ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ৯৬ বছরের ইতিহাসে এবারের বিশ্বকাপটি হতে যাচ্ছে ফুটবল মহাযজ্ঞের সবচেয়ে বড় আসর। মাঠের লড়াইয়ে তার সেই কথার সত্যতা মিলেছে শতভাগ। আগের যে কোনো আসরের চেয়ে এবারের বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই গোল উৎসব আর আয়োজক শহরের সংখ্যায়ও ছাড়িয়ে গেছে অতীতের সব রেকর্ড।
বিশ্বকাপের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার আয়ও। আগামী রোববারের মেগা ফাইনালের আর মাত্র একদিন বাকি। এবারের আসরে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে দেওয়া হচ্ছে ইতিহাসের রেকর্ড পরিমাণ প্রাইজমানি।
বিশ্বকাপের প্রাইজমানির খুঁটিনাটি এবং চ্যাম্পিয়ন দল কত টাকা পাচ্ছে, তা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদমাধ্যম 'দ্য অ্যাথলেটিক'।
গত বছরের ডিসেম্বরেই ফিফা এবারের আসরের জন্য রেকর্ড ৬৫ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি) প্রাইজ ফান্ডের ঘোষণা দিয়েছিল। যা কাতারে অনুষ্ঠিত গত ২০২২ বিশ্বকাপের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
মেগা ফাইনালের জয়ী দল তথা বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা প্রাইজমানি হিসেবে পাবে ৫ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬১৬ কোটি টাকার বেশি)। আর রানার্স-আপ দল ঘরে তুলবে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার (৪০৬ কোটি টাকা)।
রোববারের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। এই মেগা ফাইনালের জয়ী দল তথা বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা প্রাইজমানি হিসেবে পাবে ৫ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬১৬ কোটি টাকার বেশি)। আর রানার্স-আপ দল ঘরে তুলবে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার (৪০৬ কোটি টাকা)।
ফাইনালের মহারণের আগে আজ তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। এই ম্যাচে যারা জিতবে (তৃতীয় স্থান) তারা পাবে ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার (প্রায় ৩৫৭ কোটি টাকা) এবং পরাজিত দল (চতুর্থ স্থান) পাবে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার (৩৩৩ কোটি টাকা)।

কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া দল-মরক্কো, বেলজিয়াম, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রত্যেকে পাবে ১ কোটি ৯০ লাখ ডলার করে। এ ছাড়া শেষ ১৬ (রাউন্ড অব ১৬) থেকে বিদায় নেওয়া দল-বিদায়ী ৮টি দলের প্রত্যেকে পাবে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার করে। শেষ ৩২ (রাউন্ড অব ৩২) থেকে বিদায় নেওয়া দল-বিদায়ী ১৬টি দলের প্রত্যেকে পাবে ১ কোটি ১০ লাখ ডলার করে।
বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে ফাইনাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৮ দিনের এই লড়াইয়ে অংশ নেওয়া ৪৮টি দলের প্রত্যেকের জন্যই অন্তত ১ কোটি ৫ লাখ ডলার নিশ্চিত ছিল। গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলো পাচ্ছে ৯০ লাখ ডলার, সেই সঙ্গে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রস্তুতি খরচ বাবদ দেওয়া হচ্ছে আরও ১৫ লাখ ডলার।
ফিফা এই প্রাইজমানির পুরো অর্থ সরাসরি সংশ্লিষ্ট দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা ফেডারেশনকে প্রদান করে। এরপর ফেডারেশনগুলো সিদ্ধান্ত নেয় এর কত অংশ খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফদের বোনাস হিসেবে দেওয়া হবে। প্রাইজমানির বাকি অংশ সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের ফুটবলের তৃণমূলের উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় করা হয়।
ফিফা একটি অলাভজনক সংস্থা হলেও, ৪৮ দলের এই বিশাল বিশ্বকাপ থেকে তাদের রেকর্ড ১ হাজার কোটি (১০ বিলিয়ন) ডলারেরও বেশি রাজস্ব আয়ের প্রক্ষেপণ ছিল। সেই হিসেবে মোট আয়ের মাত্র ৬.৫ শতাংশ অর্থ দলগুলোর প্রাইজমানি হিসেবে দেওয়া হচ্ছে।

