‘কখনো প্রথমার্ধে পিছিয়ে থেকে জিততে পারেনি আর্জেন্টিনা’-এবারের আসরের আগে লিওনেল মেসিদের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর পরিসংখ্যানটা ছিল এমনই। কিন্তু এবার সেই অস্বস্তিকর পরিসংখ্যান ভেঙেচুরে নতুন ট্রেডমার্ক দাঁড় করিয়েছে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। নকআউট পর্বে একের পর এক ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ম্যাচ ছিনিয়ে নেওয়াটাই যেন অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।
ফাইনালে ওঠার পথে সর্বশেষ ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল তারা। পরে শেষ মুহূর্তের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানের নাটকীয় জয় তুলে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। এর আগে শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও শেষ ১১ মিনিটে ৩ গোল করে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। চলতি বিশ্বকাপে ৭৯তম মিনিট বা তারপরে মোট ১১টি গোল করেছে স্কালোনির শিষ্যরা, যা এককথায় অবিশ্বাস্য।
এবারের আসরে আর্জেন্টিনার শেষ মুহূর্তের গোলগুলো ফিরে দেখা যাক-
২২ জুন : অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসির গোল
সময়: ৯০+৫ মিনিট
ফলাফল: আর্জেন্টিনা ২ - ০ অস্ট্রিয়া
গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয়টা তখন কেবল সময়ের অপেক্ষা ছিল। ম্যাচের যোগ করা সময়ে আর্জেন্টিনা যখন ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে, তখনই আরও একবার প্রতিপক্ষের জাল কাঁপান মেসি। তিন ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের বা পায়ের বুলেট গতির এক শট গোলরক্ষকের ঠেকানোর সাধ্য ছিল না। তার এই গোলেই দলের ২-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত হয়।
চলতি বিশ্বকাপে ৭৯তম মিনিট বা তারপরে মোট ১১টি গোল করেছে স্কালোনির শিষ্যরা।
২৭ জুন: জর্ডানের বিপক্ষে মেসির সেই ফ্রি-কিক
সময়: ৮০তম মিনিট
ফলাফল: আর্জেন্টিনা ৩ - ১ জর্ডান
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে শুরুতে বিশ্রামে ছিলেন মেসি। আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা অবস্থায় বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তিনি। ৮০ মিনিটের সময় ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া তার একটি ফ্রি-কিক জর্ডানের রক্ষণভাগের দেয়াল ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ায়।

৩ জুলাই: কেপ ভার্দের বিপক্ষে মার্টিনেজ ও আত্মঘাতী গোল
সময়: ৯২ এবং ১১১তম মিনিট
ফলাফল: আর্জেন্টিনা ৩ - ২ কেপ ভার্দে
নকআউট পর্বের প্রথম তথা রাউন্ড অব বত্রিশের ম্যাচটি ছিল চরম নাটকীয়। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ ড্র হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ের ৯২ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ গোল করে দলকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। এরপর ১১১ মিনিটে মেসির নেওয়া কর্নার কিক থেকে প্রতিপক্ষের আত্মঘাতী গোলে ৩-২ ব্যবধানের কষ্টার্জিত জয় পায় আর্জেন্টিনা।
৭ জুলাই: মিশরের বিপক্ষে ১১ মিনিটে ৩ গোলের মহাকাব্য
সময়: ৭৯, ৮৩ এবং ৯০+২ মিনিট
ফলাফল : আর্জেন্টিনা ৩ - ২ মিশর
শেষ ১৬-র এই ম্যাচে ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত মিশর ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। বিদায় যখন দেখছিল আর্জেন্টিনা, তখনই শুরু হয় রূপকথা। ৭৯ মিনিটে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, ৮৩ মিনিটে লিওনেল মেসি এবং ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে এঞ্জো ফার্নান্দেজ পরপর গোল করে টুর্নামেন্টের সেরা কামব্যাকটি উপহার দেন সেদিন।
১১ জুলাই: সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে বধ
সময় : ১১২ এবং ১২০+১ মিনিট
ফলাফল: আর্জেন্টিনা ৩ - ১ সুইজারল্যান্ড
১০ জনের সুইজারল্যান্ড আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিল। তবে ১১২ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজের গোল এবং খেলা শেষের ঠিক আগ মুহূর্তে লাউতারো মার্টিনেজের গোলে ৩-১ ব্যবধানে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা।

১৫ জুলাই: ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আরেক রূপকথা
সময়: ৮৫ এবং ৯০+২ মিনিট
ফলাফল: আর্জেন্টিনা ২ - ১ ইংল্যান্ড
সেমিফাইনালে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনাকে ৮৫ মিনিটে সমতায় ফেরান এঞ্জো ফার্নান্দেজ। আর ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে জয়সূচক গোলটি করেন লাউতারো মার্টিনেজ। দুটি গোলের পেছনেই অ্যাসিস্ট ছিল মহাতারকা লিওনেল মেসির।
ভিন্ন কৌশলে বাজিমাত স্কালোনির
কাতারে শিরোপা জয়ের পথে টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টিনার খেলার ধরণ আর এবার অনেকটাই আলাদা। নিজেদের চিরায়ত কৌশলের বাইরে গিয়ে ভিন্ন ছক বেছে নিয়েছেন লিওনেল স্কালোনি। ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজার পর থেকেই হুড়মুড় করে আক্রমণে না ওঠা বা শুরু থেকেই অতি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা কোনোটাই এবার দেখা যায় না। এর বদলে ধীরে ধীরে খেলা জমানোর চেষ্টা থাকে। শুরুর দিকে আক্রমণের তুলনায় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে মাঠে বেশি দৌড়াতে বাধ্য করে তারা।

আর্জেন্টিনার মূল খেলাটা শুরু হয় ম্যাচের শেষ ২০ থেকে ৩০ মিনিটে। সেসময় খেলার গতি যেমন বাড়ে তেমনি একের পর এক তীব্র আক্রমণও শানাতে থাকে তারা। এমন কৌশলের একটা কারণ হতে পারে দলের সবচেয়ে বড় তারকা লিওনেল মেসিকে মাঠে থিতু হতে দেওয়া। ৩৯ বছর বয়সী মেসি যেন মাঠে ধাতস্থ হওয়ার সুযোগ পায় এবং কোনো চাপ ছাড়াই পুরো সময় মাঠে থাকতে পারেন সেটি নিশ্চিত করা। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে বাতিল করে দেওয়া যে ভুল—তা বারবার প্রমাণ করে এবার ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে মেসি বাহিনী।
এফআই

