বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকে শেষ পর্যন্ত জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ছিলেন সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অবশ্য ওসব ‘তিক্ত কথাবার্তা’ কানে না নিয়ে নিজের মতো করে পথ হেঁটেছেন ফিফা প্রেসিডেন্ট। লা লিগার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের তেবাসের মতে, বিশ্ব ফুটবল সংস্থার প্রধানের ‘সময় ফুরিয়ে এসেছে’।
ইনফান্তিনোকে পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন স্প্যানিশ শীর্ষ লিগের সর্বোচ্চ পদে থাকা তেবাস। ইতালিয়ান সংবাদপত্র লা গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্ত-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ফুটবল শিল্পকে ধ্বংস করছে ফিফা।
বিশ্বকাপে হাইড্রেশন ব্রেক, ফাইনালের দীর্ঘ হাফটাইম বিরতি, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড স্থগিত এবং সম্ভাব্য ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনার সমালোচনা করেছেন তিনি।
ইনফান্তিনোর কি পদত্যাগ করা উচিত, তেবাস বলেছেন, ‘আমার মতে, হ্যাঁ, আমি মনে করি তার সময় ফুরিয়ে এসেছে।’
তেবাসের মতে, জাতীয় ফেডারেশনগুলোর সমর্থন আছে ইনফান্তিনোর দিকে। তার দাবি, ফিফার নির্বাচন ব্যবস্থা ‘গোড়াতেই পঁচে গেছে।’
তেবাস বললেন, ‘তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নেই। শুধু হেরে যাওয়ার জন্য কেউ দাঁড়াতে চায় না। তার থাকা উচিত নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সে চলেও যাবে না।’
বিশ্বকাপে তেবাস তার দেশের ফাইনাল জয়ের দিনে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকায় এই গত কয়েকদিনে আমি ইনফান্তিনোর বিরোধী এবং তার কাজের সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী অনেকের কথা শুনেছি। তারা মুখে একথা বলে, কিন্তু তারপর কিছুই করে না। আমি জানি না কোনটা বেশি খারাপ, এই নীরবতা নাকি এই নীরব সম্মতি, কারণ যারা চুপ থাকে তারা ফুটবলের যে ক্ষতি হচ্ছে সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত।’
ফিফার মার্চের কংগ্রেসে ইনফান্তিনো চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে তেবাস বিশ্বাস করেন, বালোগানের লাল কার্ড স্থগিতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হতে পারে।
তিনি বললেন, ‘আমেরিকান খেলোয়াড়ের শাস্তি তুলে নেওয়া ভীষণ গুরুতর। তারা ভাগ্যবান যে বেলজিয়াম যুক্তরাষ্ট্রকে বিদায় করেছে। কারণ অন্য কিছু হলে ইনফান্তিনোকে চাকরি হারিয়ে হয়তো মাশুল গুনতে হতো। বেলজিয়াম জেতার পর বিষয়টিকে তারা ধামাচাপা দিতে পেরেছে। কিন্তু এসব তো হিমশৈলের চূড়ামাত্র।’
৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ইনফান্তিনো। তেবাস বললেন, ‘জাতীয় দলের সংখ্যা বাড়ানোর কোনো মানে নেই। ফুটবল শিল্প কেবল বিশ্বকাপ নয়। এই জাতীয় প্রতিযোগিতাগুলোই খেলাটিকে টিকিয়ে রাখে। মাত্র ৪০ দিন স্থায়ী এবং মুষ্টিমেয় কিছু খেলোয়াড়কে নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের জন্য তারা ফুটবল শিল্পকে ধ্বংস করছে, যে শিল্প হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।’
‘সেরা খেলোয়াড়েরা কি সেখানে আছে? স্পষ্টতই আছে, তবে তারা আমাদের লিগগুলোতেও রয়েছে। আন্তর্জাতিক ম্যাচ আমাদের কম দরকার এবং সব স্তরে দেশীয় ফুটবলের আরো বেশি সুরক্ষা প্রয়োজন। তারা যে দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা তারা নিজেরাও বুঝতে পারছে না।’
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার স্টেডিয়ামগুলোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের সব ম্যাচের জন্য ফিফা বাধ্যতামূলকভাবে তিন মিনিটের ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ চালু করেছিল।
পরিচালনা পর্ষদ জানিয়েছে, খেলোয়াড়দের কল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই বিরতিগুলো চালু করা হয়েছিল। তবে সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন যে সম্প্রচারক সংস্থাগুলো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাড়তি আয় করার সুযোগ হিসেবে এই বিরতিগুলোকে ব্যবহার করেছে।
এদিকে পপ সংগীতের তারকা ম্যডোনা, বিটিএস, শাকিরা এবং জাস্টিন বিবার বিশ্বকাপের ফাইনালের হাফটাইম শোতে পরিবেশনকারীদের মধ্যে ছিলেন। তাতে সাধারণ ১৫ মিনিটের হাফটাইম বিরতি বেড়ে ২৭ মিনিট ২২ সেকেন্ডের হয়েছিল।
তেবাস বলেন, ‘ফিফা নিজের পছন্দমতো, নিজের স্বার্থে যা খুশি তাই আয়োজন করে, অবশ্যই ফুটবলের স্বার্থে নয়। তাই যদি তাদের ২৭ মিনিটের হাফটাইম বিরতির প্রয়োজন হয়, তারা তাই করবে।’
‘হাইড্রেশন ব্রেকগুলো একটা মিথ্যা অজুহাত। লা লিগাতেও আমাদের এই বিরতি রয়েছে, তবে কেবল তখনই দেওয়া হয় যখন সত্যিই প্রচণ্ড গরম থাকে।’
‘এখানে ডালাস, লস অ্যাঞ্জেলেস, আটলান্টার মাঠগুলোতে এয়ার কন্ডিশনিং ছিল। আমাকে গ্যালারিতে বসে সোয়েটার পরতে হয়েছিল। এটা একেবারেই মিথ্যা অজুহাত ছিল। মূলত বিজ্ঞাপনের জন্যই এই বিরতি।’
‘এটিই প্রমাণ করে যে আমরা এমন একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছি, যা বাকি ফুটবলের কথা বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থ হাসিলে যা খুশি তাই করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়। এবং অনেক ক্ষেত্রে, এটি ফুটবলের ক্ষতি করেই থামে।’
এফএইচএম