রাজস্বের এই অভাবনীয় বৃদ্ধি ফিফার চার বছরের চক্রের (সাইকেল) মোট আয়কে রেকর্ড ১ হাজার ৩০০ কোটি (১৩ বিলিয়ন) ডলারে নিয়ে ঠেকাবে। যা ২০২২ বিশ্বকাপসহ আগের চার বছরের চক্রের আয় (৭.৬ বিলিয়ন ডলার) থেকে অনেক বেশি।
টাকার অঙ্কের এই বড় লাফ সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে চ্যাম্পিয়নদের পুরস্কারে। কাতারে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে আর্জেন্টিনা পেয়েছিল ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। আর এবার চ্যাম্পিয়নরা তাদের চেয়ে ৮০ লাখ ডলার বেশি তথা ৫ কোটি ডলার ঘরে তুলবে। রানার্স-আপ দলও গতবারের ফ্রান্সের চেয়ে ৩০ লাখ ডলার বেশি পাচ্ছে।
ফিফা প্রথম জনসমক্ষে প্রাইজমানির হিসাব প্রকাশ করা শুরু করে ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে। সেবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিল মাত্র ২২ লাখ ডলার! আর পুরো টুর্নামেন্টের মোট প্রাইজমানিই ছিল মাত্র ২ কোটি ডলার। ৪৪ বছর পর এসে সেই হিসাব বদলে গেছে পুরোপুরি; এবারের চ্যাম্পিয়নরা ১৯৮২ সালের ইতালির চেয়ে প্রায় ২০ গুণেরও বেশি টাকা পাচ্ছে।
রোববারের ফাইনালে বিজয়ী দলের ২৬ জন খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের প্রত্যেকের গলায় উঠবে ঐতিহাসিক সোনার মেডেল (গোল্ড মেডেল)। একইভাবে রানার্স-আপ দল পাবে রুপার মেডেল এবং শনিবারের তৃতীয় স্থান জয়ী দল পাবে ব্রোঞ্জের মেডেল।

মেডেল দেওয়ার এই নিয়মে অবশ্য অতীতে কড়াকড়ি ছিল। ১৯৭৮ সালের আগে কেবল ফাইনালে খেলা মূল ১১ জন খেলোয়াড়কেই মেডেল দেওয়া হতো। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ফিফা এক ঐতিহাসিক ঘোষণায় ১৯৭৪ বা তার আগের বিশ্বকাপজয়ী দলগুলোর স্কোয়াডে থাকা সত্ত্বেও ফাইনালে না খেলা খেলোয়াড়দের জন্য ১২২টি মেডেল ভূতাপেক্ষভাবে প্রদানের ব্যবস্থা করে। এ ছাড়া টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফর্ম করা ম্যাচ অফিসিয়ালরাও (রেফারি ও সহকারী রেফারি) ফাইনাল শেষে মেডেল পেয়ে থাকেন।
দলগত ট্রফি ও মেডেলের পাশাপাশি ফাইনাল শেষে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পুরস্কারও দেওয়া হবে। ফিফা স্বীকৃত সাংবাদিকদের ভোটে নির্বাচিত সেরা খেলোয়াড় পাবেন 'গোল্ডেন বল' এবং সেরা গোলরক্ষক পাবেন 'গোল্ডেন গ্লাভস'। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার 'গোল্ডেন বুট'-এর লড়াইটি এবার আধুনিক ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা রোমাঞ্চে রূপ নিয়েছে। মেসি, এমবাপে, বেলিংহাম কিংবা হ্যারি কেইন—সবাই আছেন গোলবন্যার দুর্দান্ত ফর্মে। তবে ব্যক্তিগত এই ট্রফিগুলোর সঙ্গে কোনো বাড়তি অর্থ বা প্রাইজমানি থাকে না।
এফআই

