শেষ হতে চলেছে আরেকটি বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা ও স্পেন ফাইনালে তুমুল উত্তেজনার লড়াই হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। লিওনেল মেসি ও লামিনে ইয়ামালের সামনে রেকর্ডের হাতছানি। হতে পারে দলগত নানা কীর্তিও। তার আগে দেখে নেওয়া যাক কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান, যা অতীতের ফাইনালকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে।
৮৮
১৯৭৪ সালের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের ইয়োহান নেসকেন্স মাত্র ৮৮ সেকেন্ডের মাথায় গোল করে বিশ্ব কাপ ফাইনালের ইতিহাসে দ্রুততম গোলের রেকর্ড গড়েন। তখনও প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানির কোনো খেলোয়াড় বল ছুঁয়েও দেখতে পারেনি। খেলা শুরুর পর নেদারল্যান্ডস নিজেদের মধ্যে ১৬টি পাস দেওয়ার পর বল পান ইয়োহান ক্রুইফ। তিনি বার্টি ভগটস এবং উলি হোনেসকে বোকা বানিয়ে পেনাল্টি আদায় করেন। যা থেকে নেসকেন্স গোলটি করেন। বিশ্ব কাপের ফাইনালে প্রথম পেনাল্টি পেতে যেখানে ৪৪ বছর সময় লেগেছিল, সেখানে দ্বিতীয় পেনাল্টিটি পেতে সময় লাগে মাত্র ২৩ মিনিট। ওই ম্যাচেই পল ব্রেইটনারের সেই পেনাল্টি গোলের ওপর ভর করে হেলমুট শনের জার্মানরা শেষ পর্যন্ত জয় লাভ করে।
৬০
বিশ্বকাপের ফাইনালে কোনো দলের ক্লিনশিট রাখতে অবিশ্বাস্যভাবে দীর্ঘ ৬০ বছর সময় লেগেছিল। এর আগে ২৪টি দল চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ে পশ্চিম জার্মানি প্রথম এই কীর্তি গড়ে। সে ম্যাচে গোলপোস্ট সামলানো ২৩ বছর বয়সী বোডো ইলগনার আজও বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা সর্বকনিষ্ঠ গোলরক্ষক হয়ে আছেন। পরবর্তীতে পশ্চিম জার্মানির এই ক্লিনশিটের হাত ধরেই পর পর সাতটি ফাইনালে ক্লিনশিট রাখার একটি ধারাবাহিকতা শুরু হয়।
৪৪
২০১০ সালে স্পেন প্রথম পছন্দের জার্সি বাদ দিয়ে তাদের দ্বিতীয় পছন্দের (অ্যাওয়ে) জার্সি পরে বিশ্বকাপ জিতে দীর্ঘ ৪৪ বছরের একটি খরা কাটায়। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড লাল জার্সি পরে পশ্চিম জার্মানিকে হারানোর পর ১৯৮৬ সালে পশ্চিম জার্মানি সবুজ জার্সি পরে আর্জেন্টিনার কাছে হারে। চার বছর পর ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনা গাঢ় নীল জার্সি পরে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে যায় এবং ২০০৬ সালে ইতালি সাদা জার্সি পরা ফ্রান্সকে পরাজিত করে।
৩০
১৯৫৪ সালের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন হাঙ্গেরির টানা ৩০ ম্যাচের অপরাজিত থাকার রেকর্ড ভেঙে দেয়। এই বিশ্বরেকর্ডটি প্রায় ৪০ বছর পর ডিয়েগো সিমিওনে, ফার্নান্দো রেডন্ডো ও গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাদের আর্জেন্টিনা ভাঙতে সক্ষম হয়েছিল। সেই ‘ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স’ হাঙ্গেরি গ্রুপ পর্বে পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল এবং ফাইনালের প্রথম আট মিনিটের মধ্যেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল। তবে সেপ হারবার্গারের দল দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচটি ৩-২ ব্যবধানে জিতে নেয়। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচ জেতার একমাত্র নজির এটিই। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্স আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এমন কিছুর ইঙ্গিত দিলেও শেষ পর্যন্ত তারা পেনাল্টিতে হেরে যায়।
২২
