আর্জেন্টিনার নকআউট পাঞ্চ সবসময় প্রস্তুত থাকে। এই বিশ্বকাপে তাদের নকআউট ম্যাচগুলোতে কেবল ফুটবলই নয়, জড়িত আছে আবেগও। যখন তাদের মৃত মনে করা হয়, তখনই তারা উঠে দাঁড়ায়। যখন মনে হয় ঘুমিয়ে আছে, তখনই আবার জেগে ওঠে। এবার হুলিয়ান আলভারেজের সরব উপস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়াল আর্জেন্টিনা। একজন কম নিয়ে খেলেও সুইজারল্যান্ড যখন মর্যাদার সঙ্গে লড়ছিল, প্রতিরোধের দেয়াল গড়েছিল এবং টাইব্রেকারের ওপর বাজি ধরেছিল, তখনই আলভারেজ তাদের ধাক্কা দিলো।
লাউতারো মার্টিনেজের তৃতীয় গোল হওয়ার আগ পর্যন্ত এটা ছিল নিখাদ, লাগামহীন উন্মাদনা। লাউতারোর গোলের পরই যেন সবার গলা খুলে গেল। দমবন্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এলো। ঠিক তখন থেকে, দেশের প্রত্যেকটি শহরে, স্টেডিয়ামের প্রত্যেক স্ট্যান্ডে, যেখানেই একজন আর্জেন্টাইন ছিলেন, তাদের গলা থেকে বেরিয়ে এলো একটি গান, ‘যে লাফায় না, সে একজন ইংরেজ’। ইংল্যান্ড যখন নরওয়েকে বিদায় করে দিলো, তখন থেকেই সবাই এই গান গাওয়ার চিন্তা করে রেখেছিল, স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। চাইলে ম্যাচের সময় তারা গাইতে পারতো, কিন্তু দুর্ভাগ্য এড়ানোর জন্য সেটা করেনি। কারণ খুব করে আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে চাইছিল। কারণ এই দলকেই আর্জেন্টিনা বেশ ভিন্ন চোখে দেখে। ম্যাচ শেষ হতেই শুরু হলো লাফালাফি, সঙ্গে চলল ‘যে লাফায় না সে একজন ইংরেজ’ গান।

ম্যাচটি ভীষণ রকমের কঠিন ছিল। কল্পনার চেয়েও বেশি। নকআউটে কোনো ম্যাচই যেন আর্জেন্টিনার অনুকূলে আসতে চাচ্ছে না। যখন পিছিয়ে পড়ে, তখন ম্যাচে ফিরে আসার জন্য তাদের ধুঁকতে হয়। আবার তারা যদি এগিয়ে যায়, তখনও তাদের ভুগতে হয়—মাঝে মাঝে কোনো কারণ ছাড়াই লিড ধরে রাখার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করতে হয়।
সুইজারল্যান্ড যতই শারীরিক ফুটবল খেলুক না কেন, তারা যেভাবে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের বক্সের সামনে গিয়ে রক্ষণাত্মকভাবে গুটিয়ে যাচ্ছিল, তা হতাশাজনক বটে। ভাগ্য খারাপ না হলে যা হওয়ার তাই হতে পারত। তারা সমতায় ফিরে আসতে পারত। এসেছেও। রক্ষণে ধুঁকতে থাকা আর্জেন্টিনা তিন ম্যাচে পঞ্চম গোল হজম করল। তাদের ব্যাক লাইন বেশিরভাগ সময় সুইসদের আটকে রাখতে পারলেও ৬৭তম মিনিটে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আলগা হয়ে গেল রক্ষণভাগ। এনদোয়ে সেই সুযোগ নিয়ে সমতা ফেরান।

অবশ্য এই সময়ে সুইজারল্যান্ড গোলটির দাবি রাখছিল। দ্বিতীয়ার্ধে তারা প্রতিপক্ষের বক্সে ১৮ বার বলে পা ছুঁয়েছিল, বিপরীতে আর্জেন্টিনা মাত্র চারটি। মূলত ব্রিল এম্বোলো ‘অদ্ভুত’ নিয়মে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখলে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় সুইসরা। তার লাল কার্ডের আগে সুইজারল্যান্ডের বল পজেশন ছিল ৫৪ শতাংশ, পরে আর্জেন্টিনার ৭৬ শতাংশ!
তবুও ম্যাচে লড়াই করে গিয়েছে সুইজারল্যান্ড। কিন্তু আর্জেন্টিনার পক্ষে আবারও ম্যাচ নির্ধারণ হলো অলৌকিকভাবে। এবার আলভারেজের চোখ ধাঁধানো গোল। ২৭ মিটার দূর থেকে নেওয়া তার ডান পায়ের শট উঁচুতে ভেসে দূরের পোস্ট দিয়ে কোণাকুনি জাল কাঁপায়। তিনি কিন্তু কোনো রিবাউন্ড গোল করেননি, কিংবা বক্সের মধ্যে চমৎকার কোনো পাস ধরেও নয়। আলভারেজ এই বিশ্বকাপে প্রথম গোল যেন করলেন সৃষ্টিকর্তার বিশেষ আশীর্বাদ নিয়ে।

