম্যাচে টমাস টুখেলের দল দেখিয়েছে বড় টুর্নামেন্টে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক দৃঢ়তা ও লড়াকু মনোভাব।
১১তম বারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলছে ইংল্যান্ড। ব্রাজিল ও জার্মানি ছাড়া আর কোনো দল তাদের চেয়ে বেশি বার শেষ আটে ওঠেনি। কিন্তু এই পর্বে ইংল্যান্ডের অতীত রেকর্ড খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার সুযোগ দেয় না। আগের ১০ কোয়ার্টার ফাইনালের মাত্র তিনটিতে জয় পেয়েছে তারা।
এদিকে আজকের ম্যাচের আলোচনার কেন্দ্র একজনই—আর্লিং হালান্ড। বিশ্বকাপের মঞ্চেও গোল করার কাজটা যেন খুব সহজ করে ফেলেছেন নরওয়ের এই তারকা স্ট্রাইকার। প্রথম চার ম্যাচেই গোল করেছেন তিনি, মোট গোল ৭টি। আর এই গোলগুলো এসেছে মাত্র ১৮টি শট থেকে।
বিশ্বকাপের প্রথম পাঁচ ম্যাচেই গোল করার কীর্তি সর্বশেষ গড়েছিলেন কলম্বিয়ার জেমস রদ্রিগেজ, ২০১৪ সালে। ইউরোপীয়দের মধ্যে শেষবার এমনটা করেছিলেন জার্মান কিংবদন্তি গার্ড মুলার, ১৯৭০ সালে। আজ গোল করলে সেই তালিকায়ও নিজের নাম যোগ করবেন হালান্ড। গোলই শুধু নয়, তার গোলগুলোর গুরুত্বও বিশাল। সাত গোলের মধ্যে চারটিই ছিল ম্যাচজয়ী। বিশ্বকাপের এক আসরে এর চেয়ে বেশি ম্যাচজয়ী গোল করতে পেরেছেন কেবল পোল্যান্ডের গ্রেগরজ লাটো ও ইতালির সালভাতোরে স্কিলাচি।
নরওয়ের জার্সিতে হালান্ডের পরিসংখ্যান তো আরও বিস্ময়কর। মাত্র ৫৪ ম্যাচে ৬২ গোল। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে টানা ১৪ খেলায় গোল করেছেন, এই সময়ে করেছেন ২৭ গোল। হালান্ডের সামনে আজ দাঁড়াবেন জর্ডান পিকফোর্ড। তবে ইংল্যান্ড গোলরক্ষকের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। প্রিমিয়ার লিগে হালান্ডের নেওয়া ১০টি অন-টার্গেট শটের মধ্যে ৭টিই পিকফোর্ডের জালে গেছে।

তবে ইংল্যান্ডের মূল ভরসা থাকবে হ্যারি কেইন এবং জুড বেলিংহ্যামের ওপর। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে হালান্ডের ঠিক পেছনে আছেন কেইন। তার গোল সংখ্যা ৬। ২০১৮ বিশ্বকাপেও একই সংখ্যক গোল করেছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের হয়ে এক আসরে এর বেশি গোল করেছেন কেবল গ্যারি লিনেকার। নকআউট পর্বে কেইনের কার্যকারিতা আরও চোখে পড়ার মতো। বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের নকআউট ম্যাচে ১২ খেলায় তার গোল ১১টি।
অন্যদিকে জুড বেলিংহ্যামও আছেন দুর্দান্ত ছন্দে। মেক্সিকোর বিপক্ষে জোড়া গোল করা এই মিডফিল্ডার ইতোমধ্যে বিশ্বকাপে করেছেন ৪ গোল। কোনো ইংলিশ মিডফিল্ডারের এক আসরে এত গোল করার আর রেকর্ড নেই।
হালান্ড, কেইন, বেলিংহ্যামদের মতো তারকায় ভরা এই ম্যাচে ব্যক্তিগত লড়াইয়েরও কমতি নেই। তবে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের গল্প লিখবে দলীয় পারফরম্যান্সই। দুই দলের অতীত পরিসংখ্যান অবশ্য ইংল্যান্ডের পক্ষেই কথা বলছে। ১২ দেখায় নরওয়ের জয় মাত্র দুটি। সর্বশেষ চার ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোনো গোলও করতে পারেনি তারা।
অপটার হিসাব বলছে, শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালের টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থ্রি লায়ন্সদেরই। সব মিলিয়ে তাদের সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা ধরা হয়েছে ৬১.৭ শতাংশ। সংখ্যা অবশ্য সব সময় শেষ কথা বলে না। সেটিই প্রমাণ করতে চাইবে নরওয়ে। আর ইংল্যান্ড চাইবে বহুল প্রতীক্ষিত আরেকটি বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল নিশ্চিত করতে।
এইচজেএস