১৯৮২ সালের ফাইনালে ইতালির দুই সতীর্থ জুসেপ্পে বার্গোমি এবং ডিনো জফের মধ্যে বয়সের ব্যবধান ছিল দীর্ঘ ২২ বছর। সে সময় তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে ১৮ এবং ৪০ বছর। বিশ্বকাপ জয়ী কোনো দলের শুরুর একাদশের দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বয়সের ব্যবধান ছিল ১৫ বছর ৫ মাস। ১৯৫৮ সালে পেলে ও নিলটন সান্তোসের মধ্যে এই পার্থক্য ছিল। এর ঠিক বিপরীতে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের শুরুর একাদশের সর্বকনিষ্ঠ ও জ্যেষ্ঠ খেলোয়াড় জিনেদিন জিদান এবং ফ্রাঙ্ক লেবফের মধ্যে বয়সের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪ বছর ৫ মাস।
৮
১৯৬৬ সালের ফাইনালে ইংল্যান্ডের হয়ে চার গোল করা মার্টিন পিটার্স এবং জিওফ হার্স্ট টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন মাত্র আটটি। আর এর পরের বিশ্বকাপে অর্থাৎ ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিলের হয়ে চার গোল করা খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা ছিল ২২০টি।
৭
বিশ্বকাপের ফাইনালে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সাতটি দল। এর মধ্যে প্রথম সাতটি আসরের মধ্যেই হয়েছে ছয়বার। ১৯৩০ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে উরুগুয়ে, ১৯৩৪ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ইতালি, ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে পশ্চিম জার্মানি, ১৯৫৮ সালে সুইডেনের বিপক্ষে ও ১৯৬২ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ব্রাজিল এবং ১৯৬৬ সালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ইংল্যান্ড। এ ছাড়া ১৯৫০ সালে উরুগুয়েও ব্রাজিলের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ে জিতে ট্রফি নিয়েছিল, যদিও সেটি আনুষ্ঠানিক কোনো ফাইনাল ছিল না। ফাইনালে গোল খেয়েও শেষবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঘটনাটি ঘটেছিল ৫২ বছর আগে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পশ্চিম জার্মানির হাত ধরে। ২০০৬ সালে ইতালি প্রথমে গোল খেয়ে মূল ম্যাচে জিততে না পারলেও শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে চ্যাম্পিয়ন হয়।
৪
বিশ্বকাপ ফাইনালে কিলিয়ান এমবাপে এককভাবে সর্বোচ্চ ৪টি গোল করেছেন। জিওফ হার্স্ট, ভাভা, পেলে ও জিনেদিন জিদান প্রত্যেকে ৩টি করে গোল করেছেন। এমবাপে ২০১৮ সালে ১টি এবং ২০২২ সালে হ্যাটট্রিক করেন। লুসাইল স্টেডিয়ামে ম্যাচের ১১৮তম মিনিটে করা তার শেষ গোলটি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সবচেয়ে দেরিতে হওয়া গোল।
৩
কাফু একমাত্র খেলোয়াড় যিনি তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন। ‘দ্য এক্সপ্রেস ট্রেন’ খ্যাত এই তারকা ১৯৯৪ সালে ইতালির বিপক্ষে প্রথমার্ধে চোটাক্রান্ত জর্জিনহোর বদলি হিসেবে মাঠে নামেন। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলেন এবং ২০০২ সালে জার্মানির বিপক্ষে দলকে অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন। পেলে রেকর্ড তিনটি বিশ্বকাপ জিতলেও ১৯৬২ সালের ফাইনালে চোটের কারণে খেলতে পারেননি। লিওনেল মেসি ২০১৪ সালে জার্মানি এবং ২০২২ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনাল খেলেছেন। স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামলে কাফুর এই রেকর্ড স্পর্শ করবেন তিনি।
২
ভাভা (১৯৫৮ ও ১৯৬২), পেলে (১৯৫৮ ও ১৯৭০), পল ব্রেইটনার (১৯৭৪ ও ১৯৮২), জিনেদিন জিদান (১৯৯৮ ও ২০০৬) এবং কিলিয়ান এমবাপে (২০১৮ ও ২০২২) হলেন একমাত্র খেলোয়াড় যারা দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করতে পেরেছেন।
২
লুইস মন্টি একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুটি ভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছেন। এই মিডফিল্ডার ১৯৩০ সালে নিজের জন্মভূমি আর্জেন্টিনার হয়ে উরুগুয়ের বিপক্ষে এবং ১৯৩৪ সালে ইতালির হয়ে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ফাইনাল খেলেন।
এফএইচএম

