শেষ হওয়ার পথে ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। শিরোপা নির্ধারণী মেগা ফাইনাল এবং এবারের আসরের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। জমজমাট এই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ সময় আগামীকাল রবিবার দিবাগত রাত ১টায়।
বেশ কিছু রোমাঞ্চকর ও নাটকীয় ম্যাচ উপহার দিয়েছে এবারের বিশ্বকাপ। এর মধ্যে সবচেয়ে রোমাঞ্চ ছড়িয়েছিল রাউন্ড অব সিক্সটিনে অনুষ্ঠিত আর্জেন্টিনা ও মিশর মধ্যকার ম্যাচটি। শুধু এবারের বিশ্বকাপেই নয়, অধিকাংশ বিশ্বকাপেই রয়েছে এমন কিছু ম্যাচ। দেখা যাক ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা ১০ ক্যাম-ব্যাক।
পশ্চিম জার্মানি ৩-২ হাঙ্গেরি (১৯৫৪)
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই সর্বকালের সেরা কামব্যাক, যা মিরাকল অব বার্ন নামে পরিচিত। ১৯৫৪ সালের ফাইনালে হাঙ্গেরি ছিল ফেবারিট, যারা টুর্নামেন্টে ম্যাচ প্রতি গড়ে ৬.২৫টি গোল করছিল। ম্যাচের মাত্র ৮ মিনিটের মধ্যে পুসকাসের হাঙ্গেরি ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। কিন্তু জার্মানি অলৌকিকভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। ম্যাক্স মরলক ব্যবধান কমানোর পর হেলমুট রান জোড়া গোল করে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ ব্যবধানে জয়ী করেন এবং ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনের জন্ম দিয়ে জার্মানিকে চ্যাম্পিয়ন করেন।

ইতালি ৪-৩ পশ্চিম জার্মানি (১৯৭০)
ফুটবল ইতিহাসে এই ম্যাচটিকে ‘শতাব্দীর সেরা ম্যাচ বলা হয়। ইতালি প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে থাকার পর ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে (৯০+ মিনিটে) গোল করে সমতা ফেরায় পশ্চিম জার্মানি। আসল রোমাঞ্চ শুরু হয় অতিরিক্ত সময়ে, যেখানে দুই দলের মধ্যে ব্যাক-টু-ব্যাক ৫টি গোল হয় এবং বারবার ম্যাচের লিড পরিবর্তন হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত জিয়ান্নি রিভেরার জয়সূচক গোলে ইতালি ৪-৩ ব্যবধানে এই মহাকাব্যিক ম্যাচটি জিতে নেয়।
ফ্রান্স ২-১ ক্রোয়েশিয়া (১৯৯৮)
১৯৯৮ সালের সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়া প্রথমে গোল করে এগিয়ে যাওয়ার পর ফ্রান্স মাত্র এক মিনিটের মধ্যে সমতায় ফেরে। ডিফেন্ডার লিলিয়ান থুরাম প্রথমার্ধের ভুল শুধরে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে জোড়া গোল করে ফ্রান্সকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। ম্যাচের শেষ ১০ মিনিট লরেন্ট ব্ল্যাঙ্ক লাল কার্ড পাওয়ায় ফ্রান্স ১০ জনের দলে পরিণত হলেও তারা লিড ধরে রাখতে সক্ষম হয় এবং ফাইনালের টিকিট কাটে, যা পরবর্তীতে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ এনে দেয়।
ইংল্যান্ড ১-২ ব্রাজিল (২০০২)
২০০২ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে তরুণ মাইকেল ওয়েনের গোলে ইংল্যান্ড প্রথমে লিড নিয়েছিল। তবে ব্রাজিলের তারকাখচিত আক্রমণভাগের সামনে সেই লিড বেশিদিন টেকেনি। রোনালদিনহোর জাদুকরী অ্যাসিস্টে প্রথমে সমতা ফেরান রিভালদো। এরপর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে রোনালদিনহো নিজেই এক অবিশ্বাস্য দূরপাল্লার ফ্রি-কিক থেকে গোল করে ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। এর ৭ মিনিট পর রোনালদিনহো লাল কার্ড পেলেও ১০ জনের ব্রাজিলকে আর থামাতে পারেনি ইংল্যান্ড। সেবার ব্রাজিলই কাপ জিতেছিল।