আগের ম্যাচে আর্জেন্টিনা ইতিহাস গড়েছিল একেবারে খাদের কিনারা থেকে। ২-০ গোলে মিশরের কাছে হেরে বিদায় নিতে বসেছিল। আর এবার একটু ভিন্ন চিত্র। পেনাল্টির দিকে গড়াচ্ছিল ম্যাচ।
প্রশ্ন উঠেছিল, আর্জেন্টিনা কি পারবে এবারের ধকল সামাল দিতে? বিশেষ করে মেসির নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সের কারণে এই শঙ্কা আরও বাড়ছিল। যদিও তার অ্যাসিস্টেই আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল। প্রথমার্ধে তিনি মাত্র একটি শট নেন, পুরো ম্যাচে তিনটি। টানা ৯ ম্যাচ গোল করার পর থামলেন তিনি। আগের দুটি ম্যাচে টানটান উত্তেজনার সঙ্গে নিশ্চয় তার শক্তিরও ক্ষয় হয়েছে। তারই প্রভাব যেন পড়ল এই ম্যাচে।
মেসি জাদু না দেখা গেলেও ম্যাচে দলগত দক্ষতার চেয়ে ব্যক্তিগত দক্ষতাই বড় হয়ে উঠেছিল। যেখানে আগে কখনো দুজন স্ট্রাইকারকে খেলাচ্ছিল না আর্জেন্টিনা, সেখানে তিন জন স্ট্রাইকার এলেন। খেলা শেষ হলো সবার অংশগ্রহণে। আলভারেজকে গোল করতে সাহায্য করলেন স্ট্রাইকার হোসে মানুয়েল লোপেজ। আরেক স্ট্রাইকার লাউতারো স্বস্তি এনে দিলেন আলামাদার ফিনিশিং ব্যর্থতায়। এমিলিয়ানো মার্টিনেজ; মন্তিয়েল, ওতামেন্দি, লিসান্দ্রো, নিকো গঞ্জালেজ; অ্যালেক্সিস;মেসি, আলভারেজ, লোপেজ, আলামাদাকে নিয়ে ৪-১-৫ ফরমেশন?

এখনই কৌশলগত দিক নিয়ে এবং বুধবারের সেমিফাইনাল নিয়ে ভাবনা বড্ড তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। কিংবা এমন প্রশ্নও করা উচিত নয়, যেটা স্পষ্ট নয়। কেন সবসময় একই পরিবর্তন? কেন স্কোয়াড ২৬ জন থেকে কমিয়ে ১৬ জন করা হলো? বাকিরা কি কোনোই অবদান রাখতে পারছে না? যারা পারফর্ম করতে পারছে না, তাদের খেলানোর মানে কী?
আজকের খেলা শেষে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে, তারা চলতি বিশ্বকাপে অন্তত আটটি ম্যাচ খেলবে। বিশ্বকাপের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তারা থাকছে। আপাতত লিওনেল স্কালোনির বক্তব্যই মুখে আনা যাক, ‘কী দারুণ দলরে, ভাই!’
আর্জেন্টিনার জন্য আরও স্বস্তির খবর হচ্ছে, আলভারেজকে ফিরে পাওয়া গেছে। মার্টিনেজও চমৎকার কাজ করেছেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সবাইকে প্রয়োজন পড়বে। টানা তিন ম্যাচে ঝুঁকির মুখে পড়েও জয়, দুটিতে খেলতে হয়েছে অতিরিক্ত ৬০ মিনিট। নিশ্চয় ক্লান্তশ্রান্ত পুরো দল। হাতে আর দুই দিন আছে। এরই মধ্যে নিজেদের গুছিয়ে নিতে হবে এবং নিখুঁত পারফর্ম করে টানা দ্বিতীয় শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
এফএইচএম