অস্ট্রিয়া ৭-৫ সুইজারল্যান্ড (১৯৫৪)
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ১২টি গোল হওয়া এই ম্যাচটিতে লুকিয়ে আছে এক বিশাল কামব্যাকের গল্প। ম্যাচের মাত্র ২৪ মিনিটের মধ্যে সুইজারল্যান্ড ৩-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। কিন্তু এরপর অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক ৫টি গোল দেয় অস্ট্রিয়া! সুইজারল্যান্ডের জোসেফ হিউগি হ্যাটট্রিক করলেও অস্ট্রিয়ার আক্রমণের মুখে শেষ পর্যন্ত ৭-৫ গোলে ম্যাচটি হেরে বিদায় নিতে হয় সুইসদের।
পশ্চিম জার্মানি ৩-২ ইংল্যান্ড (১৯৭০)
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালের প্রতিশোধ নেওয়ার মঞ্চ হিসেবে ১৯৭০ সালের কোয়ার্টার ফাইনালটিকে বেছে নেয় পশ্চিম জার্মানি। ম্যাচের একটা সময় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল। কিন্তু জার্মানরা হাল ছাড়েনি। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ার ও উভে সিলার গোল করে জার্মানিকে সমতায় ফেরান। এরপর অতিরিক্ত সময়ে কিংবদন্তি জার্ড মুলার জয়সূচক গোলটি করে ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দেন।
ইংল্যান্ড ৩-২ ক্যামেরুন (১৯৯০)
ইতালি ১৯৯০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ডেভিড প্লাটের গোলে ইংল্যান্ড প্রথমে এগিয়ে গেলেও দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ ব্যবধানে লিড নেয় ক্যামেরুন। ম্যাচ যখন ক্যামেরুনের দিকে হেলে পড়ছে, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আসেন ইংলিশ স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার। ম্যাচের ৮৩ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে তিনি ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান। এরপর অতিরিক্ত সময়ে আবারও পেনাল্টি থেকে ঠাণ্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে গোল করে ইংল্যান্ডকে ৩-২ ব্যবধানে সেমিফাইনালে তোলেন লিনেকার।

পর্তুগাল ৫-৩ উত্তর কোরিয়া (১৯৬৬)
১৯৬৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে গুডিসন পার্কে ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে প্রথম ২৫ মিনিটেই ৩-০ গোলে এগিয়ে যায় উত্তর কোরিয়া। কিন্তু পর্তুগালের কিংবদন্তি ফুটবলার ইউসেবিও একাই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন। তিনি একাই পর্তুগালের হয়ে ৪টি গোল করেন। পরবর্তীতে জোসে অগুস্তো আরেকটি গোল করলে ৫-৩ ব্যবধানের এক অবিশ্বাস্য জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে পর্তুগাল। এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় ৩+ গোল কামব্যাক।
আর্জেন্টিনা ৩-২ মিশর (২০২৬)
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। বিদায়ের ঘণ্টা যখন বাজছিল, তখনই শুরু হয় আলবিসেলেস্তেদের অবিশ্বাস্য ম্যাজিক। ৭৯ মিনিটে প্রথম গোল পাওয়ার পর, ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি ডি-বক্সের বাইরে থেকে এক দুর্দান্ত হাফ-ভলিতে টুর্নামেন্টে নিজের ৮ম গোলটি করে দলকে সমতায় ফেরান। এরপর ইনজুরি টাইমে চেলসি তারকা এনজো ফার্নান্দেজ জয়সূচক গোলটি করে আর্জেন্টিনাকে কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে যান।
বেলজিয়াম ৩-২ জাপান (২০১৮)
২০১৮ সালে রাশিয়ার বিশ্বকাপে বেলজিয়াম তাদের ‘সোনালী প্রজন্ম’ নিয়ে খেলছিল। থিবো কোর্তোয়া, কেভিন ডি ব্রুইনা, ইডেন হাজার্ড এবং রোমেলু লুকাকুদের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া দলটি নকআউট পর্বে জাপানের মুখোমুখি হয়ে ১ ঘণ্টার মধ্যে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে। তবে শেষ ২০ মিনিটে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায় বেলজিয়াম। ইয়ান ভার্টংগেনের দূরপাল্লার হেডার এবং মারুয়ান ফেলাইনির গোলে সমতায় ফেরার পর, ইনজুরি টাইমের শেষ মুহূর্তে নাসের চাডলির নাটকীয় গোলে ৩-২ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় তারা।
এমএমএম/

